কন্যা সন্তান মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত [দ্বিতীয় পর্ব]

ইসলাম কন্যা সন্তানকে অপমান মনে করা কিংবা জীবন্ত পুঁতে ফেলার মত জুলুম-প্রথার অবসান ঘটিয়েছে। তাই এ প্রথার সাথে মুসলমানের কোনোরূপ সামঞ্জস্য থাকা উচিত নয়। কন্যা সন্তান হলে কোনোরূপ অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়। মুসলমানদের এ কাজ পরিহার করা উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমনিভাবে কন্যা সন্তান হওয়াকে আল্লাহর রহমত বলেছেন এবং কন্যা সন্তানের সাথে তিনি যে ভালোবাসা, মহব্বত ও স্নেহের প্রকাশ ঘটিয়েছেন- এ আমাদের আদর্শ। আমাদের উচিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই অনুসরণ করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মপন্থা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কন্যাদের সাথে অত্যন্ত মহব্বত ও স্নেহের আচরণ করতেন। তাঁর চারজন কন্যা সন্তান ছিলেন। ফাতেমা রাযিআল্লাহু আনহা, যয়নব রাযিআল্লাহু আনহা, রুকাইয়া রাযিআল্লাহু আনহা, উম্মে কুলসুম রাযিআল্লাহু আনহা। প্রথম তিন মেয়ের ইন্তিকাল আগে হয়ে যায়। হযরত ফাতেমা রাযিআল্লাহু আনহার ইন্তিকাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের ছয় মাস পরে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো সফরে যেতেন, সবশেষে ফাতেমা রাযিআল্লাহু আনহার সাথে দেখা করে যেতেন। আবার যখন সফর থেকে ফিরে আসতেন, সর্বপ্রথম ফাতেমা রাযিআল্লাহু আনহার সাথে দেখা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের আমলের মাধ্যমে কন্যা সন্তানের সম্মান, তার প্রতি স্নেহ ও মহব্বতের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যেন আমরাও তাঁর অনুসরণের মাধ্যমে নিজের কন্যা সন্তানের সাথে তেমন আচরণ করতে পারি, যেমনটি তিনি তার কন্যাদের সাথে করে দেখিয়েছেন।

কন্যার লালনপালন জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা সন্তানের লালনপালনের যে পরিমাণ ফযীলতের কথা বলেছেন, পুত্র সন্তান লালনপালনের ক্ষেত্রে সে পরিমাণ বলেননি। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- لاَ يَكُونُ لأَحَدِكُمْ ثَلاَثُ بَنَاتٍ أَوْ ثَلاَثُ أَخَوَاتٍ فَيُحْسِنُ إِلَيْهِنّ إِلاّ دَخَلَ الجَنّةَ. যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান বা তিনজন বোন আছে। আর সে তাদের সাথে উত্তম আচরণ করেছে তাদেরকে নিজের জন্য অসম্মানের কারণ মনে করেনি সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১২ অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- مَنْ كَانَ لَهُ ثَلاَثُ بَنَاتٍ أَوْ ثَلاَثُ أَخَوَاتٍ أَوْ ابْنَتَانِ أَوْ أُخْتَانِ فَأَحْسَنَ صُحْبَتَهُنّ وَاتّقَى اللّهَ فِيهِنّ فَلَهُ الجَنّةُ. যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান বা তিনজন বোন আছে অথবা দু’জন কন্যা সন্তান বা বোন আছে। সে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করেছে এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করেছে। তার জন্য রয়েছে জান্নাত। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৬ দেখুন, এ ফযীলতের কথা পুত্র সন্তানের বেলায় বলা হয়নি। বরং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। এজন্য আমাদের উচিত কন্যা সন্তানের লালনপালন সন্তুষ্টচিত্তে করা। কন্যা সন্তান জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায় হযরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ ابْتُلِيَ بِشَيْءٍ مِنَ البَنَاتِ فَصَبَرَ عَلَيْهِنّ كُنّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النّارِ. যে ব্যক্তিকে কন্যা সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সে ধৈর্যের সাথে তা সম্পাদন করেছে সেই কন্যা সন্তান তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড় হবে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৩ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী হওয়া দেখুন! জান্নাতে প্রবেশ করার মাধ্যমও হল কন্যা সন্তানের লালনপালন করা। আবার জাহান্নাম থেকেও মুক্তি মিলবে কন্যা সন্তানের উত্তমরূপে প্রতিপালন করার দ্বারা। এর চেয়ে বড় আরেকটি ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আনাস রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ دَخَلْتُ أَنَا وَهُوَ الجَنّةَ كَهَاتَيْنِ، وَأَشَارَ بِإصْبعَيْهِ. যে ব্যক্তি দুইজন কন্যা সন্তানকে লালনপালন ও দেখাশুনা করল [বিয়ের সময় হলে ভাল পাত্রের কাছে বিবাহ দিল] সে এবং আমি জান্নাতে এরূপ একসাথে প্রবেশ করব যেরূপ এ দুটি আঙুল। তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখালেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৪

কন্যা সন্তান প্রতিপালনের তিনটি ফযীলত: এক. আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। দুই. জান্নাত দান করবেন। যা নিআমত ও আরাম আয়েশের স্থান। তিন. আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য দান করবেন। যা সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ তিনটি ফযীলত বর্ণনা করেছেন কন্যা সন্তান লালনপালনকারীদের জন্য। কন্যা সন্তানের জন্মে অধিক আনন্দ প্রকাশ করা ইসলামের শিক্ষা হল, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে আনন্দ প্রকাশ করা; তাইতো কন্যা জন্মের সংবাদকে ‘সুসংবাদ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর সুসংবাদ শুনে মানুষ আনন্দই প্রকাশ করে। এজন্য অনেক উলামায়ে কেরাম লেখেন, যেহেতু কন্যা সন্তান জন্মানোর কারণে নিজেকে ছোট মনে করা, একে অপমান ও অসম্মানের কারণ মনে করা কাফিদের কর্মপন্থা, তাই মুসলমানগণের উচিত, তারা কন্যা সন্তানের জন্মের কারণে অধিক খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করবে। যাতে কাফিরদের এ নিচু রীতির প্রতিবাদ হয় এবং এ রীতি যেন বিলুপ্ত হয়ে যায়। কন্যা সন্তানের হকসমূহ কন্যা সন্তানের লালনপালনের ফযীলত বর্ণনার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা সন্তানের হকসমূহও বর্ণনা করেছেন। জাহেলী যুগে এ হকসমূহ থেকে কন্যা সন্তানকে বঞ্চিত করা হত। আজকালও তাদের হকসমূহ আদায়ের ব্যাপারে অবহেলা করা হয়। এজন্য তাদের হকগুলো বুঝে নেওয়া জরুরি। যেন এ ব্যাপারে আমাদের অবহেলা না হয়। ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা কারো পুত্র সন্তানের প্রতি ভালবাসা বেশি আবার কারো কন্যা সন্তানের প্রতি। অধিকাংশ লোকের পুত্র সন্তানের তুলনায় কন্যা সন্তানের প্রতি ভালবাসা কম থাকে। ভালবাসা ও মহব্বতের সম্পর্ক হল অন্তরের সাথে। এতে মানুষের ইচ্ছার দখল নেই। এজন্য এ ক্ষেত্রে সমতা রক্ষার বিষয়ে মানুষ বাধ্যও নয়। তবে ভালবাসা প্রকাশ মানুষের ইচ্ছার অধীন। এ ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা আবশ্যক। অনেকে ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রেও কমবেশি করে। তারা ছেলেকে বেশি বেশি খাওয়ায়, বেশি বেশি ঘুরতে নিয়ে যায়। আর মেয়েকে জিজ্ঞাসাও করে না। এভাবে সে মেয়ের সাথে ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে কমবেশি করে। যেহেতু ভালবাসা প্রকাশ করা মানুষের ইচ্ছাধীন বিষয় তাই এ ক্ষেত্রে কমবেশি করা অন্যায়। সুতরাং কখনো মা-বাবা কথায় ও কাজে এমন ভাব প্রকাশ করবে না, যাতে সন্তানরা বুঝতে পারে, মা-বাবা অমুককে বেশি ভালবাসেন, অমুককে কম ভালবাসেন। এমনটা করবে না। যদি মা-বাবা এমনটা করেন তাহলে তা হবে অন্যায় এবং কিয়ামতের দিন এর জন্য পাকড়াও করা হবে। সন্তানদের দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা যেমনি ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা উচিত তেমনি কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষার হুকুম রয়েছে। তাই মা-বাবা যদি তাদের জীবদ্দশায় সন্তানদের মাঝে টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় অথবা খাদ্যবস্তু বণ্টন করেন তবে সে ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা জরুরি। মেয়েকেও সেই পরিমাণ দিবে, যে পরিমাণে ছেলেকে দিয়েছে। মা-বাবা যখন প্রয়োজনের বাইরে অথবা খুশি হয়ে সন্তানদের কিছু দিবে সে ক্ষেত্রেও এ সমতা রক্ষা করা আবশ্যক। যেমন, ঈদের সময় ঈদের বকশিশ অথবা সফর থেকে ফিরে এসে সন্তানদের হাদিয়া দেওয়া ইত্যাদি। প্রয়োজনের বিষয়টি ভিন্ন কিন্তু বাবা-মা যদি প্রয়োজনে কোনো সন্তানের জন্য কিছু ব্যয় করেন যেমন, অসুস্থতার জন্য খরচ করছেন, কারো শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করছেন, ছেলে অথবা মেয়ে কেউ সফরে যাচ্ছে, কারো সফর ছোট কারো সফর বড়, কারো সফরে বেশি টাকার প্রয়োজন আবার কারো কম, এমনিভাবে প্রয়োজনের সময় সন্তানদের জন্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে কমবেশি করার মধ্যে কোনো গোনাহ নেই। বরং যার যতটুকু প্রয়োজন তাকে ততটুকু দিতে পারবে। বিয়ের কারণে মেয়ের হক শেষ হয়ে যায় না আমাদের সমাজের অবস্থা তো এমন যে, প্রথমত মেয়েদেরকে ধন-সম্পদ ও জায়গা-জমি দেওয়াই হয় না। আর যদি তাকে বলা হয়, তুমি তো সবকিছু ছেলেদেরকেই দিয়ে দিয়েছ, মেয়েদেরকে তো কিছুই দিলে না! উত্তরে বলা হয়, তাদের বিয়ে-শাদী তো দিয়েছি। মেয়ের বিয়েতে যে যৌতুক দিয়েছি তাতে তার হক আদায় হয়ে গেছে। (যৌতুক দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়।) স্মরণ রাখুন! এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। যেমন মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার দ্বারা পিতার মীরাছ থেকে মেয়ের হক শেষ হয়ে যায় না তেমনি যৌতুক দেওয়ার কারণে মেয়েকে ধন-সম্পদ ও জায়গা-জমি থেকে বঞ্চিত করাও ঠিক নয়। পিতা যেমন মেয়ের বিয়েতে খরচ করে তেমনি ছেলের বিয়েতেও খরচ করে। বরং সাধারণত ছেলের বিয়েতে মেয়ের বিয়ের চেয়ে বেশি খরচ করা হয়। অথচ বিয়ে-শাদীর খরচের ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা উচিত। এর সহজ একটি পদ্ধতি হচ্ছে, আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় অর্থের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঠিক করে নিবে যে, আমি আমার প্রত্যেক ছেলেমেয়ের বিয়েতে এ পরিমাণ টাকা ব্যয় করব। বিয়ের খরচাদি করার পরও যদি নির্ধারিত পরিমাণ থেকে কিছু টাকা বাকি থেকে যায় তবে তাকে দিয়ে দিবে। এমনটি করবে না, এক সন্তানের বিয়েতে বেশি খরচ করবে আর অন্য সন্তানের বিয়েতে কম খরচ করবে। এটাও এক প্রকার অন্যায় ও নাইনসাফী।

সারকথা পুরো আলোচনার সারমর্ম হচ্ছে : এক. কন্যা সন্তান হলে পেরেশানি, রাগ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা না জায়েয। এটা ইসলামী কর্মপন্থা নয়। ইসলাম এ বিষয়ের নিন্দা করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে এর ভ্রান্ততা সাব্যস্ত করেছেন। তাই মুসলমানদের এ ধরনের কর্মকা- থেকে বিরত থাকা উচিত। যখন কারো কন্যা সন্তান হয় তখন সে যেন ঐ রকম খুশিই প্রকাশ করে, যেমনটি ছেলে সন্তান হলে করা হয়।

দুই. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা সন্তান লালনপালনের যে ফযীলত ও সাওয়াবের উল্লেখ করেছেন এর উপর বিশ্বাস রাখবে এবং এর উপরই সন্তুষ্ট থাকবে। এ কথা ভাববে যে, এই এক মেয়েই আমার জান্নাতে যাওয়ার কারণ হতে পারে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হতে পারে। তাই পূর্ণ খুশি ও সন্তুষ্টির সাথে যেভাবে ছেলেদের লালনপালন করা হয় ঠিক সেভাবেই মেয়েদেরও লালনপালন করবে।

[সমাপ্ত]

Related posts

Top