ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি; সমাধান কোন পথে? [দ্বিতীয় পর্ব]

লজ্জা শালীনতা: লজ্জা নারীর স্বভাবজাত বিষয়। আমরা দেখি মেয়ে শিশু স্বভাবতই লজ্জাশীলা হয়। কিন্তু পরিবেশ এই স্বভাবকে অসুস্থ করে তোলে। যেমন হাদীসে এসেছে ‘‘প্রতিটি শিশুই ইসলাম গ্রহণের স্বভাবজাত যোগ্যতা নিয়ে জন্ম নেয়, কিন্তু মাতা পিতা তাকে ইহুদী বা নাসারা বানায়’’। আর লজ্জা ও শালীনতাবোধ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।  শালীনতার চূড়ান্ত শরয়ী রূপ হল পর্দা। পর্দার মধ্যে বড় ওড়না বা বোরকা, সেগুলো আকর্ষণীয় না হওয়া, কথার আওয়াজ কোমল ও আকর্ষণীয় না হওয়া, কথার বিষয়বস্ত্ত ও বাক্য শালীন হওয়া, চলার ভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গি মার্জিত হওয়া, বাইরে বের হলে সুগন্ধি ব্যবহার না করা, আকর্ষণ ও প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা, পবিত্র মানসিকতা, আল্লাহর ভয় ইত্যাদি অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত। আর সবগুলো বিষয় পালন করার জন্য শুধু একটি বিষয় প্রয়োজন। তা হল তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। এ বিষয়টিই পর্দার আনুষাঙ্গিক সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে যার পর্দার শুরু আল্লাহভীতি থেকে তার আপনাআপনিই বাকিগুলো এসে যায়। আর যার পর্দার শুরু হয় পোশাক থেকে তার মাঝে আল্লাহভীতি আসা পর্যন্ত বাকি সবগুলো বোঝা মনে হয়। আর আল্লাহভীতি আসার জন্য সবচেয়ে সহায়ক হল সঠিক তারবিয়াত বা তত্ত্বাবধান ও সুন্দর পরিবেশ এবং সহীহ ইল্ম তথা পর্দা ও ইসলাম সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা। কারো মাঝে যখন লজ্জাবোধ থাকে না তখন সে সবকিছুই করতে পারে। একটি হাদীসে এসেছে, إذا لم تستحي فاصنع ما شئت অর্থাৎ, ‘‘যখন তোমার থেকে লজ্জা বিদায় নেয় তখন যা ইচ্ছা তাই কর’’। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬১২০; সুনানে আবু দাউ, হাদীস : ৪৭৬৪)

শালীন পোষাক ব্যবহার: নারীর পোষাক যেন আটসাঁট ও উগ্র না হয় এবং ভাবভঙ্গি ও চালচলন যেন অশালীন না হয়-এ বিষয়ে হাদীসে সতর্ক করা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- … نساء كاسيات عاريات مميلات مائلات অর্থাৎ, কতক নারী আছে যারা পোষাক পরেও নগ্ন, যারা (পরপুরুষকে) আকর্ষণকারী ও (পরপুরুষের প্রতি) আকৃষ্ট। যারা বুখতী উটের হেলানো কুঁজের মতো মাথা বিশিষ্ট। এরা জান্নাতের সুবাস পর্যন্ত পাবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২১২৮; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৮৬৬৫)

পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন না করা: ইসলাম নারীদের পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। হযরত ইবনে আববাস রা. বলেন, যে সকল নারী পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করে এবং যে সকল পুরুষ নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে লানত করেছেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৭৮৪)

বেগানা নারী পুরুষ নির্জনে মিলিত না হওয়া: এরপর নারী যখন প্রয়োজনে ঘর থেকে পর্দার সাথে বের হল এবং প্রয়োজনে পুরুষের সামনে গেল তখনও যেন নারী বা পুরুষ শয়তানের ধোকায় বিপদের সম্মুখীন না হয় সে জন্য রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- لا يخلون رجل بامرأة إلا كان ثالثهما الشيطان অর্থাৎ, কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হলে নিঃসন্দেহে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান। (অর্থাৎ তখন শয়তান তাদের মনে কুমন্ত্রণা দেয়)। (জামে তিরমিযী, হাদীস : ১১৭১) আরেক বর্ণনায় এসেছে, মাহরাম পুরুষ ছাড়া যেন কোনো নারী কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে মিলিত না হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩৪১)

সুগন্ধি ব্যবহার করে বাইরে না যাওয়া: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক চোখ যিনা করে। আর কোনো নারী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো মজলিসের পাশ দিয়ে যায় তাহলে সে এই … এই … অর্থাৎ সেও যিনাকারী (নযরের যিনার প্রতি বা যিনার প্রতি প্রলুব্ধকারী)। (জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৭৮৬)

পরপুরুষের সাথে আকর্ষণীয় স্বরে কথা না বলা: আল্লাহ নারীদের (উম্মাহাতুল মুমিনীনকে) সম্বোধন করে বলেছেন- يَا نِسَاء النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاء إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا অর্থাৎ, হে নবী-পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে পরপুরুষের সাথে কোমল স্বরে কথা বলো না। এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হবে। তোমরা ন্যায়সংগত কথা বল।(সূরা আহযাব : ৩২)

পরস্পরের লেনদেন যদি পর্দার আড়াল থেকে হয় এবং কথা বলার প্রয়োজনে যদি আকর্ষণীয় ও কোমল স্বরে কথা না বলে তাহলে কারো মনেই অন্যায়ের ইচ্ছা জাগবে না। দেখুন শুধু পর্দার আড়াল থেকে লেনদেনই যথেষ্ট নয়, যে নারী মোবাইলে কথা বলছে তাকে তো পুরুষ দেখছে না কিন্তু এটুকু তো ফিৎনা থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং কোমল স্বরে কথা বলা থেকেও বিরত থাকা জরুরী। এ বিষয়টিই আল্লাহ নিষেধ করেছেন। কারণ নারীর কোমল স্বর স্বভাবতই পুরুষকে আকৃষ্ট করে। সুতরাং একথা ভাবার কোনো সুযোগ নেই যে, আমি তো পর্দার আড়াল থেকেই কথা বলছি, সুতরাং যা বলি যেভাবে বলি কোনো সমস্যা নেই। [চলবে…]

Related posts

Top