ইসলামে রাষ্ট্রধারণা [তৃতীয় পর্ব]

ইসলাম ও তন্ত্র

‘তন্ত্র’ বা  cracy একটি আধুনিক পরিভাষা। বাংলায় ‘তন্ত্র’ শব্দটির অনেক অর্থ রয়েছে। যেমন– শাস্ত্র, বিদ্যা, প্রাধান্য, রাজ্যশাসন পদ্ধতি ইত্যাদি। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য হলো ‘রাজ্যশাসন পদ্ধতি’, যা ইংরেজি cracy শব্দের অনুবাদ হিসেবে ব্যবহৃত। ইংরেজি cracy শব্দটি গ্রীক Kratos শব্দ থেকে আগত, যার অর্থ power, strength, rule (ক্ষমতা, শক্তি, শাসন) ইত্যাদি।

বিশ্বের অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ‘রাজ্যশাসন পদ্ধতি’ পর্যালোচনা করলে আমরা বলতে পারি, রাজ্যশাসন পদ্ধতি মূলত দুই প্রকারের হতে পারে:                                     (১) জনগণের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে (২) শাসকের একচ্ছত্র ক্ষমতার ভিত্তিতে।

দ্বিতীয় পদ্ধতিতে অর্থাৎ শাসকের একচ্ছত্র অধিকার ও ক্ষমতার উৎস হতে পারে তার বংশ বা দখল কিংবা ‘ঐশ্বরিক’। শাসক নিজের বংশ বা দখলের অধিকারে রাষ্ট্রের সকল কিছুর মালিকানা দাবি করবেন, অথবা নিজেকে ‘ঈশ্বরের’ প্রতিনিধি হিসেবে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করবেন।

আধুনিক পরিভাষায় ‘রাজ্যশাসনের’ প্রথম পদ্ধতিটি ‘গণতন্ত্র’ (Democracy) এবং দ্বিতীয় পদ্ধতিটি ‘স্বৈরতন্ত্র’ (Autocracy) নামে পরিচিত। আর যদি শাসক বা শাসকগোষ্ঠী তাদের ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব বা ধর্মীয় অভ্রান্ততা দাবি করেন তাহলে তা ‘পুরোহিততন্ত্র’ বা ‘যাজকতন্ত্র’ (Theocracy) নামে পরিচিত। এখন প্রশ্ন হলো, উপরে আলোচিত ইসলামের ‘রাজ্যশাসন পদ্ধতি’কে আমরা কোন প্রকারের বলে গণ্য করব?

আমরা অনেক সময় বলি, ইসলাম ইসলামই, একে কোনো তন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কথাটির মধ্যে সত্যতা রয়েছে। তবে যে ব্যক্তি ইসলামকে ভালোভাবে জানেন না, তাকে ইসলামের বিষয় বুঝাতে হলে তাঁর ভাষায় বা পরিভাষায় অনুবাদ করেই তাঁকে বুঝাতে হবে। এছাড়া ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ধর্ম, যার মধ্যে বিশ্বাস, কর্ম, আচার-আচরণ, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ‘ইসলাম’ বললে এই সবকিছুর সমষ্টি বুঝায়। রাজ্যশাসন পদ্ধতি বিষয়ে ইসলামের দিক নির্দেশনার সমষ্টিকে আমরা সহজবোধ্যভাবে কী বলতে পারি? ইসলামের রাজ্যশাসন পদ্ধতি কি গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, নাকি পুরোহিততন্ত্র? কোনোটিই যদি না হয়, তাহলে এগুলোর কোনটির অন্তত সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী?

উপরের আলোচনা থেকে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি, ইসলামের রাজ্যশাসন পদ্ধতি ‘গণতান্ত্রিক’। কিন্তু ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে পাশ্চাত্য গবেষকগণ একে Theocracy বলে উল্লেখ করেছেন। Theocracy শব্দটি গ্রীক (theokratia) থেকে আগত। এর অর্থ government by a god বা একজন দেবতার সরকার। এ ব্যবস্থায় দেবতা, ঈশ্বর বা মহান স্রষ্টাকে একচ্ছত্র ক্ষমতা ও সবোর্চ্চ মালিকানার অধিকারী (sole sovereign) এবং সকল আইনকে ঈশ্বরের নির্দেশ বলে গণ্য করা হয়। স্বভাবতই দেবতা বা ঈশ্বর নিজে শাসন করেন না। কাজেই ঈশ্বরের নামে পুরোহিতগণ বা রাজাই শাসন পরিচালনা করেন। তবে তারা নিজেদেরকে ‘ঈশ্বরের প্রতিনিধি’ বলে দাবি করেন এবং তাদের আদেশ-নিষেধকে অলঙ্ঘনীয় ঐশ্বরিক নির্দেশ বলে গণ্য করেন।

ইসলামে আল্লাহকে সর্বোচ্চ মালিকানার অধিকারী (sovereign) বলে বিশ্বাস করা হয়। তিনিই হুকুম, নিদের্শ বা বিধান প্রদানের অধিকারী। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা থিওক্র্যাটিক। থিওক্র্যাসির সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্য হলো, থিওক্র্যাসিতে রাজা বা পুরোহিতগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তারা ধর্মের নামে বা ঈশ্বরের নামে যে ব্যাখ্যা, আইন বা বিধান প্রদান করবেন তা মান্য করা জনগণের ‘ধর্মীয় দায়িত্ব’ এবং অমান্য করা ‘ধর্মদ্রোহিতা’। থিওক্র্যাসি হলো ঈশ্বর বা ধর্মের নামে পরিচালিত স্বৈরতন্ত্র।

থিওক্র্যাসির মূল প্রেরণা বর্ণনা করে রাজা প্রথম জেমস (১৫৬৬-১৬২৫) বলেন, “The state of monarchy is the supremest thing upon earth: for kings are not only god’s lieutenants upon earth, and sit upon God’s throne, but even by God himself they are called gods.” অর্থাৎ, “রাজার অবস্থানই পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। কারণ, রাজাগণ পৃথিবীর বুকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং ঈশ্বরের সিংহাসনে আসীন। শুধু তাই নয়, স্বয়ং ঈশ্বর তাদেরকে ঈশ্বর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।” (মাইক্রোসফট এনকার্টা)

পক্ষান্তরে ইসলামে আল্লাহর নির্দেশ, হুকুম বা বিধান সকল মানুষের জন্য উন্মুক্তভাবে প্রদান করা হয়েছে। ‘রাজ্যশাসন’ বিষয়েও আল্লাহ মূলনীতি প্রদান করেছেন। এগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। এর প্রয়োগে, ব্যাখ্যা বা আইন প্রণয়নে রাজা বা যাজকগণের কোনোরূপ বিশেষত্ব নেই। বরং রাজ্যশাসন বিষয়ক ইসলামের নীতিমালা ‘লিখিত সংবিধানের’ মতোই স্বৈরতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের অধিকার রক্ষার অন্যতম মাধ্যম।

গণতন্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব, গণতন্ত্র নির্ধারিত কোনো সরকার ব্যবস্থা নয়। রাজ্যশাসন ব্যবস্থায় যে কোনোভাবে জনগণের অংশীদারিত্ব, পরামর্শ গ্রহণ ও জনগণের নিকট জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকলেই তাকে ‘গণতন্ত্র’ বলা যায়। এ অর্থে মূলত ইসলামই সর্বপ্রথম একটি ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রদান করেছে। ইসলামের আগে গ্রীস ও রোমে গণতন্ত্রের কিছু চর্চা হয়েছিল। এরপর তা বিলীন হয়ে যায় এবং বিশ্বের সর্বত্র রাজতান্ত্রিক বা যাজকতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসূলু্ল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম পরামর্শভিত্তিক প্রতিনিধিত্বমূলক ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা প্রদান করেন।

জনগণতান্ত্রিক এ নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন তৎকালীন প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে খিলাফতে রাশেদার পর থেকেই কমবেশি বিচ্যুতি শুরু হয়। তারপরেও ইসলামের ইতিহাসের যে কোনো যুগের স্বৈরাচারী শাসকদের সাথে তৎকালীন ইউরোপের চার্চ ও খৃস্টান শাসকদের তুলনা করলে যে কোনো গবেষক নিশ্চিত হবেন, ইসলামের এ মূলনীতির প্রভাব সর্বদা বিদ্যমান ছিল। [সমাপ্ত]

লেখক, খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

Related posts

Top