ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি; সমাধান কোন পথে? [তৃতীয় পর্ব]

ইভটিজিং প্রতিরোধে পুরুষের প্রতি ইসলামের নির্দেশনা: ইভটিজিং ও এ জাতীয় অন্যায় থেকে বেঁচে থাকতে পুরুষকে মৌলিক নির্দেশনা দিয়েছেন যে, সে যেন তার দৃষ্টি অবনত রাখে। কারণ এখান থেকেই শুরু ইভটিজিংয়ের। قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ অর্থাৎ, আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, এটা তাদের জন্য উত্তম। তারা যা করে নিশ্চয় আল্লাহ সে ব্যাপারে সম্যক অবগত।-সূরা নূর : ৩০

একই সাথে নারীও যেন পুরুষকে দেখে আকৃষ্ট না হয় তাই নারীকেও বলেছেন- وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ অর্থাৎ, এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। (সূরা নূর : ৩১) অর্থাৎ সকল খারাপের সূচনা হয় দৃষ্টির অপব্যবহার থেকে। কেননা দৃষ্টিই হল অন্তরের জানালা। দৃষ্টি যদি স্বচ্ছ ও পবিত্র থাকে তাহলে অন্তরও পবিত্র থাকবে। নতুবা অন্তর কলুষিত হবে। আর অন্তর যদি কলুষিত হয় তাহলে দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুনাহের পথে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাই তো দৃষ্টিকে বলা হয়েছে শয়তানের তীর।

হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে গেলে করণীয়: পুরুষ তার দৃষ্টি সংযত রাখার পরও যদি হঠাৎ নারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায় তাহলে যেন দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, দ্বিতীয়বার দৃষ্টি না দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলীকে (রা.) বলেছেন- يا علي لا تتبع النظرة النظرة فإن لك الأولى وليست لك الآخرة অর্থাৎ হে আলী! প্রথমবার যদি (অনিচ্ছাকৃত) দৃষ্টি পড়ে যায় তাহলে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দিও না। কেননা প্রথম দৃষ্টি (যা অনিচ্ছাকৃত হঠাৎ হয়ে গেছে) তোমাকে মাফ করা হবে, কিন্তু পুনরায় তাকালে তা মাফ করা হবে  না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২১৪৯; জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৭৭৭)

দৃষ্টির খেয়ানত: আর যদি প্রথমেই ইচ্ছাকৃত তাকায় বা দ্বিতীয়বার তাকায়  তা হবে দৃষ্টির খেয়ানত। আর এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন- يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ অর্থাৎ, (আল্লাহ তোমাদের) দৃষ্টির অপব্যবহার এবং অন্তর যা গোপন রাখে তা (ভালোভাবে) জানেন। (সূরা মুমিন : ১৯) মনের মাঝেও যেন কুচিন্তা লালন করা না হয় এ আয়াতে সে সম্পর্কেও সতর্ক করে বলা হয়েছে-তোমরা অন্তরে যে কুচিন্তা ও মন্দ পরিকল্পনা লালন কর তাও তোমাদের রব জানেন।

অভিভাবক সচেতনতা: নারী যখন বাইরে বের হয় কিংবা পিতা বা স্বামী যখন তার কন্যা বা স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে যান তখন কেন এমন পোষাকে নারীকে নিয়ে বের হন, যা বখাটেদের ইভটিজিংয়ের প্রতি উৎসাহিত করে?! কোনো পিতা বা স্বামী চায় না তার কন্যা বা স্ত্রীর প্রতি কেউ কুদৃষ্টি দিক অথচ তারা এমন পোশাকে তাদেরকে নিয়ে বের হন যা সুশীল পুরুষকেও অন্যায় দৃষ্টির প্রতি প্রলুব্ধ করে। অন্যদিকে কোনো পুরুষই চায় না (এমনকি যে ছেলে কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করে সে-ও না) যে, তার মা-বোনের প্রতি কেউ অন্যায় দৃষ্টি দিক, তাহলে সে কেন অন্য নারীর প্রতি কুদৃষ্টি দেয়?!

ইভটিজিং প্রতিরোধে সমাজ রাষ্ট্রের দায়

মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ: ইভটিজিং রোধে মিডিয়ার দায় অনেক। প্রিন্ট মিডিয়া এক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার ভূমিকা এক্ষেত্রে একেবারেই গৌণ; বরং তারা এ বিষয়টিকে আরো উস্কে দিচ্ছে। টিভি চ্যানেলের প্রতিটি অনুষ্ঠানই ইভটিজিং ও এ জাতীয় অন্যায়ের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী। এগুলোর স্রোতে আমাদের তরুণ-তরুণীরা যেন ভেসে চলেছে। সমাজ নিয়ন্ত্রক ও সরকারের ‍উচিৎ এদিকে লক্ষ্য রাখা, যাতে ইভটিজিং বিরোধী টিভি প্রোগ্রাম যেন ইভটিজিংএর খোরাক না হয়।

পোশাকশিল্পের নিয়ন্ত্রণ: পোশাক শিল্পের কথা আর কী বলার আছে? সব কিছুর একটা নিয়ম নীতি থাকে এবং সব বিষয়ের একটা নিয়ন্ত্রণ থাকতে হয়। কিন্তু পোশাক শিল্পে যেন কোনো নিয়ম নীতি নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই। জোরে হর্ণ বাজালে হয় শব্দদূষণ,গাড়ির বা কল-কারখানার কালো ধোঁয়ায় হয় পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ূ পরিবর্তন। কিন্তু অশালীন পোশাকের যেন কোনো দূষণ নেই। পরিবেশ ও সমাজের উপর যেন পোশাকের ভাল মন্দের কোনো প্রভাব নেই। যার যা খুশি উৎপাদন কর ও বাজারজাত কর, যা খুশি কেন ও পর। পাবলিক প্লেসে সিগারেট দুর্গন্ধ ছড়ায়, অন্যের ক্ষতি হয়, সুতরাং ‘‘ধূমপান নিষেধ’’। কিন্তু পাবলিক প্লেসে অশালীন পোশাক পরলে কোনো দুর্গন্ধও ছড়ায় না, কারো হৃদয় আক্রান্তও হয় না। অন্তত ইভটিজিংএর উপসর্গ হিসেবে অশালীন পোষাক উৎপাদন, আমদানী ও বাজারজাতকরণের ব্যাপারে সরকারের নীতিমালা থাকা জরুরী।

ইমাম শিক্ষকশ্রেণীর দায়: ইমাম-খতীব ও শিক্ষকদের সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং তাদের কথা মানার চেষ্টা করে। বিশেষ করে শিক্ষকগণ যদি ছোট থেকেই শিক্ষার্থীর মানসিকতা উন্নত করতে চেষ্টা করেন তাদের ভালো মন্দ, কল্যাণ অকল্যাণ বোঝাতে পারেন তা শিশুকে সুস্থ মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।

মোটকথা, নারী পুরুষের মানসিকতা, তাদের চিন্তা চেতনা, সংস্কৃতি, পোশাক, টি.ভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান সব হবে ইভটিজিং ও এ জাতীয় অন্যায়ের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী। আর এসব কিছু আপন অবস্থায় বহাল রেখে শুধু আইন করে, শাস্তি দিয়ে, আর কলাম লিখে ও মানব বন্ধন করে সব ঠিক করে ফেলা যাবে এমনটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই। রোগের বীজ কার্যকর রেখে নিরাময়ের আশা দূরাশা নয় কি? অবশ্যই দূরাশা। শেকড়ে বিষ রেখে আমরা বৃক্ষের ফল সুমিষ্ট পাব-এটা হতে পারে না।
বাস্তবতা বুঝতে হবে। জীবনযাপন ও অনুশীলনের মূল জায়গাটায় মনোযোগ না দিলে এর ফলাফল নিয়ে ভাবিত হওয়ায় কোনো সুফল নেই। এতে কেবল ভাবনা-দুশ্চিন্তার পরিমাণ বাড়তেই পারে, কমবে না।

সুতরাং আমরা যদি আমাদের সমাজকে ইভটিজিং ও এ জাতীয় অন্যায় থেকে রক্ষা করতে চাই তাহলে স্রষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে। আসুন, আমরা চেষ্টা করি এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সমাজের সকল অঙ্গনে আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলি। যারা বুঝি তারা অন্যদের বোঝাতে চেষ্টা করি।

Related posts

Top