ইসলামে রাষ্ট্রধারণা [দ্বিতীয় পর্ব]

বস্তুত রাসূলুল্লাহর (সা) আগমনের সময়ে পৃথিবীতে বিদ্যমান রাষ্ট্রগুলির মধ্যে তিনটি মূল বিষয় দেখা যায়:

প্রথমত- রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস বংশ বা জবরদখল: রাজবংশের কেউ রাজা হবে এটাই ছিল সর্বজন স্বীকৃত রীতি। রাজতন্ত্রের বাইরে ক্ষমতা গ্রহণের একমাত্র উৎস ছিল অস্ত্র বা জবরদখল। রাজাকে হত্যা করে বা অস্ত্রের ক্ষমতায় রাজদণ্ড গ্রহণ করা।

দ্বিতীয়ত- রাষ্ট্রের মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব রাজার: রাজ্যের সকল সম্পদ ও নাগরিক রাজার মালিকানাধীন। তিনি সকল জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্রের সম্পদ ও নাগরিকদের বিষয়ে তিনি ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন এবং তার সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত।

এরূপ সর্বোচ্চ ক্ষমতা বুঝাতে ইংরেজিতে sovereignty শব্দটি ব্যবহার করা হয়। শব্দটি প্রাচীন ফরাসী souverain, ল্যাটিন superanus/super শব্দ থেকে এসেছে। এর মূল অর্থ above বা ঊর্ধ্বে। যেহেতু রাজার ক্ষমতা সকলের ঊর্ধ্বে সেহেতু রাজাকে ইংরেজিতে sovereign বলা হয়। ইংরেজিতে sovereign অর্থই king বা রাজা। আরবি অভিধানেও sovereign অর্থ ملك (মালিক তথা রাজা)। আর sovereignty শব্দের অর্থ বাংলায় রাজত্ব এবং আরবিতে الملك (মুলক) বা السيادة (সিয়াদাত), অর্থাৎ রাজত্ব বা কর্তৃত্ব।

বাংলায় এর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। বাংলা এ শব্দটি ‘সর্বভূমি’ থেকে গৃহীত। এর অর্থ ‘বিশ্বজনীন’ বা universal হওয়া উচিত। ইংরেজি sovereign বা সবোর্চ্চ শব্দের মূল অর্থের সাথে বাংলা সর্বভূমি বা বিশ্বজনীন শব্দের মূল অর্থের মিল নেই। তবে প্রাচীন যুগে ‘সারা বিশ্বে পরিচিত’ অর্থে শাসক বা বড় পণ্ডিতকে ‘সার্বভৌম’ উপাধি দেওয়া হতো। এভাবে রাজাকে ‘সার্বভৌম’ বলার প্রচলন ঘটে। আর এ থেকেই রাজত্বকে সার্বভৌমত্ব বলা হয়।

তৃতীয়ত- রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা প্রতিভূ: প্রায় সকল সমাজেই রাজাকে কোনো না কোনোভাবে ঈশ্বরের পুত্র, প্রতিনিধি বা বংশধর বলে কল্পনা করে তাকে ঐশ্বরিক বা ধর্মীয় পবিত্রতা, অধিকার ও অভ্রান্ততা (infallibility) প্রদান করা হয়েছে। বিশেষত খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শুরুতে বাইজেন্টাইন-রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা প্রদানের পর থেকে ইউরোপে থিওক্র্যাটিক শাসনের শুরু হয় এবং ধর্মের নামে বা আল্লাহর নামে শাসক ও পুরোহিতদেরকে আল্লাহর প্রতিনিধি ও প্রতিভূ হিসেবে বিশেষ পবিত্রতা প্রদান করা হয়। তাদের নির্দেশ আক্ষরিক অর্থে পালন করা ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের নির্দেশ অমান্য করা ধর্মদ্রোহিতা বলে গণ্য হয়।

অন্যদিকে, রাসূলুল্লাহ (সা) রাষ্ট্রের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মূলনীতি প্রদান করেছেন। তাঁর দেওয়া মূলনীতির প্রধান দিকগুলো নিম্নরূপ:

প্রথমত- রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস হলো নাগরিকদের পরামর্শ: কোরআন কারীমে এবং হাদীস শরীফে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের পরামর্শ গ্রহণের নির্দেশ মুমিনকে দেওয়া হয়েছে। এ মূলনীতি হাতে-কলমে শেখানোর জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পরে কাউকে রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য মনোনয়ন দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। যেন মুসলমানগণ পরামর্শ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ করতে পারেন।

মুমিনদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ “যারা তাদের প্রতিপালকের আহবানে সাড়া দিয়েছে, নামাজ কায়েম করেছে, তাদের কর্ম তাদের মধ্যে পারস্পরিক পরামর্শভিত্তিক এবং তাদেরকে যা রিজিক প্রদান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।”

তাহলে, মুমিনদের সকল কর্ম হবে তাদের সকলের পরামর্শভিত্তিক। যে বিষয়ে আল্লাহর সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই, এরূপ যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের পরামর্শ গ্রহণই মুসলিম সমাজের বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি হলো এ জাতীয় বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ, এটি সকল নাগরিকের স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট। শাসক, প্রশাসক, সরকার বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন, নির্বাচনের মেয়াদ, সরকার পরিচালনা পদ্ধতি, এ বিষয়ক নীতি নির্ধারণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা হলো সংশ্লিষ্ট সকলেই পরামর্শ প্রদান করবেন। নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাধারণ-অসাধারণ সকলের পরামর্শ গ্রহণ এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। কাউকে বাদ দেওয়ার কোনোরূপ নির্দেশনা নেই। যদি কেউ পরামর্শ দেন ও অন্যরা মেনে নেন তাহলেও অসুবিধা নেই।

কোরআন-হাদীসে সংশ্লিষ্ট সকলের পরামর্শ গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তবে পরামর্শ গ্রহণের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। বরং অন্যান্য জাগতিক ও উপকরণ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির মতো এ বিষয়টিকে যুগ, জাতি ও পরিবেশের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মানুষদের অবস্থা অনুসারে সরাসরি সকল নাগরিকের, তাদের প্রতিনিধিদের, গোত্রপতিদের, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের বা সামাজিক নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। এরূপ পরামর্শ গ্রহণ মৌখিক হতে পারে বা গোপন ব্যালটে হতে পারে। এক্ষেত্রে পরামর্শ গ্রহণের কোনো একটি পদ্ধতিকে ইসলামী বা ইসলাম বিরোধী বলে গণ্য করার কোনো সুযোগ নেই।

সাহাবীগণ যুগ বা পরবর্তী যুগে ছিল না বলে কিংবা প্রাচীন ফিকাহ গ্রন্থে লেখা নেই বলে সার্বজনীন ভোট ব্যবস্থা, ৪/৫ বছর পর পর ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা বা পরামর্শ গ্রহণের অনুরূপ কোনো পদ্ধতিকে ইসলাম বিরোধী বলে চিন্তা করা আর মাদ্রাসার পরীক্ষা ব্যবস্থা, সনদ প্রদানের ব্যবস্থা, ছাপানো বই পড়ার ব্যবস্থা বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যবহারকে ইসলাম বিরোধী বা নিষিদ্ধ বলে চিন্তা করা একই ধরনের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি।

দ্বিতীয়ত- রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের: মালিকানা দুই প্রকার। (১) সকল কিছুর প্রকৃত মালিকানা মহান আল্লাহর। তিনিই মালিক, রাজা বা sovereign। (২) পাশাপাশি জাগতিকভাবে মানুষকে দুনিয়াতে তার সম্পদের মালিকানা প্রদান করা হয়েছে এবং মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এভাবে রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের।

আমরা দেখেছি, প্রাচীন ব্যবস্থায় রাজা ছিলেন sovereign বা সার্বভৌম। রাজ্যের সকল সম্পদ ও নাগরিকের সর্বোচ্চ বা প্রশ্নাতীত মালিকানা (sovereignty) ছিল তার একার। তিনি নিজের প্রয়োজন, সুবিধা ও ইচ্ছামতো তা ব্যবহার করবেন, এতে কারো কোনো আপত্তি বা প্রশ্ন করার অধিকার ছিল না। পক্ষান্তরে ইসলামে রাষ্ট্রের মালিকানা নাগরিকদের। একজন মুমিন নিজের মালিকানাধীন জমিন যেমন আল্লাহর নির্দেশের আওতায় নিজের প্রয়োজন, সুবিধা ও ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি রাষ্ট্রের জনগণ রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ও সম্পদ আল্লাহর নির্দেশের আওতায় থেকে নিজেদের প্রয়োজন ও সুবিধা অনুসারে ব্যবহার করবেন।

নিজের মালিকানাধীন সম্পদ, অর্থ ও অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় রাষ্ট্রের বিষয়াবলিও আল্লাহর নির্দেশ মতো পরিচালনার করার বিষয়ে জনগণ দায়বদ্ধ। এ দায় পালনের জন্য শাসক হলেন জনগণের প্রতিনিধি। শাসক রাষ্ট্রের মালিক নন, বরং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তাই তিনি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। জনগণ তাকে যে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে, শাসন ও সংশোধন করতে পারে।

এজন্যই শাসক বা সরকার নির্বাচনে জনগণের পরামর্শ গ্রহণের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের মধ্য থেকে তাদের পরামর্শে সরকার নির্বাচিত হবে। আর তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

তৃতীয়ত- শাসকের কোনো অভ্রান্ততা বা পবিত্রতা নেই: ইসলামের দৃষ্টিতে শাসক কখনোই আল্লাহর খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত (successor/vicar) নন। অন্য সকল মানুষের মতোই তিনি আল্লাহর বিধান ও ব্যবস্থার অধীন। মহান আল্লাহ রাষ্ট্র পরিচালনা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যে মূলনীতি প্রদান করেছেন তা পালন করতে তিনি বাধ্য।

রাষ্ট্রপরিচালনা বিষয়ে ইসলাম কিছু মূলনীতি দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা; জীবন, জীবিকা, ধর্ম, বাসস্থান ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; জনগণের পরামর্শ গ্রহণ করা, বৈষম্যহীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, অপরাধীর সঠিক শাস্তি নিশ্চিত করা ইত্যাদি। বিচার ও শাস্তির ক্ষেত্রে ইসলামে কিছু শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যেগুলো সমাজের অপরাধ দমন করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে। অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে শাসক, সরকার বা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী শাস্তির ব্যবস্থা করবেন।

এ সকল মূলনীতি ও বিধিবিধানের প্রয়োগ এবং ইসলামের নির্দেশনার ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে শাসকের নিজস্ব কোনো পবিত্রতা বা অভ্রান্ততা নেই। জনগণকে শাসন করা, নির্দেশ দেওয়া বা আল্লাহর বিধানের ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তাঁর নিজের মতের কোনো বিশেষ মূল্য নেই। তার ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত ভুল বলে মনে হলে যে কেউ তার সমালোচনা এবং ভুল সংশোধন করতে পারেন।

অন্যান্য মুয়ামালাতের ন্যায় রাষ্ট্রনীতি ও আইন-বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামে মূলনীতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে। কয়েকটি অপরাধের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়া কঠিন করা হয়েছে। নীতি, বিধান ইত্যাদির ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ব্যাপারে কাউকে অভ্রান্ততা দেওয়া হয়নি। এজন্য মুসলিম দেশগুলোতে কখনোই ইউরোপের মতো স্বৈরাচার বা থিওক্র্যাসি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় আলেমগণ কখনো ধর্মের নামে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। আলেমগণ কোরআন-হাদীসের নীতিমালা ব্যাখ্যা করেছেন, আর শাসকগণ তা প্রয়োগ করেছেন। উভয় বিভাগেরই স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা ছিল। ব্যাখ্যায় ভুল হয়েছে বলে মনে হলে শাসকগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সকল আলেমের পরামর্শ নিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে ভুল হয়েছে মনে করলে জনগণ ও আলেমগণ প্রতিবাদ করেছেন। সকল স্বৈরাচারী শাসনের মধ্যেও শাসকের সমালোচনা, কমবেশি বাকস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, গবেষণা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত ছিল। কখনোই কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে ধর্মের নামে ভিন্নমতাবলম্বী বা ভিন্নধর্মীর উপর নিয়মতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন করা হয়নি। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতক থেকে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত ইউরোপ, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের যে কোনো অমুসলিম দেশের সাথে সে যুগের মুসলিম দেশগুলোর অবস্থা তুলনা করলে যে কোনো গবেষক নিশ্চিত হবেন যে, মুসলিম দেশগুলোতে সকল ধর্মের মানুষ সর্বোচ্চ নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেছেন।

[চলবে…]

Related posts

Top