ইতিহাসের এক কঠিনতম রজনী

নবী মুহাম্মদ (সা.) এর নবুওয়াতের জীবনে মক্কার তেরটি বছরের প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহুর্তই ছিল বাধা প্রতিবন্ধকতায় ঘেরা, যার তীব্রতা দিনের পর দিন বাড়তে থাকে ধাপে ধাপে।  নি:সন্দেহে তার মধ্যে কঠিনতম রাত ছিল এটি। আবার অন্যদিকে বিচার করলে বলতে হয় চরম বিপদ সংকুল এই রাতটিই ছিল আল্লাহর রাসূল (সা.) এর নেতৃত্বে পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের বিজয়ের শুভ সূচনা। এই রাতে হিজরাতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ ও পন্থা নিয়ে তার একান্ত বিশ্বস্ত সাথী হযরত আবু বকর রাসূলুল্লাহর মক্কার জীবন (রা.) এর সাথে দিনের দ্বিপ্রহরে আলাপ আলোচনা সেরে নিজ বাসগৃহে চলছে আসেন আল্লাহর রাসূল (সা.) অতি সংগোপনে; যাতে কাফেরদের পরিল্পনার কথা তিনি ইতিমধ্যেই যে জেনে গেছেন এটা যেন ওরা ঘূর্ণাক্ষরেও টের না পায়।

ঐ রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঐসব লোকেরা পোঁছে যায় রাসূল (সা.) এর বাসগৃহের সন্নিকটে, যাদেরকে নিয়োজিত করা হয়েছিল নবী মুহাম্মদ (সা.) কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্যে। এদের সংখ্যা ছিল ১২ জন।  যার নেতৃত্বে ছিল আবু জাহেল । তাদের নামগুলো নিম্নরূপ; (১) আবু জাহেল (২)হাকাম বিন আবিল আস (৩)ওকবা বিন আবি মুয়াইত (৪) নদর বিন আল হারেস (৫)উমাইয়া বিন খালফ (৬)হারেস বিন কায়েম বিন গায়তালা (৭)জামায়া বিন আল আসওয়াদ (৮)তুয়ায়মা বিন আদি (৯)আবু লাহাব (১০)উবাই বিন খালফ (১১)নুবায়া বিন আল হাজ্জাজ (১২)মুনাবেব বিন হাজ্জাজ।

এরা এসে রাসূল (সা.) এর বাড়ী ঘেরাও বা অবরোধ করার আগেই আল্লাহর রাসূল (সা.) তার বিছানায় হযরত আলীকে (রা.) শোবার ব্যবস্থা করেন।  তার গায়ের উপর জড়িয়ে দেন রাসূল (সা.) এর ব্যবহারের নিজস্ব চাদর, যা সবুজ রং বিশিষ্ট এবং হাদরা মাউতী চাদর হিসেবে খ্যাতি ছিল ।  ফলে বাইরে থেকে দুশমনেরা উঁকিঝুকি মেরে এ অবস্থা দেখে মনে করে, নবী মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং শুয়ে আছেন সেই বিছানায়।  তাদের কেউ দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকতে চাইলেও ঢুকেনি তাদের সম্ভ্রমপ্রীতির কারণে।  তারা ঐতিহ্যগতভাবে সচেতন ছিল যদি তারা রাতের আঁধারে। তাদেরই নিকট আত্মীয়দের বাসগৃহে হানা দেয় তাহলে সারা দেশে তাদের বদনাম হবে।  এমন কি এতে এ বদনামও হতে পারে যে আমরা তাদের মেয়েদের মানসম্ভ্রমের প্রতিও খেয়াল করিনি। এ কারণে সারা রাত তারা নবী মুহাম্মদ (সা.) এর বাসভবন ঘিরে রাখে। প্রতিক্ষা করতে থাকে ভোরের জন্যে। যাতে করে রাসূল (সা.) ঘুম থেকে জেগে উঠলেই তারা একযোগে হামলা চালিয়ে তাদের সেই জঘন্য সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে।

এমতাবস্থায় দুশমনদের ঘেরাওয়ের মধ্য দিয়ে রাতের কোন এক মুহূর্তে হুজুর বাইরে আসেন এবং তাদের উপর মাটি নিক্ষেপ করতে করতে তাদের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে যান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ হেফাজতে।  এই সময়ে তিনি সূরায়ে ইয়াসিনের প্রথম দিকের আয়াতগুলো তেলাওয়াত করছিলেন। ভোরে হুজুর (সা.) এর বিছানা থেকে হযরত আলীকে ওঠতে দেখে তারা বুঝতে পারে, রাসূল (সা.) অনেক আগেই চলে গেছেন এ বাসগৃহ ত্যাগ করে।  এর পর তারা হযরত আলীকে (রা.) জিজ্ঞেস করতে থাকে রাসূল (সা.) এর অবস্থান জানার জন্যে।  হযরত আলী (রা.) তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে বলেন, এ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।  তিনি আরো বলেন, ‘আমি তো তার পাহারাদার নই।  তোমরা তাকে বের করে দিয়েছ।  তিনি বের হয়ে গিয়েছেন।  হযরত আলীর জবাবে রক্ত পিপাসু হায়েনার দল ক্ষেপে গিয়ে তাকে গালাগালি করতে করতে মারপিট শুরু করে দেয়।  তাকে ধরে নিয়ে যায় মসজিদুল হারামে।  সেখানে তাকে কিছুক্ষণ বন্দী করে রাখে।

হুজুরের কোন সন্ধান না পেয়ে অবশেষে তাকে ছেড়ে দেয়।  এভাবে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে মনে করা হয়; যেহেতু তারা ইতিমধ্যেই জেনে যায় যে, রাসূল (সা.) তাকে বিভিন্ন লোকের আমানত ফেরৎ দেবার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, সুতরাং তাদের সম্পদ ফেরৎ পাওয়ার লোভেও এখানে একটা কারণ হতে পারে।  তাছাড়া এটা জেনেও তাদের মধ্যে লজ্জাবোধ ও নৈতিক দিক দিয় অপরাধবোধ সৃষ্টি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়, যে ব্যক্তিকে আমরা হত্যা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছিলাম সে লোকটি কত মহৎ কত উত্তম চরিত্রের অধিকারী।  হত্যার সম্ভাব্য স্থান থেকে বেরিয়ে যাবার সময়ও দুশমনদের আমানত যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে গিয়েছেন।

এ দিকে নিজ বাসগৃহ থেকে বেরিয়ে নবী মুহাম্মদ (সা.) দ্রুত সময়ের মধ্যে চলে আসেন হযরত আবু বকর (রা.) এর বাসগৃহে।  অত:পর পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক রাতেই তারা দুজনে মক্কা থেকে কয়েক মাইল দূরে সওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নেন।  মুসনাদে আহমদ ও তিরমিজিতে আছে; মক্কা থেকে বের হবার মুহূর্তে হুজুর (সা.)‘হাযওয়ারে’ নামক স্থানে দাঁড়িয়ে বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করে দরদ ভরা কণ্ঠে বলেন, “হে মক্কা! খোদার কসম! আল্লাহর জমিনে তুমি আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়।  তোমার লোকেরা যদি আমাকে বের করে না দিত, তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” এরপর তিনি সওর পর্বতের দিকে রওয়ানা হয়ে যান।  হযরত আলীকে (রা.) বন্দীদশা থেকে মুক্তি দেবার পর রক্ত পিপাসু দুশমনেরা হযরত আবু বকর (রা.) এর বাড়ীতে গিয়ে আক্রমণ চালায়।  ইবনে ইসহাক হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.) এর বরাত দিয়ে এ ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে “হযরত আসমা বলেন, এ ঘটনার দ্বিতীয় দিনে কুরাইশদের কতিপয় লোক আমাদের বাড়ীতে আসে, তাদের সাথে আবু জাহেলও ছিল। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার পিতা কোথায়? আমি বললাম, জানিনা।  এতে আবু জাহেল আমাকে এমন জোরে থাপ্পর মারে আমার কানের গহনা ভেঙ্গে দূরে ছিটকে পড়ে।  এরপর তারা চলে যায়।

Top