ইসলামী অর্থনীতির রূপরেখা ও বৈশিষ্ট্য [প্রথম পর্ব]

ইসলাম একটি ব্যাপকতর জীবনব্যবস্থা যাতে আছে জীবনে চলার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ের দিক নির্দেশনা। ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্র সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য এতে আছে ন্যায়-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সুষ্পষ্ট নীতিমালা। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র প্রত্যেকেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তাই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইসলামের দৃষ্টিতে কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে নিম্মে আলোচনা উপস্থাপন করা হল।

  • ইসলামী অর্থনীতির রূপরেখা:

অনেকেই মনে করেন ইসলাম তো একটি ধর্ম, এখানে অর্থনীতির আলোচনা কি সেই পরিসরে হতে পারে যা একটি সমাজের সকল অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ঘটিয়ে একে উন্নয়নমুখী করে তুলবে? পৃথিবীতে অর্থনীতি সম্পর্কিত যত আইডিওলজি আছে তার থেকেও অধিক ও বিস্তৃত অর্থনৈতিক নীতির ধারণা পাওয়া যায় ইসলামে। তাই এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সুদের ওপর নিষেধাজ্ঞা, পূঁজিবাদের পরিবর্তে সাম্যবাদের নীতি, যাকাতের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা, সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম পদ্ধতি, অর্থ উপার্জন ও ব্যয়ের বৈধ ও অবৈধ বিষয়সমূহ, হালাল হারামের বিস্তৃত সীমারেখা প্রভৃতির মাধ্যমে ইসলাম এক সুদৃঢ় অর্থনৈতিক কাঠামোর বর্ননা আমাদের সামনে পেশ করে।

  • কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য :

১. আল্লাহই পৃথিবী তথা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল সম্পত্তির মালিক: তাঁর বান্দাদের তার মধ্য থেকে তিনি ইচ্ছা খুশিমত দান করেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, لَهُ مَقَالِيدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاء وَيَقْدِرُ إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ অর্থাৎ, অআকাশ ও পৃথিবীর চাবি তাঁর কাছে। তিনি যার জন্যে ইচ্ছা রিযিক বৃদ্ধি করেন এবং পরিমিত করেন। তিনি সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী। (সূরা আশ শূরা : ১২)

২. আল্লাহর অনুগ্রহে প্রাপ্ত সম্পদ তাঁর প্রতিনিধির ন্যায় ব্যবহার্য: প্রত্যেককেই তার দ্বারা অধিকৃত সম্পদের হিসাব দিতে হবে। অন্তরে পরকালীন জগতের বিশ্বাস ও জবাবদিহিতার ধারণা এর ভিত্তি মজবুত করে। এ প্রসঙ্গে কুরআনের ঘোষণা হয়েছে : وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلاَئِفَ الأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ  অর্থাৎ, “তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তোমাদের কে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন।” (সূরা আল আন’আম : ১৬৫)

৩. ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মূল নীতি হলো, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণ সাধন: রাসূল (স:) বলেছেন- যে ব্যাক্তি (সৃষ্টির প্রতি) দয়া করে না, (স্রষ্টার পক্ষ থেকে) তার প্রতি দয়া করা হবে না। (বুখারী : অধ্যায় ৭৮: হাদিস নং ৬০১৩) কুরআনে বর্ণিত হয়েছে  وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ অর্থাৎ, “আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান কর, এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভূলে যেয়ো না। তুমি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আল কাসাস : ৭৭)

৪. ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আদল তথা ইনসাফ, সুবিচার ও ভারসম্যপূর্ণতা: ইসলাম অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে সুবিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনের ঘোষণা হয়েছে : وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُواْ  অর্থাৎ, “আর যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ইনসাফ ভিত্তিক।” (সূরা নিসা : ৫৮)। কুরআনে যে আদেশ আল্লাহ তায়ালা করেছেন, তা যেমন ব্যক্তির ওপর প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য সরকারের ওপর। কাজেই সরকারকে শ্রমিক, কৃষকসহ সব শ্রেণী ও গোষ্ঠীর প্রতি সুবিচার করতে হবে। কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُ  অর্থাৎ, “আল্লাহ তোমাদের আদল ও ইহসান প্রতিষ্ঠা করার আদেশ করেছেন।”(সূরা নাহল : ৯০) সূরা নাহলে আল্লাহ পাক কেবল সুবিচারের কথাই বলেননি, ইহসান বা সদাচরণের কথাও বলেছেন। সুবিচার পাওয়া তো প্রত্যেকের অধিকার। তবে সুবিচারের অতিরিক্ত জনগণকে দিতে হবে এবং সেটাই হচ্ছে ইহসান তথা ভালো ব্যবহার।

৫. ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় যুলুম ও নির্যাতমূলক সকল পন্থা ও প্রক্রিয়া নিষিদ্ধ: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ অর্থাৎ, “পৃথিবীতে যারা নির্যাতিত ও বঞ্চিত, তাদের অনুগ্রহ করতে চাই। তাদেরকে পৃথিবীতে ইমাম (নেতা) ও উত্তরাধিকারী বানাতে চাই। তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতাসীন করতে চাই।” (সূরা কাসাস : ৫)। এটা হচ্ছে বঞ্চিতদের সম্পর্কে আল্লাহ পাকের সাধারণ নীতি। ‘উত্তরাধিকারী’ করার অর্থ হচ্ছে বঞ্চিতদের জন্যও পৃথিবীতে সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা। এমন বেতন, সুবিধা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বসবাসের সুযোগ; যা তাদের জীবনকে সুন্দর করে তোলে। কাজেই ইসলামী অর্থনীতিতে এমন সব আইন, বিধি, নীতি, প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিশেষভাবে সুরক্ষিত হয়। অবশ্য এর অর্থ এ নয় যে, অন্য সব শ্রেণীর অধিকার নষ্ট করা হবে। ইসলাম শ্রেণী সংঘাতের তত্বে বিশ্বাস করেনা বরং প্রতিটি শ্রেণীর অধিকারের মাপকাঠি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। অন্য সব শ্রেণীর ন্যায়সঙ্গত অধিকারও রক্ষা করতে হবে। কিন্তু সাধারণ লোকদের অধিকার (তারা দুর্বল হওয়ার কারণেই) প্রাধান্য পাবে।

[চলবে…]

Related posts

Top