ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি; সমাধান কোন পথে? [প্রথম পর্ব]

ইভটিজিং একটি সামাজিক ব্যাধি। আমাদের সমাজে তা এখন ভয়াবহ আকারে রূপ নিয়েছে। সচেতন মহল নিজ নিজ অবস্থান থেকে এর প্রতিকার নিয়ে চিন্তা করছেন। এর প্রতিকারে রাষ্ট্রীয় আইন হচ্ছে, শাস্তি হচ্ছে, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যানারে এর প্রতিবাদে মিছিল-মানববন্ধন হচ্ছে। গণমাধ্যমে কলাম, ফিচার লেখা হচ্ছে, টিভি প্রতিবেদন হচ্ছে। সকলেই চান জাতিকে এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে। জাতীয় এই কলঙ্ক থেকে জাতিকে বাঁচাতে চাইলে ইভটিজিংয়ের প্রকৃক কারণ উদঘাটন করে এর প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সংজ্ঞা: ইভ (Eve) শব্দটি বাইবেল এর ‘ইভ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ পৃথিবীর আদি মাতা। আমরা যাঁকে বিবি হাওয়া বলে চিনি। শব্দটি নারী জাতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। টিজিং (Teasing) শব্দের আভিধানিক অর্থ ঠাট্রা করা, বিরক্ত করা,  বিব্রত করা, উত্যাক্ত বা জ্বালাতন করা। ইভ-টিজিং এর সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ কোন আইনী সংজ্ঞা এখনও নির্ধারণ করা হয় নি। তবে সাধারণ ভাবে সুনির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি/ ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্যে অন্য সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি/ ব্যক্তিবর্গ স্বাভাবিক সভ্যতা, ভদ্রতা ও নীতি নৈতিকতা পরিহার করে যখন অশালীন ও আপত্তিকর কোনরদপ অঙ্গ-ভঙ্গি করেন অথবা কোন বাক্য প্রয়োগ করেন তখন সেটিকে ‘ইভ-টিজিং’ বলা হয়ে থাকে।

ইভটিজিং প্রতিরোধে ইসলামের বিধান: ইসলাম নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং এ জাতীয় সমস্যার সমাধানে আল্লাহ তাআলা নারী পুরুষ উভয়কে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন, যা মেনে চললে আমরা ইভটিজিং এবং সামাজিক আরো অনেক সমস্যা থেকে বাঁচতে পারব ইনশাআল্লাহ্। এ সকল নির্দেশনার মূলকথা হলো, আল্লাহ পুরুষকে তার দৃষ্টি অবনত রাখতে বলেছেন এবং এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, যা তার অন্তরে অন্যায়ের উদ্রেক ঘটায়। পুরুষ যদি তার দৃষ্টি অবনত রাখে তাহলে ইভটিজিংয়ের আবেদনই সৃষ্টি হয় না। তেমনি নারীকেও বলেছেন তার দৃষ্টি অবনত রাখতে, যাতে তার মনেও পুরুষকে দেখে কোনো কুমন্ত্রণা না আসে এবং নারীকে আরও বলেছেন, সে যেন তার সৌন্দর্য্য ও সাজসজ্জা পর-পুরুষের সামনে প্রকাশ না করে। নারী পুরুষ উভয়েই যদি স্রষ্টার এই নির্দেশনা মেনে চলে তাহলেই পুরুষ বাঁচবে এ অন্যায় থেকে এবং পুরুষের মা-বোন নারী বাঁচবে জুলুম থেকে।

নারীর অবস্থানস্থল কর্মস্থল: এরপর প্রথম কথা হল, নারীর অবস্থানস্থল ও কর্মস্থল ঘর। এখানে বসেই নারী একটি সৎ ও যোগ্য জাতি নির্মাণের দায়িত্ব পালন করে। এখানেই সে বেশি নিরাপদ। সুতরাং এ কথা ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে, যে নারী ঘরে বসে এ মহান দায়িত্ব পালন করছে, সে জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না। সুতরাং ঘরের বাইরের উন্নয়নেও তাকে অংশগ্রহণ করতে হবে। জাতির উন্নয়নের দুই ক্ষেত্র : ঘর ও বাহির। এ দুইয়ের একটি ক্ষেত্র যখন খালি ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে তখন অপর ক্ষেত্রে শত চেষ্টা করেও উন্নতি লাভ সম্ভব হবে না। মানবোন্নয়নই নারীর প্রধান কাজ; কোম্পানির পণ্য উৎপাদন নয়।

প্রয়োজনে যদি তাকে ঘর থেকে বের হতে হয় তাহলে সে যেন জাহেলী যুগের নারীদের মত নিজেকে প্রদর্শন না করে। কারণ নারীর নিরাপত্তাহীনতার প্রথম কারণ হল নিজেকে অশালীনভাবে মানুষের সামনে পেশ করা।  আল্লাহ তায়ালা বলেন- وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا- وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا অর্থাৎ, আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান কর। আর প্রাকজাহেলী যুগের মত নিজেদের প্রদর্শন করো না। তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগত থাক। হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান। আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর আয়াত ও যে জ্ঞানের কথা আলোচনা হয় তা স্মরণ রাখ। আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী ও সব বিষয়ে অবহিত।-সূরা আহযাব : ৩৩-৩৪

ঘরের বাইরে নারীর পোষাক: প্রয়োজনের তাগিদে যদি নারীকে ঘর থেকে বের হতে হয় তাহলে সে কীভাবে বের হবে তাও আল্লাহ বলে দিয়েছেন, যা মানলে নারী ইভটিজিংয়ের শিকার হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ অর্থাৎ,  হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না।-সূরা আহযাব : ৫৯

এ আয়াতে ইভটিজিংয়ের সমাধানে নারীর প্রতি একটি মৌলিক নির্দেশনা এসেছে। আর তা হল-নারী যেন বাইরে বের হলে তার জিলবাব দ্বারা চেহারা ও শরীর আবৃত করে, পর্দার সাথে বের হয়, অশালীনভাবে বের না হয়। নতুবা ‘রুগ্ন’ পুরুষ তার প্রতি প্রলুব্ধ হবে ও কুদৃষ্টি দিবে। তাফসীরে কুরতুবীতে (১৪/২৪৩) জিলবাবের অর্থ করা হয়েছে, এমন বড় চাদর, যা দ্বারা মুখমন্ডল ও পূর্ণ দেহ আবৃত করা যায়। [চলবে…]

Related posts

Top