ইতিকাফে আল্লাহর একান্ত-সান্নিধ্য লাভ হয়

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে ইতিকাফ পালন করতেন, একান্ত কিছু সময় যাপন করতেন আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যে। রাসুলের ইতিকাফ কালীন সময় বিচার করলে এ ব্যাপারে তার আচরণ, সুন্নত ও অবস্থা স্পষ্টরূপে আমাদের নিকট প্রতিভাত হবে। প্রতি বছর রাসুল মদিনায় ইতিকাফ  পালন করতেন। আয়েশা (রা.)   বর্ণনা করেন, রাসুল প্রতি রমজানে ইতিকাফ  পালন করতেন।

রাসুল মাসের প্রতি দশে ইতিকাফ  করেছেন, অত:পর লাইলাতুল কদর শেষ দশ দিনে জেনে তাতে স্থির হয়েছেন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন হাদিস রয়েছে, রাসুল বলেন, আমি কদরের রাত্রির সন্ধানে প্রথম দশ দিন ইতিকাফ  করলাম। এরপর ইতিকাফ  করলাম মধ্যবর্তী দশদিনে। অত:পর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানান হল যে তা শেষ দশ দিনে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ  পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ  করে। ফলে, মানুষ তার সাথে ইতিকাফ  যাপন করল। [বোখারি : ২০৪১] আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফ  পালন করেছেন। [বোখারি: ২০২৬।]

ইতিকাফ কালীন সময় রাসুল মসজিদে সকলের থেকে আলাদা করে একটি তাঁবু-সদৃশ টানিয়ে দেওয়ার আদেশ দিতেন। সকল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাতে তিনি আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য যাপন করতেন। অন্তরের যাবতীয় একাগ্রতা ও মনোযোগ, আল্লাহর জিকির, বিনয়-বিনম্রতার সাথে নিজেকে তার দরবারে সমর্পণ যেন হয় অন্তরের একমাত্র চিন্তা ও ধ্যান—এ উদ্দেশ্যেই রাসুল নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একান্ত সময় যাপন করতেন। আবু সাইদ (রা.)   হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল এক তুর্কি তাঁবুতে ইতিকাফে বসলেন, যার প্রবেশমুখে ছিল একটি চাটাইয়ের টুকরো। তিনি বলেন, রাসুল সে চাটাইটি হাতে ধরে একপাশে সরিয়ে রাখলেন এবং মুখমন্ডল বের করে মানুষের সাথে কথোপকথনে নিয়োজিত হলেন। নাফে বিন উমর হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফ  করতেন। নাফে বলেন, আব্দুল্লাহ (রা.) মসজিদের যে অংশে রাসুল ইতিকাফ  করতেন, তা আমাকে দেখিয়েছেন। [ইবনে মাজা, ১৭৭৫]  আল্লামা ইবনে কায়্যিম রহ. বলেন, এসব আয়োজন ইতিকাফের উদ্দেশ্য ও রুহ লাভের জন্য। মূর্খরা যেমন করে জনবহুলভাবে, জাঁকজমকের সাথে ইতিকাফ  করে, তা সিদ্ধ নয় কোনভাবে। [যাদুল মাআদ: ইবনে কায়্যিম, খন্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৯০]

বিশ তারিখ দিবসের সূর্যাস্তের পর একুশ তারিখের রাতের সূচনাতে রাসুল তার ইতিকাফ গাহে প্রবেশ করতেন, এবং তা হতে বের হতেন ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর। মধ্যবর্তী এই সময়টি শেষ দশদিন, যাতে ইতিকাফের বিধান দেয়া হয়েছে। আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের মধ্যবর্তী দশ দিনে সম্মিলিতভাবে ইতিকাফ  পালন করতেন। বিশতম রাত্রি বিগত হয়ে একুশতম দিবস উদিত হলে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন, এবং যারা তার সাথে ইতিকাফ  যাপন করত, তারাও ফিরে আসত, সম্মিলিতভাবে যাপিত রাত্রিগুলোর যে রাতে তিনি প্রত্যাবর্তন করতেন, একবার সে রাত্রি যাপন করলেন সকলকে নিয়ে, সকলের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, তাদের নির্দেশ দিলেন আল্লাহ তাআলার আদেশ বিষয়ে। অত:পর বললেন : আমি ইতিপূর্বে এই দশে সম্মিলিতভাবে ইতিকাফ  পালন করতাম। এখন আমাকে জানানো হয়েছে যে, শেষ দশ রাত্রিতে সম্মিলিতভাবে যাপন করা কাম্য, সুতরাং যে আমার সাথে ইতিকাফ  করবে, সে যেন ইতিকাফ স্থলে অবস্থান করে। আমাকে এ (লাইলাতুল কদর) দেখানো হয়েছিল, অত:পর আমি তা বিস্মৃত হয়েছি। তোমরা তা শেষ দশ দিনে অনুসন্ধান কর, এবং অনুসন্ধান কর প্রতি বেজোড়ে। আমি দেখতে পেয়েছি যে, আমি পানি ও কাদায় সেজদা দিচ্ছি। একুশের রাতে আকাশ ঝেপে বৃষ্টি এল, এবং রাসুলের জায়নামাজে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল। হাদিসটি প্রমাণ করে, একুশের রাত্রি হতেই ইতিকাফের সূচনা, এবং ইতিকাফ  দিবসগুলোর শেষ দিবসের সূর্যাস্তের পরই কেবল ইতিকাফ কারী আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করবে।

ইতিকাফ রত অবস্থাতেও রাসুল সা. পাক-পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন, যেমন বর্ণিত হয়েছে উরওয়ার হাদিসে। তিনি বলেন, আয়েশা (রা.)   আমাকে বলেছেন হায়েজা অবস্থায় তিনি রাসুলের কেশবিন্যাস করে দিতেন। রাসুল তখন মসজিদে অবস্থান করতেন, গৃহে অবস্থানরতা আয়েশার নিকট তিনি মস্তক এগিয়ে দিতেন, এবং তিনি হায়েজা অবস্থাতেই তার কেশ বিন্যাস করে দিতেন। [বোখারি : ২৯৬।] ইবনে হাজার বলেন : হাদিসটি প্রমাণ করে,  পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধি ব্যবহার, গোসল, ক্ষৌরকর্ম, কেশ বিন্যাস বৈধ। অধিকাংশ আলেমের মত এই যে, ইতিকাফ কালীন কেবল সেসব বিষয় মাকরূহ, যা মাকরূহ সচরাচর মসজিদে করা হয়না। [ফাতহুল বারি : খন্ড ৪, পৃষ্ঠা: ৩২০] ইতিকাফ কালীন রাসুল কোন অসুস্থ ব্যক্তির দর্শনে যেতেন না, অংশ নিতেন না কোন জানাজায়, বর্জন করতেন স্ত্রী সংস্পর্শ বা সহবাস। আয়েশা (রা.)   বলেন, ইতিকাফ কারীর সুন্নত হচ্ছে অসুস্থের দর্শনে গমন না করা, জানাজায় অংশ না নেয়া, নারী সংসর্গ ও সহবাস বর্জন করা এবং অত্যবশ্যকীয় কোন প্রয়োজন ব্যতীত ইতিকাফ  হতে বের না হওয়া। [আবু দাউদ: ২৪৭৩]

ইতিকাফ রত অবস্থায় রাসুলের স্ত্রী-গণ তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং কথোপকথন করতেন তার সাথে। সাফিয়া (রা.)   বলেন, রাসুল ইতিকাফ রত অবস্থায় আমি তার সাথে সাক্ষাতের জন্য এলাম, তার সাথে আলাপ করে  চলে এলাম…।[বোখারি : ৩০৩৯।

কেউ কেউ অসময়ে নিদ্রা, অনর্থক আলাপ-আলোচনা ও গল্প-গুজবে সময় নষ্ট করে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। এগুলো এড়িয়ে যাওয়া ইতিকাফকারীর জন্য অবশ্য কর্তব্য। হাদিসে দিবস ও রাতের যে সকল সময়-নির্দিষ্ট অনির্দিষ্ট সুন্নত উল্লেখ করা হয়েছে—যেমন: ফরজ সালাতের পূর্বে ও পরে পালিত সুন্নত, দ্বিপ্রহরের সুন্নত, ওজুর সুন্নত, জিকির-আজকার ও কোরআন পাঠ, ইতিকাফকারীদের সাথে দ্বীনি আলোচনায় অংশগ্রহণ, সালাতে প্রথম কাতারের ইহতিমাম, সালাত শেষে নির্দিষ্ট জিকির পাঠ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কেউ কেউ অনীহা আচরণ করে থাকে। এ ইবাদত ও জিকির-আজকারের মাধ্যমে ইতিকাফ কারীর সময়গুলো কাটতে থাকে, বিশুদ্ধ হয় তার আত্মা, পূরণ হয় ইতিকাফের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।

নিজ এলাকা ও দেশের বাইরে সফররত অবস্থায় যারা ইতিকাফ  পালন করেন, যেমন হারামাইন সফরের কারণ প্রদর্শন করে নফল সালাত ত্যাগ করেন, এ কোনভাবেই ঠিক নয়। কারণ, সফরে থাকা সত্ত্বেও রাসুল নফল সালাত হতে বিরত থাকতেন না। রাসুল বরং, জোহর, মাগরিব ও এশার সুন্নত ত্যাগ করতেন, অন্যান্য নফল ইবাদতগুলো যথাযথভাবেই পালন করতেন। [ইবনে উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া: খন্ড: ২০, পৃষ্ঠা: ১৬৭।] ###

Related posts

Top