ইসলামী অর্থনীতির রূপরেখা ও বৈশিষ্ট্য [তৃতীয় পর্ব]

১৩. যাকাত : সাধারণ দান-সদকার মাধ্যমে ব্যয় হচ্ছে ইসলামী অর্থনীতির স্বভাবগত দাবি যাতে অর্থ পুঞ্জিভূত হতে না পারে। এরপরও অর্থ সঞ্চিত হলে তা অপবিত্র হয়ে যায় যা পবিত্রকরণের উদ্দেশ্যে যাকাত প্রদানকে ফরজ করা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا অর্থাৎ, “(হে নবী!) তাদের ধন-সম্পদ থেকে একটি সাদকা গ্রহন করো, যা ঐ ধন-সম্পদকে পাক-পবিত্র ও হালাল করে দেবে,”–(সূরা তাওবা : ১০৩) অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে- إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاء وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللّهِ  অর্থাৎ, “এই সাদাকা (যাকাত) নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো ফকিরদের জন্যে, মিসকিনদের জন্যে, সাদাকা আদায়-বন্টন বিভাগের কর্মচারীদের জন্যে, তাদের জন্যে (ইসলামের পক্ষে) যাদের মন আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য হবে, দাস মুক্তির জন্যে, ঋণে নিমজ্জিতদের সাহায্যের জন্যে, আল্লাহর পথে এবং পথিকদের সাহায্যের জন্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি ফরয।” (তাওবা : ৬০)

১৪. সম্পদের যথাযথ বণ্টন : ইসলাম সম্পদের যথাযথ বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালার নীতিনির্ধারণী ঘোষণা হচ্ছে- كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاء مِنكُمْ অর্থাৎ, সম্পদ যেন তোমাদের ধনীদের মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে না থাকে। (সূরা হাশর : আয়াত ৭)। এ আয়াতের আলোকে ইসলামি অর্থনীতির লক্ষ্য হচ্ছে- আইন ও পলিসির মাধ্যমে সম্পদের সর্বাধিক বিস্তার ও বণ্টন নিশ্চিত করা এবং লক্ষ্য রাখা যেন, সম্পদ অতিরিক্ত পুঞ্জীভূত হওয়ার সুযোগ না পায়।

১৫. সুদ ও সুদী কারাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- وَأَحَلَّ اللّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا অর্থাৎ, “আল্লাহ হালাল করেছেন ব্যবসা বাণিজ্য এবং হারাম করেছেন রিবা (সূদ)।” (সূরা বাকারা : ২৭৫) ইসলামের অর্থনৈতিক ধারনা অনুযায়ী সুদের মাধ্যমে আর্থিক সমৃদ্ধ ঘটেনা বরং আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

১৬. ব্যক্তি মালিকানার অধিকার: পুরুষ নারী প্রত্যেকেই বৈধ পন্থায় অর্জিত নিজ সম্পদের স্বত্বাধিকারী সে নিজে। বৈধ অন্থায় স্বাধীনভাবে এর বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও ব্যয় ব্যহারের অধিকার তার জন্যে সংরক্ষিত। ইরশাদ হয়েছে- فَضَّلَ اللّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُواْ وَلِلنِّسَاء نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ অর্থাৎ, “আল্লাহ যেসব জিনিস দিয়ে তোমাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, সেটার জন্যে তোমরা লালসা করোনা। পুরুষ যা উপার্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ।” (সূরা নিসা: ৩২)

১৭. উত্তরাধিকার বিধান : শরিয়াহ নির্ধারিত নিকট আত্মীয়দের মধ্যে উত্তরাধিকার বন্টন বাধ্যতা মূলক। কুরআনের সূরা নিসায় এ বন্টন পদ্ধতির বিস্তারিত আলোচনা আছে যেখানে নারীদের আর্থিক সম্পত্তিতে অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে এবং এর অন্যথায় কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে- يُوصِيكُمُ اللّهُ فِي أَوْلاَدِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الأُنثَيَيْنِ فَإِن كُنَّ نِسَاء فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ وَإِن كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ وَلأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُ وَلَدٌ فَإِن لَّمْ يَكُن لَّهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلأُمِّهِ الثُّلُثُ فَإِن كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلأُمِّهِ السُّدُسُ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ آبَآؤُكُمْ وَأَبناؤُكُمْ لاَ تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعاً فَرِيضَةً مِّنَ اللّهِ إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلِيما حَكِيمًا, وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِينَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّكُمْ وَلَدٌ فَإِن كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُم مِّن بَعْدِ وَصِيَّةٍ تُوصُونَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلاَلَةً أَو امْرَأَةٌ وَلَهُ أَخٌ أَوْ أُخْتٌ فَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ فَإِن كَانُوَاْ أَكْثَرَ مِن ذَلِكَ فَهُمْ شُرَكَاء فِي الثُّلُثِ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَى بِهَآ أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَآرٍّ وَصِيَّةً مِّنَ اللّهِ وَاللّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ

অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেনঃ একজন পুরুষের অংশ দু?জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দু’ এর অধিক, তবে তাদের জন্যে ঐ মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক। মৃতের পিতা-মাতার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে ত্যাজ্য সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের পুত্র থাকে। যদি পুত্র না থাকে এবং পিতা-মাতাই ওয়ারিস হয়, তবে মাতা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ ওছিয়্যতের পর, যা করে মরেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ কতৃক নির্ধারিত অংশ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ। আর, তোমাদের হবে অর্ধেক সম্পত্তি, যা ছেড়ে যায় তোমাদের স্ত্রীরা যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের হবে এক-চতুর্থাংশ ঐ সম্পত্তির, যা তারা ছেড়ে যায়; ওছিয়্যতের পর, যা তারা করে এবং ঋণ পরিশোধের পর। স্ত্রীদের জন্যে এক-চতুর্থাংশ হবে ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ, যা তোমরা ছেড়ে যাও ওছিয়্যতের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর। যে পুরুষের, ত্যাজ্য সম্পত্তি, তার যদি পিতা-পুত্র কিংবা স্ত্রী না থাকে এবং এই মৃতের এক ভাই কিংবা এক বোন থাকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকে ছয়-ভাগের এক পাবে। আর যদি ততোধিক থাকে, তবে তারা এক তৃতীয়াংশ অংশীদার হবে ওছিয়্যতের পর, যা করা হয় অথবা ঋণের পর এমতাবস্থায় যে, অপরের ক্ষতি না করে। এ বিধান আল্লাহর। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল। (সূরা নিসা: ১১-১২)

১৮. কল্যাণকর দ্রব্যের সর্বাধিক উৎপাদন : নবী সা:-এর দায়িত্ব হিসেবে আল্লাহ পাক বলেছেন : وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَآئِثَ অর্থাৎ, তিনি তাদের জন্য পবিত্র দ্রব্য হালাল করেন এবং অপবিত্র দ্রব্য হারাম করেন। (আরাফ : ১৫৭)। এ আয়াতের আলোকে ইসলামের উৎপাদনব্যবস্থায় অপবিত্র দ্রব্যের কোনো স্থান নেই। সেখানে কেবল স্বাস্থ্যকর ও পবিত্র দ্রব্যই থাকবে। তাই ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো, জনগণের স্বার্থে স্বাস্থ্যসম্মত দ্রব্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং সব অকল্যাণকর দ্রব্যের উৎপাদন, আমদানি, রফতানি ও ব্যবসা নিষিদ্ধ করা।

সুতরাং এর দ্বারা বোঝা যায় ইসলামী অর্থব্যবস্থা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের নির্দেশনা সম্বলিত এক সার্বজনীন জনহিতৈষী ব্যবস্থা। [সমাপ্ত]

তথ্যসূত্র:

১. তাফসীরে মা’আরেফুল কুরআন

২. ইসলামী অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা : আব্দুস শহীদ নাসিম

৩. ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য : শাহ্ আব্দুল হান্নান

Related posts

Top