আযাদীর অন্তিম প্রতিক শহীদ টিপু সুলতান রহ.

যেদিন হিন্দুস্থানের বীর সেনানী টিপু সুলতান শাহাদাত বরণ করেছিলেন, সেদিন বলেছিলেন জেনারেল হার্স বলেছিলেন ‘আজ থেকে গোটা হিন্দুস্থান আমাদের’। তাঁর এই শাহাদাতের মধ্য দিয়ে বস্ত্তত গোটা হিন্দুস্থানের ওপর নেমে এসেছিল পরাধীনতার অন্ধকার। টিপু সুলতান যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ইংরেজদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছেন, দেশের স্বাধীনতা আগলে রেখেছেন। কিন্তু তিনি শাহাদাত বরণ করলে শুধু হিন্দুস্থানই নয়, গোটা মুসলিম বিশ্ব যেন স্বাধীনতার এক অতন্দ্রপ্রহরী হারিয়ে অভিভাবকহারা অবস্থায় পড়ে যায়। তাই টিপু সুলতান ছিলেন ভারতবাসীর জন্য একজন চিরস্বরণীয় বীর। কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি আর আমাদের উদাসীনতায় এই মুসলিম বীর আমাদের কাছে হয় অপরিচিত থেকেছেন নতুবা এমন পরিচয় লাভ করেছেন যা তার মতো মহান বীরের জন্য অবমাননার শামিল।

টিপু সুলতান ছিলেন একজন সত্যিকারের  আলেম ও মুমিন ব্যক্তি। পিতা হায়দার আলী  নিজে নিরক্ষর  হওয়া সত্ত্বেও তিনি পুত্র টিপুর জন্য তালীম-তরবিয়ত তথা উত্তম শিক্ষা দীক্ষার ব্যবস্থা করেন। ইলম ও জাগতিক শিক্ষার সাথে সাথে তিনি অল্প বয়সে যুদ্ধ বিদ্যা রপ্ত করেন।  ১৭৬৭ সালে মাত্র সতের বছর বয়সে সুলতান টিপু ইংরেজদের  বিরুদ্ধে মহীশুরের প্রথম যুদ্ধে সাত  হাজার সৈন্যের এক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করে ইংরেজদের পরাস্ত করেন। সেই সতের বছর বয়সে যে টিপু সুলতান ইসলামের দুশমনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার  সেই হাতিয়ার বীরত্বের উজ্জ্বল নমুনা হয়ে থাকে।

টিপু সুলতান শুধু একজন শাসকই ছিলেন না, একজন আমলদার আলেমও ছিলেন। সাত-আট বছর বয়সে খেলাধূলায় মত্ত একদল শিশুর সাথে তাকে দেখে জনৈক দরবেশ কাছে ডেকে নেন এবং ভবিষ্যত শাসক হওয়ার  সুসংবাদ দিয়ে তার কাছ থেকে ওয়াদা নেন যে, তিনি শাসক হওয়ার পর ঠিক এই জায়গায় একটি শানদার মসজিদ নির্মাণ করবেন। শাসক হওয়ার পর ওয়াদামাফিক তিনি মসজিদে আলা নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং ১২০৪ হিজরী মোতাবেক ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে এর উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে তিনি দেশের ওলামা-মাশায়েখ এবং বুযুর্গানে কেরামকে দাওয়াত করেন এবং ঘোষণা করেন : আজকের উদ্বোধনী দিনে সেই ব্যক্তি নামাযের  ইমামতী করবেন যিনি সাহেবে তারতিব অর্থাৎ বালেগ হওয়ার পর জীবনে কখনো যার নামায কাজা হয়নি। কিন্তু কি আশ্চর্য! কেউই তখন সামনে অগ্রসর হননি। অবস্থা দেখে টিপু সুলতান নামাযের ইমামতি করেন এবং বলেন ‘আলহামদু লিল্লাহ, আমি সাহেবে তারতীব।’

সারা জীবন অব্যাহতভাবে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও কখনো তার নামায কাযা হয়নি দেখে উপস্থিত লোকজন যারপর নাই হয়রান হয়ে যান।

একবার নেজাম ও মারাঠা বাহিনী তানগ্বাদড়া সাগরের পাড়ে সমবেত হয় টিপু সুলতানের বাহিনীর ওপর আক্রমণ করার জন্য। টিপু ছিলেন সমুদ্রের অপর পাড়ে এবং সেসময় সমুদ্র ছিল ভয়ংকর রকমের উত্তাল। সাগরের উত্তালতা দেখে তার হযরত আমর ইবনে আস রা. ও নীল দরিয়ার ঘটনার কথা মনে পড়ে এবং তিনি ভাবেন, সাচ্চা মুসলমানের যবানে আল্লাহ তায়ালা এখনও তাছীর রেখেছেন। এই বলে তিনি আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করেন এবং তার আদেশে মুজাহিদরা সমুদ্রে একুশ বার গোলা ছোঁড়ে। এর কিছুক্ষণ পর সমুদ্রের উত্তালতা কেটে যায়। টিপু সুলতানের কারামত দেখে মুজাহিদরা তাকবীর  ধ্বনি দিয়ে দুশমনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

টিপু সুলতান ছিলেন হিন্দুস্তানের এক বিরল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শাসক। ভারত উপমহাদেশে তিনিই সর্বপ্রথম উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেন। ‘ফাতহুল মুজাহিদীন’ নামে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাটি তার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হত এবং এতে মুজাহিদদের দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ থাকত।

ইংরেজরা  একমাত্র তার প্রতিরোধের কারণেই গোটা হিন্দুস্তান কবজা  করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। একারণে তারা তার বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। হাজার হাজার লোককে গাদ্দারে  পরিণত করে। মহীশুর বাহিনীর সাথে ইংরেজ বাহিনীর  ফয়সালাকারী যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭৯৯ সালের মে মাসে। ৪ মে ফজরের নামায আদায় করে টিপু সুলতান শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হন। গাদ্দার পরিবেষ্টিত হয়ে তাকে যুদ্ধ করতে হয়। এমনকি তার ব্যক্তিগত ও খাস খাদেম গোলাম রাজা খানও তার সঙ্গে চরম গাদ্দারী করে। তার কাছে পানি থাকা সত্ত্বেও সে সুলতানকে পানি দিতে অস্বীকার করে এবং সুলতান সারা দিন পানির পিপাসায় ছটফট করেন। এই গাদ্দারই তাকে দুশমনের হাতে আত্নসমর্পনের কুপরামর্শ দেয়। সেসময় তাকে লক্ষ করেই টিপু সুলতান সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন-

‘আমার কাছে সিংহের একদিনের জীবন শিয়ালের শত বছরের জীবনের চেয়ে উত্তম।’

সকাল থেকে অব্যাহত লড়াইয়ে তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আসমানের বাসিন্দারা আল্লাহর এই মকবুল বান্দাকে ইস্তেকবাল করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। বিকেলের কোনো এক সময় মহীশুরের এক গাদ্দার ইংরেজদেরকে ইশারা করে বলে দেয় ইনিই হলেন টিপু সুলতান। তৎক্ষণাৎ দুশমনেরা বন্দুকের  সকল নল তার দিকে তাক করে এবং চতুর্দিক থেকে অবিরাম গুলি বর্ষণ হতে থাকে।

একটি গুলি এসে তার বুকে বিদ্ধ হয় এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এসময় একজন  সৈনিক তার কোমরে ঝুলানো হীরা খচিত শমশীর খুলে নিতে চাইলে তার আত্নমর্যাদায় আঘাত লাগে, তিনি তলোয়ার দিয়ে তার ওপর আঘাত করেন। সে বন্দুকের সাহায্যে আক্রমণ প্রতিহত করলেও অন্য একজন ইংরেজ সৈনিক এতে প্রাণ হারায়। সে সময় নিকটে অবস্থিত অন্য একজন ইংরেজ সৈনিক তাকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লে তাঁর কানে গিয়ে তা আঘাত করে । এই গুলিতে সুলতান টিপু শাহাদাত বরণ করেন, সেই সাথে হিন্দুস্তানের আযাদীর সূর্যও অস্তমিত যায়। সে  দিনটি ছিল ১৭৯৯ ইংরেজী সালের ৪ ই মে।

পরের দিন ৫ মে টিপু সুলতানকে দাফন দেওয়া হয়। লক্ষ লক্ষ হিন্দু-মুসলমান তাকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার জন্য ভীড় করে। হিন্দু মহিলারা মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে করে শোক প্রকাশ করতে থাকে। লালবাগে পৌঁছানোর পর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। শহরের কাজ্বী জানাযার নামাযে ইমামতি করেন। নামাযান্তে পিতা হায়দার আলীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। সে সময় তার ঈসালে সওয়াবের জন্য শাহযাদাদের পক্ষ থেকে পাঁচ হাজার রুপিয়া সদকা করা হয়।

এভাবেই ভারত উপমহাদেশের একজন স্বাধীনচেতা, দেশপ্রেমিক, লড়াকু সৈনিক ও  অকুতোভয় আলেম শাসকের জীবনাবসান  হয়।

Top