ইসলামী অর্থনীতির রূপরেখা ও বৈশিষ্ট্য [দ্বিতীয় পর্ব]

৬. অর্থনীতিতে সুনীতি প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির উৎখাত করা : এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক যে সাধারণ নীতি দিচ্ছেন (যা অর্থনীতিতেও সমভাবে প্রযোজ্য) তা হচ্ছে- الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ অর্থাৎ, “যাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দেয়া হয় তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সালাত ও যাকাতের প্রতিষ্ঠা, মারুফ (সুকৃতি বা ভালো কাজ)-এর আদেশ দেয়া ও মুনকার (দুর্নীতি) প্রতিরোধ করা। (সূরা হজ : ৪১)। এ আয়াতের আলোকে ইসলামি অর্থনীতির লক্ষ্য হচ্ছে এমন সব অথনৈতিক ব্যবস্থা, নীতি, পলিসি ও প্রতিষ্ঠান কায়েম করা; যাতে কল্যাণের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দূর হয়। একইভাবে এ আয়াতের তাৎপর্য হচ্ছে, অর্থনীতি থেকে অকল্যাণমুখী সব ব্যবস্থা, নীতি, পলিসি, প্রতিষ্ঠান, আইন সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ, অপসারণ ও দূ করা।

৭. জনগণের সহজ জীবন নিশ্চিত করা : আল্লাহ পাক নবী সা: এর অন্যতম দায়িত্ব এভাবে নির্ধারণ করেছেন : وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالأَغْلاَلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ অর্থাৎ, “তিনি তাদেরকে বোঝা থেকে মুক্ত করেন এবং যেসব শিকলে তারা আবদ্ধ, তা থেকে তাদেরকে মুক্ত করে দেন।” ( সূরা আ‘রাফ : ১৫৭)। নবী করীম সা:-এর উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিটি মুসলিম সরকার ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে সেসব অন্যায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, বিধিবিধান ও নিয়মনীতি থেকে উদ্ধার করা; যা জনগণের জীবনের ওপর বোঝা ও শিকল হয়ে আছে।

৮. ইসলামী অর্থব্যবস্থায় অর্থ সম্পদের কৃপণতা, অলস পূঞ্জীভূত করণ এবং অনুৎপাদনশীল সঞ্চয় নিষিদ্ধ: ইসলাম জনকল্যাণের জন্য সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার চায়। এ জন্যই ইসলাম পতিত জমি ফেলে রাখা সমর্থন করেনি। যে কেউ তিন বছর পর্যন্ত জমি ফেলে রাখলে নবী সা: তা নিয়ে নেয়ার জন্য বলেছেন। মজুতদারদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স:) বলেছেনঃ “পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া কেউ মজুতদারি করেনা।” (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৫৪, তিরমিযি: ১২৬৭)

৯. ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদের অপব্যবহার, অপব্যয় এবং অপচয় নিষিদ্ধ: আল্লাহ বলেন- وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلاَ تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا, إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُواْ إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ অর্থাৎ,“আত্মীয় স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং অভাবী ও পথিকদের দাও তাদের প্রাপ্য। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অপব্যয় করোনা। কারণ অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ২৬-২৭) অন্যত্র বলা হয়েছে- يَا بَنِي آدَمَ خُذُواْ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وكُلُواْ وَاشْرَبُواْ وَلاَ تُسْرِفُواْ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ অর্থাৎ, “হে আদম সন্তান! সালাত আদায়কালে তোমাদের উত্তম পবিত্র পোশাক পরে সৌন্দর্য গ্রহণ করো। আর আহার করো, পান করো, কিন্তু অপচয় করোনা। আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আল আ’রাফ: ৩১) অপব্যয় এবং অপচয় কিন্তু এক জিনিস নয়। অপব্যয় হল বাজে খাতে খরচ এবং অপচয় হল অতিরিক্ত খরচের মাধ্যমে নষ্ট করা। ইসলামে উভয়ই নিষিদ্ধ।

১০. ইসলামি অর্থনীতি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়: আল্লাহ বলেন- وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا অর্থাৎ, “তারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে অপচয়-অপব্যয় করেনা, আবার কার্পণ্যও করেনা; বরং উভয় চরম পন্থার মাঝখানে তারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।” (সূরা আল ফুরকান : ৬৭)

১১. বৈধ-অবৈধ সীমারেখা মেনে অর্থ উপার্জন বা আহরণ : ইসলাম কাউকে অর্থ উপার্জন করার অবাধ সুযোগ দেয় না। বরং উপার্জনের পন্থা ও উপায়ের ক্ষেত্রে সামাজিক স্বার্থের প্রতিকূলে যা কিছু তা অবৈধ ও অনুকূল বিষয়সমূকে বৈধ হিসেবে গণ্য করে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَأْكُلُواْ أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ অর্থাৎ, “হে ঈমানদারগন! তোমরা পরষ্পরের ধন-সম্পদ অবৈধ ভাবে ভক্ষন করো না।” (সূরা নিসা : ২৯)

এছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন স্থানে অর্থ উপার্জনের নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলোকে হারাম গন্য করা হয়েছে: ঘুঁষের সাহায্যে কারো জিনিস নিজের করায়ত্ত্ব করা (সূরা বাকারা:১৮৮), চুরি-ডাকাতি (সূরা মায়েদা : ৩৮), সম্পদ আত্মসাৎ (সূরা বাকারা : ২৮৩ ও সূরা আলে ইমরান : ১৬১), এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করা (সূরা নিসা : ১০), ওজনে কম করা (সূরা মুতাফফিফীন : ৩ ), চারিত্রিক নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী উপকরন সমূহের ব্যবসা (সূরা আন-নূর : ১৯ ), বেশ্যাবৃত্তি ও দেহ বিক্রয় লব্ধ অর্থ (সূরা আন-নূর : ২,৩৩ ), মদ সম্বন্ধিত যে কোন ব্যবসা (সূরা মায়েদা: ৯ ), জুয়া-লটারি, ভাগ্য গননা ও জ্যোতিষীর ব্যবসা (সূরা মায়েদা : ৯০ ), সুদ খাওয়া (সূরা বাকারা :২৭৫, ২৭৮ – ২৮০, সূরা আলে ইমরান :১৩০) ইত্যাদি।

নিষিদ্ধ উৎসসমূহ ছাড়া ইসলামের দৃষ্টিতে উপার্জনের বাকি সব উৎসই হালাল বা বৈধ। উদাহরণ স্বরূপ ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে উপার্জন, কৃষি কাজ, পশু পালনের মাধ্যমে উপার্জন,পেশা গ্রহণের মাধ্যমে উপার্জন, মানসিক এবং শারীরিক শ্রমদানের মাধ্যমে উপার্জন প্রভৃতি।

১২. ব্যক্তির সম্পদে সমাজের অধিকারের স্বীকৃতি: সমাজের নিম্ন আর্থিক অবস্থা সম্পন্ন মানুষদের অধিকার স্বরূপ আর্থিক সাহায্য ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কুরআনের ভাষায়- إِن تُبْدُواْ الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاء فَهُوَ خَيْرٌ لُّكُمْ وَيُكَفِّرُ عَنكُم مِّن سَيِّئَاتِكُمْ وَاللّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ অর্থাৎ, “তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তাও ভালো। আর যদি গোপনে দরিদ্রদের দাও, তবে তা অধিকতর ভালো। এমনটি করলে তোমাদের বহু পাপ মুছে দেয়া হবে। তোমরা যাই করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। (সূরা বাকারা : ২৭১)

[চলবে…]

Related posts

Top