অসহায় এক বৃদ্ধা মা

গ্রীষ্মের ভরদুপুর। কাঠফাঁটা রোদ। ছায়াহীন পথ। মেঘহীন আকাশ। চারদিকে রোদের প্রচন্ড তাপ। এমন সময় সাধারণত পথে-ঘাটে কোন পথচারী যেতে দেখা যায় না। এমন তীব্র রোদে কি আর হাঁটা যায়? কিন্তু প্রয়োজন মানুষকে বাধ্য করে। তাছাড়া যে এক মুঠো ভাত মুখে দেয়া যাবে না। তাই বাঁচার তাগিদেই মানুষ বাধ্য হয় পথে নামে খইফুটা রোদে কাজ-কর্ম করতে। আমি আর মাহফুজ গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটছি। প্রচন্ড গরম আমাদেরকে ঘর থেকে বেরোতে বাধ্য করেছে। কিন্তু বাইরে এসে দেখি কোন বাতাস নেই। বরং ঘরের থেকে বাইরের গরমটাই বেশী। তাই আবার আমরা ঘরে ফিরে যাচ্ছিলাম।

কিন্তু পথিমধ্যে একটি দৃশ্য আমাদেরকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করলো। মর্মাহত হলাম আমরা সকরুণ সেই দৃশ্য দেখে। দেখলাম, একজন বৃদ্ধা মহিলা মাথায় বস্তা নিয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটছেন। বয়স কমপক্ষে সত্তরোর্ধ্বতো হবেই। একটু পর দেখি হাঁটার গতি আগের তুলনায় আরেকটু দ্রুত। প্রায় দৌঁড়ের মত। আমরাতো অবাক। এবং রীতিমত হতবাক। একজন বৃদ্ধা মহিলা এভাবে হাঁটছেন কেন? নিশ্চয় কোন কারণ আছে। আকস্মাৎ দেখি মহিলাটি উল্টে দাঁড়িয়ে আগের মতই পথ চলতে শুরু করলো। কিন্তু চলতে পারলো না। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। এবং কপালের সামনের অংশটা কেটে গিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে দৌঁড়ে এলাম আমরা বৃদ্ধার কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধাকে ঘিরে অনেক মুনুষ জড়ো হলো। একজন মহিলা মাথায় স্যাভলন লাগিয়ে তাতে পট্টি বেঁধে দিলেন। আরেকজন জ্ঞান ফেরাবার চেষ্টা করছিলেন।

অল্প কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা চোখ খুললো। এবং তাকে ঘিরে এত মানুষ জমায়েত হতে দেখে ভরকে গেল। আর বলতে লাগলো “ও আল্লাহ গো! আমি কই আইছি গো!” একজন মহিলা বৃদ্ধাকে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি শুনালো। এতক্ষণে বৃদ্ধা উঠে বসলো, আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি বৃদ্ধা মানুষ নিজেই হাঁটতে পারেন না। তার উপর এত বড় বোঝা! তা আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন বস্তা নিয়ে? বৃদ্ধা নিরুত্তর। কোন কথা বললেন না। শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমাদের দিকে। একটু পর আবারো জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি কোন ছেলে-পেলে নাই, যে এটা বহন করে নিয়ে যাবে?

এবার বৃদ্ধা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। দু’গন্ড বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। এবং হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমরা কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পর অশ্রুসজল চোখে বৃদ্ধা বলতে লাগলেন, “আমার তিনডা ফোলা। সবাইরেই আল্লাহ ধনী বানাইছে। অনেক ধন-সম্পত্তির মালিক বানাইছে। সবাই যার যার বউ-ফোলা লইয়া শান্তি-সুখে দিন কাটাইতাছে। কিন্তু কেউ আমার খবর নেয় না। সবাই ধনী, গরীব শুধু আমি, আমার কিছু নাই। তাই বাধ্য হয়েই আমি বয়ষ্কভাতা আনতে গেছিলাম থানা থেইকা, কিন্তু পথে যে আমার এত বড় সর্বনাশ হইবো তা জানতাম না।” বৃদ্ধার কথা শুনে আমাদের চোখগুলো অশ্রুস্নাত হয়ে গেল। এবং মনে মনে এমন সন্তানদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হলো যারা মা-বাবার সেবা করে না। বিশেষ করে যারা বৃদ্ধাবস্থায় মা-বাবার খোঁজ-খবর নেয় না। কত কষ্ট করে একজন মা তার সন্তানকে লালন-পালন করেন। দশ মাস দশদিন গর্ভে ধারণ করেন। অতপর শিশু কালে কত দৌঁড়-ঝাপ করেন, সন্তানের সঠিক প্রতিপালনের জন্যে। সন্তানকে মানুষ করার জন্যে।

আর বড় হয়ে সেই “সোনার ছেলেই” মা-বাবার কলিজায় আঘাত করে। কত বড় পাষান্ড সন্তান। অথচ আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনে কারীমে বলেছেন, “যদি তাদের একজন কিংবা উভয়েই তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয় তাহলে তাদেরকে “উফ” শব্দটিও বলো না। অথচ বর্তমান কালে কত কঠোর আচরণই না করি আমরা মা-বাবার সাথে। তবে এটা বাস্তবসত্য যে, মা-বাবার প্রতি যার যেমন আচরণ হবে, ঠিক তেমন আচরণই সে নিজে কামনা করতে পারে তার সন্তানদের থেকে। এর চেয়ে “ভালো” আশা করা যায় না।

একটু পর দেখি, বৃদ্ধার গ্রামের কয়েকজন মহিলা বৃদ্ধার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তারা সবাই “বয়স্ক ভাতা আনতে গিয়েছিল। গ্রামের মানুষ পেয়ে বৃদ্ধা চলে গেলেন। আমরা এক দৃষ্টতে তাকিয়ে রইলাম অসহায় ঐ বৃদ্ধা মায়ের পথপানে। মনে আমাদের অনেক……অনেক……..

Related posts

Top