আত্মহত্যা সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য

প্রতিদিন খবরের কাগজে এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে আত্মহত্যার কোনো না কোনো নিউজ। হতাশার যায়গা থেকে যারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে, তা মূলত কোন সমাধান নয় বরং সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি মনে রাখা জরুরি যে, একটি আত্মহত্যা শুধু একটি জীবনকে শেষ করে দেয় না বরং একটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি গোটা মানবজাতিকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জরুরি। কিন্তু কিভাবে? সে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা চলছে খুব করে। কিন্তু প্রতি বছর জনসচেতনতা ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এর সংখ্যা কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক হওয়ার কথা। তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণই তার বিপরীত।

জরিপে দেখা গেছে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দশম। বাংলাদেশ পুলিশ হেড কোয়ার্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৯৫টি। আর ২০১৬ সালে এর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬০০, ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৫০০ এবং ২০১৪ সালে তা ছিল ১০ হাজার ২০০টি। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রতি বছরই আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে এবং গড়ে প্রতিদিন ৩০ জন করে আত্মহত্যা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এক একটি আত্মহত্যার পেছনে অন্যতম কারণগুলো হলো- ডিপ্রেশন, দাম্পত্য কিংবা যেকোনো সম্পর্কের মধ্যে দ্বন্দ্ব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা এবং পারিপার্র্শ্বিক সহযোগিতা। তাদের মতে- এগুলো থেকে নিজেদের উত্তরণ করতে পারলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনা কিংবা বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো- উপরিউক্ত বিষয়গুলো কি কখনো ওই বিষয়গুলো থেকে সমাজকে পুরোপুরি মুক্ত করা আদৌ সম্ভব? অবশ্যই না।

তবে এর ভিন্ন উপায় অবশ্যই আছে। আর তা হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং  তৎসংক্রান্ত শিক্ষা। ব্যক্তিজীবনে যতদিন নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বাস্তবায়ন না হবে, ততদিন কোনো উপায়েই এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। আর নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জোগান দিতে পারে একমাত্র ইসলাম।

আত্মহত্যা ও তার পরিণতি সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য: ইসলাম আত্মহত্যাকে হারাম করেছে এবং তার পরিণতিতে বলা হয়েছে, আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পদ্ধতি অনুযায়ী তার যন্ত্রণাকে অব্যাহত রাখা হবে। পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে, وَلاَ تَقْتُلُواْ أَنفُسَكُمْ إِنَّ اللّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর করুণাময়।’ (সূরা নিসা: ২৯)

অন্য দিকে অনেক হাদিস আত্মহত্যা এবং এর শাস্তি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করে। রাসূলুল্লাহ সা: আমাদের এ ব্যাপারে বিশেষভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামেও তার সেই যন্ত্রণাকে অব্যাহত রাখা হবে। আর যে ব্যক্তি ধারালো কোনো কিছু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, তার সেই যন্ত্রণাকেও জাহান্নামে অব্যাহত রাখা হবে।’ (সহীহ বুখারি, খণ্ড ২, হাদিস নং ৪৪৬)

জুনদুব ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘তোমাদের পূর্বেকার এক লোক আহত হয়ে সে ব্যথা সহ্য করতে পারেনি। তাই সে একখানা চাকু দিয়ে নিজের হাত নিজেই কেটে ফেলে। এর পর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা নিজেকে হত্যা করার ব্যাপারে বড় তাড়াহুড়া করে ফেলেছে। তাই আমি তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ [বুখারী : ৩২৭৬; মুসলিম : ১১৩]

ছাবিত বিন যিহাক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো বস্তু দিয়ে নিজেকে হত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দিয়েই শাস্তি প্রদান করা হবে।’ [বুখারী : ৫৭০০; মুসলিম : ১১০]

এখন যারা ইসলামী অনুশাসনে বিশ্বাসী এবং সে আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেন, তারা কখনো আত্মহত্যা করে নিজেদের পরকালীন জীবনকে জাহান্নামে নিশ্চিত করতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক।

কোনো ধর্মই আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না। সুতরাং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারতা যদি নিশ্চিত করা যায় এবং যদি বাস্তব জীবনে মানবীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সমন্বয় করা যায়, তাহলেই কেবল এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারতার জন্য শুধু একাডেমিক কার্যক্রমই একমাত্র উপায় ভাবা উচিত নয়। বরং অন্যান্য মাধ্যমকেও কাজে লাগাতে হবে। যেমন- প্রত্যেক মসজিদের জুমার খুতবায়, কিংবা ওয়াজ মাহফিলে এসব সামাজিক সমস্যা ও তা থেকে উত্তরণে ইসলামের শিক্ষাগুলোকে সুস্পষ্ট এবং বোধগম্যভাবে তুলে ধরা জরুরি। সামাজিক ও ধর্মীয় নেতারা এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমে নিয়মিত আত্মহত্যার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে দ্বীন বুঝে তার ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। সকল ধরণের নিষিদ্ধ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Top