ইসলামে রাষ্ট্রধারণা [প্রথম পর্ব]

ইসলাম ও রাষ্ট্র: ইসলাম ধর্ম ও ইসলামী সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বকে নিয়ে ইসলাম একটি সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা। তবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাভাবিক পার্থক্য রক্ষা করা হয়েছে ইসলামে। রাষ্ট্রব্যবস্থাসহ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া সকল দেশের সকল সমাজের মানুষের জন্য পালনীয় প্রশস্ততা ইসলামে রয়েছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে মুমিনের ধর্ম পালনের জন্য শর্ত বা মূল বিষয় বলে গণ্য করা হয়নি। রাষ্ট্র ব্যবস্থা ইসলামের একটি অংশ। ইসলামে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান আছে। তবে ইসলাম শুধু রাষ্ট্র ব্যবস্থার নাম নয়।

ইসলামের আরাকান এবং অন্যান্য ফরজ ও নফল ইবাদত সাধ্যমত পালনের মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি নিজের জীবনে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্ঠা করবেন। কোনো মুসলিম রাষ্ট্রীয় কোনো দায়িত্বে থাকলে তিনি তার দায়িত্ব আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে পালন করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে তার নিজ জীবনের অন্যান্য কর্মের মতো রাষ্ট্রীয় কর্ম আল্লাহর হুকুম মতো পালন করা তার দায়িত্ব। অন্যান্য মুসলিমের দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি বা পরিবারের সকল ক্ষেত্রে সবাইকে আল্লাহর হুকুম পালন করার জন্য দাওয়াত দেওয়া। যে কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহ বা তাঁর রাসূলের (সা) নির্দেশ লঙ্ঘিত হলে সুযোগ ও সাধ্যমত কোরআন নির্দেশিত উত্তম আচরণ দ্বারা খারাপ আচরণের প্রতিরোধ পদ্ধতিতে দাওয়াত, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের মাধ্যমে তা সংশোধন ও পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। তবে এ চেষ্টা সফল না হলে মুমিনের দ্বীন পালন ব্যাহত হবে কিংবা সমাজ ও রাষ্ট্রের পাপের কারণে ব্যক্তি মুমিন পাপী হবেন– এরূপ চিন্তার কোনো ভিত্তি নেই।

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি: ইসলাম সর্বকালের ও সর্বযুগের সমগ্র মানব জাতির জন্য স্থায়ী জীবন ব্যবস্থা এবং বিশ্বজনীন ও সর্বজনীন ধর্ম। কোরআনে কারীম, হাদীসে রাসূল (সা) ও সাহাবীগণের জীবন পদ্ধতি থেকে আমরা দেখতে পাই, এতে দুটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে: (১) যুগ, সমাজ, সামাজিক রুচি ও আচার আচরণের পরিবর্তনের ফলে ইসলামের ধর্মীয় রূপে যেন পরিবর্তন না আসে। (২) যুগ, সমাজ, আচার-আচরণ ইত্যাদির পরিবর্তনের কারণে ইসলামের আহকাম পালনে যেন কারো কোনো অসুবিধা না হয়। সকল যুগের সকল দেশের মানুষেরা যেন সহজেই জীবনধর্ম ইসলাম পালন করতে পারে।

এ মূলনীতির ভিত্তিতে ইসলামে মানবজীবনের কর্মকাণ্ডকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: (১) ইবাদত ও (২) মুয়ামালাত। মানুষকে জীবন ধারণ করতে জাগতিক ও জৈবিক প্রয়োজনে যা করতে হয় এবং বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী ও ধার্মিক-অধার্মিক সকলেই যা করেন তা মুয়ামালাত বা জাগতিক কর্ম বলে গণ্য। আর জাগতিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে শুধু মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য মানুষ যে কর্ম করে তা ইবাদত বলে গণ্য।

ইবাদত ও মুয়ামালাতের পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমার লেখা ‘এহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থটি পাঠ করতে পাঠককে অনুরোধ করছি। এখানে সংক্ষেপে এটুকু বলা যায়– ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলামে বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি নিয়ম-পদ্ধতি ও বিধিবিধান প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) যে কর্ম যেভাবে করেছেন, অবিকল সেভাবে করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে মুয়ামালাত বা জাগতিক কর্মের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশস্ততা দেওয়া হয়েছে। কিছু মূলনীতি প্রদান করা হয়েছে এবং ফরজ ও হারাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে সবই বৈধ বলে গণ্য হবে। মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে রাসূলূল্লাহ (সা) থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা বৈধ বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) যা করেননি তা করা নিষিদ্ধ। আর মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) যা নিষেধ করেছেন শুধু তাই নিষিদ্ধ, যা তিনি নিষেধ করেননি তা বৈধ।

চাষাবাদ, চিকিৎসা, বাড়িঘর তৈরি ইত্যাদি জাগতিক বিষয়ে যেমন প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে, তেমনি প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে ইবাদত পালনের জাগতিক উপকরণের ক্ষেত্রে। যেমন ইলম শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে শিক্ষার পদ্ধতি, উপকরণ ইত্যাদির বিষয় উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কেই বলতে পারেন না যে, সাহাবীদের যুগে ছাপানো বই, পরীক্ষা পদ্ধতি বা সনদ প্রদানের পদ্ধতি ছিল না, কাজেই এখন তা নিষিদ্ধ। বরং যতক্ষণ না শরীয়তে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যাবে ততক্ষণ তা বৈধ।

বিবাহ, পরিবার গঠন, আবাসন, চিকিৎসা ইত্যাদির মতো রাষ্ট্র গঠন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও এ বিষয়ক দায়িত্বাবলি ‘মুয়ামালাত’। এজন্য এ বিষয়ে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে প্রশস্ততা প্রদান করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর খুঁটিনাটি বিষয়ে দেশ, যুগ, জাতি ও পরিবেশের আলোকে ভিন্নতার অবকাশ রাখা হয়েছে।

এ সকল মূলনীতির আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি আলোচনার জন্য পৃথক গ্রন্থের প্রয়োজন। এখানে সংক্ষেপে বলা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্র ‘থিওক্র্যাটিক’ বা পুরোহিততান্ত্রিক নয়, বরং জনগণতান্ত্রিক। এখানে মোল্লা, পুরোহিত, ইমাম বা অন্য কোনো ধর্মীয় নেতাকে ‘আল্লাহর নামে’ বা ‘আল্লাহর খলীফা’ হয়ে শাসন করার ক্ষমতা বা সুযোগ দেওয়া হয়নি। ইসলামে কখনোই শাসককে ‘আল্লাহর খলীফা’ হিসেবে গণ্য করা হয়নি, তাকে বিশেষ অধিকার, ক্ষমতা বা অভ্রান্ততা প্রদান করা হয়নি বা তাকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখা হয়নি। বরং শাসককে জনগণের প্রতিনিধি ও জনগণের কাছে জবাবদিহিতা রয়েছে বলে গণ্য করা হয়েছে।

কেবলমাত্র ‘শিয়া’ সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসে ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রাজতান্ত্রিক ও পুরোহিততান্ত্রিক বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁরা বিশ্বাস করেন, ইসলামের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বা রাষ্ট্রক্ষমতা আলীর (রা) বংশধরদের পাওনা। আর ‘রাষ্ট্রীয় নেতা’ বা ইমাম আল্লাহর খলীফা হিসেবে বিশেষ জ্ঞান, ক্ষমতা ও অধিকার সংরক্ষণ করেন। রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তাঁর মতামতই চূড়ান্ত। তাঁর অনুপস্থিতি বা অদৃশ্য থাকা অবস্থায় ‘ফকীহ’ তাঁর প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। কোরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনার আলোকে সাহাবীগণ ও পরবর্তী মূলধারার মুসলিম আলিমগণ এ মত প্রত্যাখ্যান করেছেন।

[চলবে…]

Related posts

Top