ইতিকাফ : পরিচয়, উদ্দেশ্য ও ফজিলত

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তার ইবাদতের জন্য এবং তিনি তার ইবাদতের জন্য মানুষকে বিভিন্ন পন্থা-পদ্ধতি দান করেছেন। যেমন—  নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি । এগুলোর একেকটির নিয়ম পদ্ধতি সম্পূর্ণই ভিন্ন ভিন্ন। তেমনি ইতিকাফও একটি ভিন্ন ধরনের ইবাদত। এ-সময় মানুষ নিজের পার্থিব সব ব্যস্ততা ও কাজ পরিত্যাগ করে আল্লাহর দরবার তথা মসজিদে চলে যায়। আল্লাহ ছাড়া পার্থিব কাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে একমাত্র আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। ৯ বা ১০ দিনের এই সংক্ষিপ্ত সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহর জিকির, দোয়া ও ইবাদতে নিয়োজিত থেকে আল্লাহর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং নৈকট্য লাভ করে।

শাব্দিক পরিচয় : ইতিকাফ শব্দটি আরবি। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে—  কোনো জিনিসকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা এবং এর ওপর স্বীয় সত্তা ও আত্মাকে আটকে রাখা। [লিসানুল আরব]

যতক্ষণ মানুষ ইতিকাফে থাকে, তার পানাহার, ওঠা-বসা, ঘুমানো জেগে থাকা বরং প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের মধ্যে গণ্য হয়। মনে হবে ইতিকাফকারী লোক দুনিয়ার যাবতীয় বস্তু ও কাজ ছেড়ে আল্লাহর ঘরে এসে বলছেন, আমি এসে পড়েছি, আমায় ক্ষমা করে দিন, যতক্ষণ আপনি আমাকে ক্ষমা করছেন না, আমি আপনার দরবার ছাড়ছি না। তাই একে ইতিকাফ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

পারিভাষিক সংজ্ঞা : ইতিকাফ হলো সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করা। এটা সুন্নাত। স্বাভাবিকভাবে এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় বলা হয়, আল্লাহ তালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় মসজিদে পূর্ণাঙ্গ সময় অবস্থান করা। যিনি ইতেফাক করেন তাকে মুতাফিক বলে। এ-প্রসঙ্গে হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—    রাসূল (সা.) রমজান মাসের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করতেন। যতদিন না আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেছেন ততদিন তিনি এ আমল অব্যাহত রেখেছেন। তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রী-গণ ইতিকাফ করেছেন। [বোখারি]

ইতিকাফের উদ্দেশ্য : ইতিকাফ একমাত্র আল্লাহর জন্য করা হয়। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা যায়—   মানুষের ঝামেলা থেকে দূরে থেকে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে একাগ্রচিত্তে নিয়োজিত হওয়া। এ লক্ষ্যে কোন মসজিদে অবস্থান করে আল্লাহর তরফ থেকে সওয়াব ও লাইলাতুল কদর লাভ করার আশা করা।

ইতেকাকারীর কর্তব্য : ইতিকাফকারীর কর্তব্য হলো— অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, দোয়া ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকা। তবে পরিবার পরিজন বা অন্য কারো সাথে অতিপ্রয়োজনীয় কথা বলতে দোষ নেই। ইতিকাফকারী নিজ অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত রাখতে চেষ্টা করবে। নিজের অবস্থার দিকে খেয়াল করবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের ব্যাপারে নিজের অলসতা ও অবহেলা করার কথা মনে করবে। নিজের পাপাচার সত্ত্বেও আল্লাহ যে কত নেয়ামত দিয়েছেন তা স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। গভীরভাবে আল্লাহর কালাম অধ্যায়ন করবে। খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা ও গল্প গুজব কমিয়ে দেবে। কেননা এ সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরকে ফিরিয়ে রাখে। অনেকে ইতিকাফকে অত্যধিক খাওয়া-দাওয়া ও সাথিদের সাথে গল্প-গুজব করে সময় কাটানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এতে ইতেকাফের ক্ষতি হয় না বটে তবে এটা ইতেকাফের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ কেনো : ইতিকাফ করা হয় রমজানের শেষ দশকে। যদিও বছরের অন্যান্যা দিনেও ইতিকাফ করতে বাধা নেই। তবে মহল্লার মসজিদে রমজানের শেষদশকে ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া। [হেদায়া, প্রথম খণ্ড]

কেনো শেষ দশকে— এর উত্তরে ইসলামবেত্তাগণ বলেন, মূলত শবেকদরকে পাওয়া এবং এই পবিত্র রাতের ঘোষিত ফজিলত থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য ইতিকাফ থেকে উত্তম আর কোনো উপায় নেই। কারণ আল্লাহ তায়ালা কদরের রাতকে নির্দিষ্ট করে দেননি। বরং এর তারিখ গোপন রেখেছেন। যাতে মুসলমানরা রমজানের শেষ দশকের সব বেজোড় রাতে রাত জেগে আমল করতে থাকে। স্বাভাবিকভাবে মানুষের পক্ষে রাতের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে নিয়োজিত থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু মানুষ ইতিকাফ অবস্থায় যদি রাতে ঘুমিয়েও থাকে, তবু তাকে ইবাদতকারীদের মধ্যে শামিল করা হবে। তখন শবেকদরের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে ব্যয় করার ফজিলত অর্জন করবেন তিনি। এটি এত মহান ফজিলত, যার তুলনায় ১০ দিনের এই মেহনত ও শ্রম কিছুই না।

ইতিকাফের ফজিলত : হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন— ইতিকাফকারী গোনাহ থেকে মুক্ত থাকে। তাঁর সব নেক আমল এমনভাবে লিপিবদ্ধ করতে থাকে, যেভাবে তিনি নিজে করতেন। (ইবনে মাজাহ, মিশকাত) অর্থাৎ সে ইতিকাফের বাইরে থাকতে যেসব ভালো কাজ আনজাম দিত, যা সে ইতিকাফ থাকার কারণে করতে পারছে না, সেসব আমল আগের মতোই লিপিবদ্ধ হতে থাকে।

ইতিকাফ নবীজির (সা.) আমল : হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। ওফাত পর্যন্ত তিনি এভাবেই করে গেছেন। অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত ইতিকাফের এই ধারা অব্যাহত ছিলো। [বুখারি ও মুসলিম]

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। হজরত নাফে বলেন, আমাকে হজরত ইবনে ওমর (রা.) ওই স্থানটি দেখিয়েছেন যে স্থানে নবী (সা.) ইতিকাফ করতেন। [মুসলিম] ###

Related posts

Top