আমল ও ইবাদত : প্রয়োগ ও পদ্ধতি

শরীয়তের বিধি-বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাকেই আমল বলে । এবং এ-কথা নি:সন্দেহে বলা যায়, বিধানের গুরুত্ব যেমন, ঠিক তেমন করে যদি আমল করা না হয়, তা হলে তা সত্যিকার অর্থে ইবাদত বলে সাব্যস্ত হয় না । আমলের জন্যে নানান পদ্ধতি ও প্রয়োগরীতি কোরআন-হাদী/স এবং সাহাবি ও পূর্বসূরিদের জীবন থেকে সহজেই অনুমান করা যায় । যদিও এর জন্যে গভীর অধ্যয়নের বিকল্প নেই ।

শোনা থেকে আমল করা : নবী (সা.) সাহাবায়ে কেরাম থেকে বাইয়াত গ্রহণ করতেন— তোমরা শুনবে এবং সে-মতো আমল করবে, এই কথার ওপর আমার হাতে বাইয়াত নাও। [মুসলিম]

তাই যারা শোনে এবং আমল করে— এমন লোক আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন।

الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ

যারা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং ভালোভাবে তা অনুসরণ করে। [সুরা যুমার, আয়াত ১৮]

إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَسْمَعُونَ

এতে তাদের জন্যে নিদর্শন আছে, যারা শোনে। [সুরা রূম, আয়াত ২৩]

وَلَوْ عَلِمَ اللَّهُ فِيهِمْ خَيْرًا لَّأَسْمَعَهُمْ

আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে কিছুমাত্র শুভকামিতা জানতেন, তবে তাদেরকে শুনিয়ে দিতেন। [সুরা আনফাল, আয়াত ২৩]

প্রকৃতপক্ষে শোনারও একটা নিজস্ব স্তর আছে। দোজখে যখনা দোজখিরা যাবে, তখন ফেরেশতারা তাদের জিজ্ঞেস করবে— তোমরা কেনো জাহান্নামে এসেছো?  তোমাদের বোঝানোর মতো কেউ ছিলো না? দোজখবাসী তখন এগিয়ে এসে উত্তর দেবে—

لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ

যদি আমরা শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আমরা দোজখবাসীদের মধ্যে থাকতাম না। [সূরা মুলক, ১০]

আমলের পাঁচটি অপূর্ণতা : এ-ক্ষেত্রে পদ্ধতিগুলো বিপরীত থেকে আলোচনা করা উচিত। অর্থাৎ কী কী কারণে আমল অপূর্ণ থেকে যায়, সেটা জানলেই ইবাদত কেনো সঠিক হয় না সেগুলো বোঝা যাবে। পাঁচটি অপূর্ণতা এ যুগে ব্যাপক আকারে বিরাজ করছে।

শেখা ও আমল না করা : প্রথম কথা হলো, আমরা ইলম শিখি বটে, কিন্তু আমলের বেলায় ততটা চেষ্টা করি না। এ কারণে যার সঙ্গে কথা বলুন, সে বলে— জি, আমার জানা আছে।

এভাবে জানে সবাই, আল্লাহ তায়ালা শুধু দেখেন এটাই যে, মানা হয় না । যদি কেবল জানার ওপর নির্ভর করে মাফ পাওয়া যেতো, তাহলে শয়তান পেয়ে যেতো আমাদের আগেই। তার জ্ঞান সম্পর্কে আমাদের কারও তো কোনো সন্দেহ নেই। শুধু জানার ভিত্তিতে ক্ষমা করা হবে না। যেমনি জ্বালানো না হলে প্রদীপ কোনো উপকার করে না, তেমনি আমল করা না হলে জ্ঞান কোনো উপকারে আসে না।

 নেয়ামতের শোকর না করা : দ্বিতীয় হলো, আমরা আল্লাহর নেয়ামত চাই বটে, ব্যবহারও করি, কিন্তু সেইসব নেয়ামতের শোকর আদায় করি না। আমাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা অগুণতি নেয়ামত পাঠিয়ে থাকেন।

 وَإِن تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا

যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, শেষ করতে পারবে না। [সুরা নাহল, আয়াত ১৮]

এত অসংখ্য নেয়ামত তার। কিন্তু আমরা আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করি না। যে প্রতিপালক এত নেয়ামত খাওয়ান, তবু পেট ভরলে উঠে যাওয়ার পরে খাওয়ার দোয়াও স্মরণে থাকে না। এ জন্যে এক বুজুর্গ বলেন— হে বন্ধু, আল্লাহর নেয়ামত খেয়ে খেয়ে তোমার দাঁত তো ক্ষয়ে গেছে। কিন্তু শোকর আদায় করার বেলায় তোমার জিহ্বা ক্ষয়ে যেতে দেখছি না।

 গোনাহের মাফি না চাওয়া : তৃতীয় হলো, আমরা গোনাহ করি বটে, কিন্তু ক্ষমা প্রার্থনা করি না। কিছু মানুষ এ কারণে করে না, তারা ভাবে— করে ফেলবো। অর্থাৎ, তাদের নিয়ত আছে গোনাহ ছেড়ে দেবার। কিন্তু মুখে বলে— হ্যাঁ, এখনি ছেড়ে দেবো। ‘আকমালুশ শিয়াম’ গ্রন্থে একটা আশচর্য কথা লেখা আছে। গ্রন্থকার বলেছেন— হে বন্ধু, তাওবার আশায় তোমার গোনাহ করতে থাকা এবং বেঁচে থাকার প্রত্যাশায় তওবা করতে দেরি করা তোমার বিবেক-প্রদীপ নিভে যাওয়ার প্রমাণ। রাবেয়া বসরি বলেন—استغفارنا يحتاج إلى استغفار— আমরা যেভাবে তওবা করি, যেভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, এতটা উদাসীনভাবে চাই যে, এইরূপ ক্ষমা চাওয়ার জন্যে আবার ক্ষমা চাওয়া উচিত।

মৃতব্যক্তি থেকে শিক্ষা না নেয়া : এরপরের সমস্যাটা হলো, আমরা মৃতব্যক্তিকে দাফন করে আসি বটে, কিন্তু শিক্ষাটা নেই না। এক ব্যক্তি আশ্চর্য এক কাহিনী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন—  আমার পাশের বাড়িতে একটা লোক থাকতো, তার মৃত্যু হয়ে গেলো। আমাদেরও খুব দুঃখ হলো। আমি আমার ঘরে এসে বাচ্চাদের বললাম— আজ থেকে অন্তত একমাস টিভি অন করা উচিত হবে না। কেননা, আমাদের সামনের প্রতিবেশির সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে আমদের। তারা কত বড় আঘাত পেয়েছে এই মৃত্যুতে। তাদের বাবা জোয়ান বয়সী ছিলেন, কাজবাজের অবস্থাও ভালো ছিলো তার।

আমার কথা শুনে আমার ঘরের স্ত্রী-সন্তান সবাই আমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করলো যে, আমরা আগামি চল্লিশ দিন টিভি অন করবো না। লোকটি এরপরের ঘটনা শোনালো যে, চতুর্থ দিন অতিবাহিত হওয়ামাত্র যেই প্রতিবেশির ঘরে মৃত্যু হয়েছে, শুনলাম, সেই ঘর থেকেই টিভির আওয়াজ আসছে। অর্থাৎ— সে-ঘরের সন্তানেরা বাবাকে দাফন করেছে বটে, কিন্তু কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি।

হাসান বসরি (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, গোরস্থানে গেলেই তার ওপর এমন বিষণ্নতা ছেয়ে যেতো যে, কয়েকবার সেই খাটিয়ায় শুইয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে, যে খাটিয়ায় লাশ গোরস্থানে নেয়া হয়েছিলো। এমন অবস্থা হতো তার। আল্লাম আব্দুল ওহাব শিয়িররানির (রহ.) গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, পূর্ববর্তী বুজুর্গগণ যখন লাশবাহী মিছিলের সঙ্গে যেতেন, তখন প্রতিটি মানুষের চোখ থেকেই অশ্রু ঝরতো। বহিরাগত কেউ দেখলে ধন্দে পড়ে যেতো যে, মৃত ব্যক্তির স্বজন কারা? দেখা যেতো, মৃত্যুকে স্মরণ করে সবাই কাঁদছে। পরকালের কথা স্মরণ করে, নিজেদের গোনাহের কথা মনে করে তারা মৃতব্যক্তির জানাজা থেকে শিক্ষা নিতো।

 নসিহত শুনে বাস্তবায়ন না করা : আর পঞ্চম বিষয়টি হলো, আজকালকার যুগে আমাদের বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীরা দরবেশ ও বুজুর্গদের ওয়াজ-নসিহত ভালোই শোনে। কিন্তু তদানুযায়ী আমল করে না। কেবল শুনেই দায় মেটায়। তারপর নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করে। এটা একটা নতুন সমস্যা। সবাই বলাবলি করে— অমুকের বয়ান এমন এবং অমুকের ওয়াজ তেমন। অথচ এইসব নিয়ে পড়ে না থেকে একটু ভাবা উচিত। এসব বাদ দিয়ে কেনো চিন্তা করছি না যে, এই কথার মধ্যে আমাদের আমল করার মতো কী বার্তা দেয়া হয়েছে।

ইবাদত কিভাবে করবো : এ-ক্ষেত্রে নামাজকে আইকন ধরা যাক। ধরুন আমরা এই দশদিনে যে-সব নামাজ পড়া হবে, সেগুলো পরিপাটি করে পড়বো। প্রতিটি রোকন ধীরে সুস্থে আদায় করে পড়বো। অর্থাৎ, রুকু-সেজদা ধীরস্থিরভাবে থেমে থেমে আদায় করবো। ‘খুশু-খুজুর’ সহিত পড়ার চেষ্টা করবো। শান্ত হয়ে পড়বো। আপন প্রতিপালকের সামনে এইভাবে নামাজ পড়ার অুনশীলন করবো।

এই উদাহরণটি লক্ষ করুন— হজরত ইসমাইল শহিদ (রহ.) একবার তার শায়খ সাইয়েদ আহমদ শহিদ (রহ.) -এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। শায়খ জিজ্ঞেস করলেন— ভাই কী চাও? তিনি বলেন— হজরত, আমাকে সাহাবিদের মতো কোনো নামাজ পড়িয়ে দেন। শায়খ শুনে চুপ হয়ে রইলেন। রাত হলো। তাহাজ্জুদের সময় আমি উঠে পড়লাম। শায়খ আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন— উঠে পড়েছো? বললাম— হ্যাঁ, উঠে পড়লাম। শায়খ বললেন— যাও, আল্লাহর জন্যে অজু করে এসো। এই কয়েকটি শব্দে জানা নেই কী দীপ্তি ভরে ছিলো। ‘আল্লাহর জন্যে অজু করে এসো’ শুনতেই আমার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ও বড়ত্বের বিস্ময়কর এক তরঙ্গ বয়ে গেলো। আমি যেইমাত্র অজু করা শুরু করলাম, আমার মনে হচ্ছিলো যে, আল্লাহ আমাকে লক্ষ করছেন আর আমি তার সামনেই অজু করছি। আমি অজু করে এলাম। শায়খ জিজ্ঞেস করলেন— অজু করেছো? বললাম— হ্যাঁ, করে নিয়েছি। বললেন— আল্লাহর জন্যে দুই রাকাত নামাজ পড়ো এবার। দুই রাকাত নামাজ পড়বো। যখন আমি শুনলাম— আল্লাহর জন্যে পড়ো। আমি তখন দুইরাকাতের জন্যে নিয়ত বাঁধলাম বটে। সঙ্গে সঙ্গে আমার ওপর কান্না এসে ভেঙে পড়লো। আমি তো দুই রাকাত পড়বো মাত্র, কিন্তু হঠাৎ আমার মনে হলো আমি তো সঠিকভাবে পড়িনি। তাই আবার দুইরাকাত পড়লাম। তারপর আবার দুই রাকাত। এভাবে রাতভর আমি একশ’ নফল পড়লাম। কিন্তু আমার ‘একটি’ দুইরাকাতেও তৃপ্তি হয়নি। এরপর শায়খ বললেন— সাহাবায়ে কেরাম এমন করেই নামাজ পড়তেন। নিজেদের পক্ষে যতদূর সম্ভব দৃঢ়ভাবে আদায় করতেন, তারপর বলতেন—

ما عبدناك حق عبادتك وما عرفناك حق معرفتك

আমরা যেভাবে উচিত সেভাবে তোমার ইবাদত করতে পারিনি। সেভাবে তোমাকে চিনতে পারিনি, যেভাবে চেনা উচিত। এই ছিলো সাহাবায়ে কেরামের নামাজ। আমরাও ধীরে সুস্থে প্রতিটি রোকন আদায় করে নামাজ পড়বো।

 পূর্বসূরিদের ইবাদতের প্রকৃতি

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর আমল : ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ছিলেন সেকালের চিফ জাস্টিস। তার সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বে তিনি ছিলেন সবচে’ বড় বিচারপতি। দিনভর তিনি তো ইসলামের কাজেই মশগুল থাকতেন। তারপর যখন রাত নেমে আসতো, দেখা যেতো, প্রতিরাতেই তিনি দুইশ’ রাকাত নফল নামাজ পড়ছেন।

এত ব্যস্ত মানুষ, অথচ দেখুন, রাতে এত বেশি আল্লাহর ইবাদত করেছেন। দীনের জন্যে তারা নিজেদের জীবন কত সুন্দরভাবে সাজিয়ে নিয়েছেন, দেখুন।

রাবেয়া বসরি (রহ.)-এর আমল : এক ব্যক্তি রাবেয়া বসরিকে (রহ.) দিয়ে দোয়া করাবে। কোনো এক দুশ্চিন্তায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে সে। সে বলছে— আমি ফজরের পরে গেলাম তার সাক্ষাতে, তিনি তখন নফল নামাজ পড়ছেন। আমি ভাবলাম— জোহরের পরে গেলেই ঠিক হবে। গেলাম আবার, তিনি নফল পড়ছেন। আমি ভাবলাম— আছরের পরে গেলেই ভালো। গেলাম আছরের পরে, দেখলাম তিনি কোরআন তেলাওয়াত করছেন। ঠিক আছে, তাহলে মাগরিবের পরে যাই। তখনও গিয়ে দেখি নফল পড়ছেন। এবার ভাবলাম— এশার পরেই যাই। গিয়ে দেখি, এশার পরেও তিনি নফলের নিয়ত বেঁধেছেন এবং পড়েই যাচ্ছেন, শেষই করছেন না। এভাবেই তিনি সারাটা রাত কাটিয়ে দিলেন। ফজরের সময় হলো। ফজর নামাজ পড়লেন। আমি ফজর পরে তাড়াতাড়ি গেলাম। ফজরের পরে ইশরাক আদায় করে ক্ষণিকের জন্যে চোখটা একটু বুজে এসেছে তার। আমি যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম, আমার পায়ের আওয়াজে তার চোখ খুলে গেলো। তিনি এমন ধড়মড় করে উঠে বসলেন, যেমন কেউ ‘খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে, জরুরি কোথাও যেতে হবে’ এমনভাবে উঠে বসে। উঠে তিনি দোয়া করলেন—

اللهم إني أعوذبك من عين لا تشبع من النوم

— হে আল্লাহ, আমি এমন চোখ থেকে তোমার পানাহ চাই, যা ঘুমিয়ে মোটে তৃপ্তই হয় না। দিনের অল্প একটু সময় ঘুমে ব্যয় হয়েছে, আর তার জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন।

সূত্র : আমল সে জিন্দেগি বনতি হ্যায়। লেখক : জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দি। অনুবাদ : মনযূরুল হক

Related posts

Top