কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান

কুরআন ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক, বিশেষত যখন দেখা যায় যে, ঐ সম্পর্ক হচ্ছে মিলের, অমিলের নয়। আজ কাল অনেকেই মনে করেন যে, ধর্মীয় গ্রন্থের সঙ্গে বিজ্ঞানের ধর্মনিরপেক্ষ ধ্যান-ধারণার মুকাবিলা একটি গোলকধাধা বিশেষ। অল্প কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া, বর্তমান যুগে অধিকাংশ বিজ্ঞানীই বস্তুতন্ত্রের বেড়াজালে আটক হয়ে আছেন। ধর্মকে তারা কিংবদন্তি ছাড়া আর কিছুই মনে করেন না এবং ধর্মীয় ব্যাপারে তারা হয় উদাসীন থাকেন, আর না হয় সরাসরি ঘৃণা পোষণ করেন। তাছাড়া পাশ্চাত্যে যখন ধর্ম ও বিজ্ঞান সম্পর্কে আলোচনা হয়, তখন লোকে ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্মের কথাই উল্লেখ করে থাকে, ইসলামের কথা কেউ কখনও চিন্তাও করে না। আসলে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ইসলাম সম্পর্কে এমন ব্যাপক ভুল ধারণা প্রচারিত হয়েছে যে, প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণা পাওয়া সেখানে সত্যিই কঠিন। ইসলাম ও বিজ্ঞান সম্পর্কে কোন তুলনামুলক আলোচনায় যাবার আগে ইসলামের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা বিশেষভাবে প্রয়োজন। কারণ, পাশ্চাত্যে এ ধর্মটি অতি অল্পই পরিচিত।

কুরআনের আসলত্ব, কিভাবে তা লেখা হয় : কুরআনের আসল হওয়া সম্পর্কে কোন মতবিরোধ না থাকায় বিভিন্ন অহির গ্রন্থের মধ্যে এ গ্রন্থের একটি বিশিষ্ট একক স্থান আছে। এ বৈশিষ্ট নিউ টেস্টামেন্টেও নেই, ওল্ড টেস্টামেন্টেও নেই। এ দুখানি গ্রন্থ যে কিভাবে রদবদল হতে হতে বর্তমান আকারে এসে দাড়িয়েছে, প্রথম দুটি অধ্যায়ে আমরা তাঁর বিবরণ দিয়েছি। কুরানের ক্ষেত্রে কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি, কারণ কুরআন মুহাম্মদের (সা.) আমলেই লিখে ফেলা হয়েছিল। কিভাবে লেখা হয়েছিল, অর্থাৎ প্রক্রিয়া কি ছিল, একটু পরেই তা আমরা বর্ণনা করব।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কুরানের সঙ্গে বাইবেলের যে পার্থক্য আছে, তা কোন মতেই মূলত এ দুটি গ্রন্থের নাযিল হওয়ার তারিখের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কিছু লোক এ ধরনে প্রশ্ন উত্থাপন করে থাকেন বটে, কিন্তু ইহুদী-খৃষ্ট গ্রন্থ এবং কুরআন যখন লেখা হয়েছিল, তৎকালীন পরিবেশ পরিস্থিতিও তারা বিবেচনা করেন না। তারা বলে থাকেন যে, পনের শত বছরের পুরোনো গ্রন্থের তুলনায় সপ্তম শতাব্দীর একখানি গ্রন্থের বিনা রদবদল আমাদের সময় পর্যন্ত চলে আসার সম্ভাবনাই বেশী। সে কথা ঠিক, কিন্তু কারণ হিসেবে এটা যথেষ্ট নয়। ইহুদী-খৃষ্ট গ্রন্থে যে রদবদল হয়েছে, তার অজুহাত হিসেবেই এ কথা বলা হয়ে থাকে, কিন্তু মানুষের দ্বারা কুরআনের এবারতের রদবদল হওয়ার যে আদৌ কোন আশংকা ছিল না সে সত্যের স্বীকৃতি এ কথায় নে

ওল্ড টেস্টামেন্টের ক্ষেত্রে যেহেতু বহু লেখক একই কাহিনী বর্ণনা করেছেন এবং কতিপয় গ্রন্থ যেহেতু খৃষ্টপূর্ব আমল থেকে বহুবার সংশোধিত হয়েছে, সেহেতু ভুল ও স্ববিরোধিতার ঠিক অতগুলির কারণ ঘটেছে। আর নিউ টেস্টামেন্ট অর্থাৎ গসপেলের ক্ষেত্রে কেউই দাবী করতে পারেন না যে, এ গ্রন্থে যিশুর বাণী বা তাঁর কাজের বিবরণ সঠিক ও বাস্তব সম্মতভাবে লিপিবদ্ধ করা আছে। তাছাড়া আমরা আগেই দেখেছি যে, বিভিন্ন সময়ে এবারতের যে সকল পাঠ একটির পর একটি প্রস্তুত করা হয়েছে তাঁর কোন একটিও আসল ছিল না এবং ঐ সকল পাঠের লেখকগণের একজনও প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না।[বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান]

আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি : বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে ওল্ড টেস্টামেন্টে একটিমাত্র জায়গায় যেমন একটি দীর্ঘ একক বর্ণনা আছে, কুরআনে তেমন কোন একক বর্ণনা নেই। একটিমাত্র ধারাবাহিক বর্ণনার বদলে কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এমন অনেক অনুচ্ছেদ আছে, যেখানে সৃষ্টির কতিপয় দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে এবং সৃষ্টির ক্রমবিকাশের পরবর্তী ঘটনাবলী সম্পর্কে নানাবিধ তথ্য দেয়া হয়েছে। এ তথ্য কখনও বিস্তারিত কখনও সংক্ষিপ্ত। ঐ ঘটনাবলী কিভাবে বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হলে বহুসংখ্যক সূরা থেকে আয়াত সংগ্রহ করে একত্রিত করা প্রয়োজন।

কেবলমাত্র বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কেই যে এ অবস্থা বিদ্যমান তা কিন্তু নয়। একই বিষয় সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও প্রসঙ্গ বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে, এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই কুরআনে রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ পৃথিবী বা আকাশমন্ডল সম্পর্কিত নানা বিষয়, কিংবা মানবজাতি সম্পর্কিত বিবিধ বিষয়ের উল্লেখ করা যেতে পারে এবং এ বিষয়গুলি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকগণ আগ্রহী বা কৌতুহলী হতে পারেন। এ সকল বিষয়ের প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিশ্রম করে আয়াতগুলি একত্রিত করার চেষ্টা হয়েছে।

অনেক ইউরোপীয় ভাষ্যকারই মনে করেন যে, সৃষ্টি সম্পর্কে কুরআন ও বাইবেলের বর্ণনা একই প্রকারের এবং এ কারণে তারা এ দুটি বর্ণনা পাশাপাশি উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু আমি মনে করি যে, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ বর্ণনা দুটির মধ্যে স্পষ্টতই অনেক পার্থক্য রয়েছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আদৌ গুরুত্বহীন নয়, এমন অনেক বিষয়ে কুরআনে বিবরণ আছে, কিন্তু বাইবেলের থেকে আদৌ গুরুত্বহীন নয়, এমন অনেক বিষয়ে কুরআনে বিবরণ আছে, কিন্তু বাইবেলে তাঁর কোন সমকক্ষ নেই। আবার বাইবেলেও এমন বিবরণ আছে, কুরআনে যার কোন সমকক্ষ নেই।

দুই এবারতের দৃশ্যত সাদৃশ্যের ব্যাপারটি সর্বজনবিদিত। এ সাদৃশ্যের মধ্যে প্রথম দৃষ্টিতেই দেখা যায় যে, উভয় ক্ষেত্রেই সৃষ্টিকার্য ছয়টি পর্যায়ে সম্পাদিত হয়েছে বলা আছে। বাইবেলে ছয় দিনের কথা বলা হয়েছে, কুরানেও ছয় দিনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আসলে বিষয়টি অমন সহজ নয়, বেশ জটিল; সুতরাং একটু পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন আছে। [বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান]

কুরআনে দুনিয়া ও আকশমন্ডল সৃষ্টির কোন ক্রমিকতা দেয়া নেই : উপরে উধৃত কুরআনের দুটি সূরায় সৃষ্টির প্রসঙ্গ আছে। সূরা আরাফের ৫৪ আয়াতে আকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, পক্ষান্তরে সূরা হামীম আস-সিজদার ৯-১২ আয়াতে পৃথিবী ও আকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর কোনটির পর কোনটি সৃষ্টি হয়েছে, সে সম্পর্কে কুরআনে কোন ক্রমিকতা দেয়া হয়নি।

যে কয়টি সূরায় প্রথমে পৃথিবীর উল্লেখ আছে, তার সংখ্যা খুবই কম, মাত্র দুটি। সূরা বাকারার ২৯ আয়াত, এবং সূরা ত্বাহার ৪ আয়াতে বলা হয়েছে,”তিনি, যিনি পৃথিবী ও উচ্চ আকাশমন্ডল সৃষ্টি করেছেন। পক্ষান্তরে যে সকল সূরায় আকাশমন্ডলের কথা প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের সংখ্যা অনেক বেশি, মোট নয়টি। সূরা আরাফের ৫৪ আয়াত, সূরা ইউনুসের ৩ আয়াত, সূরা হুদের ৭ আয়াত, সূরা ফুরকানের ৫৯ আয়াত, সূরা আস-সিজদার ৪ আয়াত, সূরা কাফের ৩৮ আয়াত, সূরা হাদিদের ৪ আয়াত, সূরা আন-নাযিয়াতের ২৭-৩৩ আয়াত, এবং সূরা আস-শামসের ৫-১০ আয়াত।

প্রকৃতপক্ষে সূরা নাযিয়াত ছাড়া অন্যত্র কোথাও সুনির্দিষ্ট কোন ক্রমিকতা দেয়া হয়নি। অন্যত্র ‘ওয়া’ অর্থাৎ ‘এবং’ শব্দ দ্বারা দুটি বিষয়ের সংযোগ সাধন করা হয়েছে; অথবা ‘ছুম্মা’ অর্থাৎ ‘তদুপরি বা আরও’ শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে। ফলে শুধু সংযোগও বুঝা যেতে পারে, আবার ক্রমিকতাও বুঝা যেতে পারে।আমার মনে হয় কুরআনের মাত্র একটি সূরায় সৃষ্টিকার্যের বিভিন্ন ঘটনার একটি নির্দিষ্ট ক্রমিকতা বর্ণিত হয়েছে। সূরা আন-নাযিয়াতের ২৭-৩৩ আয়াতে বলা হয়েছে

তোমাদের সৃষ্টি কঠিনতর, না আকাশের? তিনিই ইহা নির্মাণ করিয়াছেন; তিনি ইহাকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করিয়াছেন। তিনি রাত্রিকে করেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং দিবসে প্রকাশ করেন সূর্যালোক; অতঃপর পৃথিবীকে বিস্তৃত করেন; তিনি উহা হইতে উহার প্রস্রবণ ও চারণভূমি বহির্গত করেন এবং পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেন; এ সমস্ত তোমাদের ও তোমাদের পশুদের ভোগের জন্য।

সুতরাং আল্লাহ যখন আকাশমন্ডল সৃষ্টি করেন তখন পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল। তাছাড়া আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর বিস্তৃতি ও পারষ্পরিক সংযুক্তি থেকেও তাদের সহ-অবস্থিতির একটি ধারণা সৃষ্টি হয়। সুতরাং কুরআনের আয়াতে পৃথিবী আগে সৃষ্টি হওয়ার অথবা আকাশমন্ডল আগে সৃষ্টি হওয়ার উল্লেখের মধ্যে কোন বিশেষ তাৎপর্য অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই। সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত না হয়ে থাকলে শব্দের অবস্থানের কারণে সৃষ্টির ক্রমিকতা প্রভাবিত হওয়ার কোন কারণ নেই।

জ্যোতির্মন্ডল গঠনের মৌলিক প্রক্রিয়া এবং তাঁর ফলে গ্রহ উপগ্রহের গঠন : জ্যোতির্মন্ডল সৃষ্টির মৌলিক প্রক্রিয়া বিষয়ক একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ কুরআনের দুটি আয়াতে দেয়া হয়েছে। সূরা আম্বিয়া, ৩০ আয়াত, অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যাহা ছিল ধুম্রপুঞ্জ বিশেষ। অনন্তর তিনি উহাকে ও পৃথিবীকে বলিলেন, ‘তোমরা উভয়ে আমার আদেশ পালনের জন্য প্রস্তুত হও ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। ‘ উহারা বলিল,আমরা তো আনুগত্যের সহিত প্রস্তুত আছি।

কুরআনে উল্লেখিত অন্যান্য জৈবিক সমস্যার সঙ্গে পানি খেতে প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করব। বর্তমানে নিম্নবর্ণিত দুটি বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন

ক. ক্ষুদ্র ও সুক্ষ্ম কণা সম্বলিত ধুম্রপুঞ্জের উপস্থিতি সম্পর্কিত বিবরণ; আরবী ‘দুখান’ শব্দে ঐরূপ বস্তুই বুঝায়। ধুম্র সাধারণত একটি বাষ্পীয় উপবস্তুর দ্বারা গঠিত হয়। তার সঙ্গে সুক্ষ্ম কণাসমূহ ঝুলন্ত অবস্থায় মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে। বেশি বা কম তাপমাত্রায় এ কণাগুলি কঠিন এমনকি তরল অবস্থায়ও থাকিতে পারে।

খ. যে একক ধুম্ররাশির উপাদান সমূহ প্রথমে একত্রিত (আরবী রাত্‌ক) করা হয়েছিল, তা পৃথক করার প্রক্রিয়ার উল্লেখ। উল্লেখযোগ্য যে, আরবী ‘ফাত্‌ক’ শব্দ দ্বারা চূর্ণ করা, বিচ্ছিন্ন করা ও পৃথক করা বুঝায় এবং ‘রাত্‌ক’ শব্দ দ্বারা কোন একক বস্তু প্রস্তুত করার জন্য একাধিক উপাদান একীভূত বা দ্রবীভূত করা বুঝায়।

কুরআনের অন্যান্য আয়াতে গহ-উপগ্রহের প্রসঙ্গে একটি মূল বস্তুকে কতিপয় ভাগে ভাগ করার ধারণা পাওয়া যায়। কুরআনের শুরুতেই উদ্বোধণী স্মরণিকা ‘দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে’ এর পরেই প্রথম সূরার প্রথম আয়াতেই বলা হয়েছে-প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য।

এ বিশ্বজগত শব্দটি কুরআনে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে আকাশমন্ডলও বহুবচনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা কেবলমাত্র সংখ্যাধিক্যের কারণেই নয়, প্রতীকধর্মী ৭ সংখ্যার কারণেও বটে। বিভিন্ন সংখ্যাগত পরিমাণ বুঝানোর জন্য এ সংখ্যাটি (৭) কুরআনে ২৪ বার ব্যবহার করা হয়েছে। এটা প্রায়শ ‘বহু’ অর্থ বহন করে; কেন করে তা আমরা জানি না। অনির্দিষ্ট বহুবচনের সংখ্যা বুঝানোর জন্য গ্রীক ও রোমানগন ৭ সংখ্যা ব্যবহার করেছেন বলে জানা যায়। কুরানে ৭ সংখ্যা দিয়ে খোদ আকাশমন্ডলই (সামাওয়াত) বুঝানো হয়। এমনকি এ সংখ্যাটিই আকাশমন্ডল বুঝায়।

আকাশমন্ডলের ৭ টি পথের কথা একবার উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন, তৎপর তিনি আকাশের দিকে মনোসংযোগ করেন এবং উহাকে সপ্তাকাশে বিন্যস্ত করেন, তিনি সর্ব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। [সূরা বাকারা, আয়াত ২৯] আমি তো তোমাদিগের উর্ধে সৃষ্টি করিয়াছি সাত রাস্তা এবং আমি সৃষ্টি বিষোয়ে অনবধান নহি। [সূরা মুমিনুন, আয়াত ১৭] যিনি স্তরে স্তরে বিন্যস্ত সপ্তাকাশ সৃষ্টি করিয়াছেন, দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোন খুত দেখিতে পাইবে না; আবার তাকাইয়া দেখ কোন ত্রুটি দেখিতে পাও কিনা? [সূরা মূলক, আয়াত ৩] তোমরা কি লক্ষ্য কর নাই আল্লাহ কিভাবে সৃষ্টি করিয়াছেন সপ্তস্তরে বিন্যস্ত আকাশমন্ডলী এবং সেথায় চন্দ্রকে স্থাপন করিয়াছেন আলোকরূপে ও সূর্যকে স্থাপন করিয়াছেন প্রদীপরূপে? [সূরা নূহ, আয়াত ১৫-১৬]

(উল্লেখযোগ্য যে, বাইবেলে চন্দ্র ও সূর্য উভয়কেই ‘আলোক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু কুরআনে চন্দ্রকে বলা হয়েছে আলো (নূর) এবং সূর্যকে এ আয়াতে বলা হয়েছে আলো প্রদানকারী প্রদীপ (সিজার) । পরে আমরা দেখতে পাব সূর্য সম্পর্কে অন্যান্য বিশেষণও প্রয়োগ করা হয়েছে) । আমি তোমাদিগের উর্ধদেশে সুস্থিত সপ্ত-আকাশ নির্মাণ করিয়াছি, এবং প্রোজ্জ্বল দীপ সৃষ্টি করিয়াছি। [সূরা নাবা, আয়াত ১২-১৩] সুতরাং আকাশও অনেক আছে এবং পৃথিবীও অনেক আছে। কুরআনের পাঠক সেহেতু বিস্মিত হতে পারেন যে, আমাদের এ পৃথিবীর মত আরও পৃথিবী হয়ত থাকতে পারে। আমাদের আমল পর্যন্ত এ সত্য অবশ্য এখনও মানুষের দ্বারা প্রমাণিত হয়নি, তবে ৬৫ সূরার (তালাক) ১২ আয়াতে

এ প্রসঙ্গে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতগুলি লক্ষণীয় : যাহা আছে আকাশমন্ডলীতে, পৃথিবী, এ দুয়ের অন্তর্বর্তীস্থানে ও ভূগর্ভে তাহা তাহারই। [সূরা তাহা, আয়াত ৬] তিনি আকাশমডলী, পৃথিবী ও উহাদিগের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছু ছয় দিবসে সৃষ্টি করেন। [সূরা ফুরকান, আয়াত ৯]

আল্লাহ, তিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও উহাদিগের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু ছয় সৃষ্টি করিয়াছেন ছয় দিনে। [সূরা সিজদা, আয়াত ৪] আমি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উহাদিগের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করিয়াছি ছয় দিনে; ক্লান্তি আমাকে স্পর্শ করে নাই। [সূরা কাফ, আয়াত ৩৮] [সৃষ্টিকার্য যে আল্লাহকে ক্লান্ত করেনি এ কথা বাইবেলের একটি বর্ণনার জবাবে বলে গণ্য হতে পারে। ঐ বর্ণনা বলা হয়েছে যে, ছয় দিন কাজ করার পর সপ্তম দিনে আল্লহ বিশ্রাম গ্রহণ করেন]

উপ্রোক্ত আয়াতগুলি ছাড়াও নিম্নবর্ণিত আয়াতগুলিতে ‘আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু’ বিষয়ের উল্লেখ আছে-সূরা ২১ (আম্বিয়া) আয়াত ১৬; সূরা ৪৪ (দুখান) আয়াত ৭ ও ৩৮; সূরা ৭৮ (নাবা আয়াত ৩৭; সূরা ১৫ হিজর) আয়াত ৮৫; সূরা ৪৬ (আহকাফ) আয়াত ৩; এবং সূরা ৪৩ (জুখরুফ) আয়াত ৮৫।

আকাশমন্ডলীর বাইরে এবং পৃথিবীর বাইরে সৃষ্টবস্তুর কল্পনা খুবই কঠিন। এ আয়াতগুলির অর্থ উপলব্ধি করার জন্য সহজ থেকে জটিলের দিকে অগ্রসর হয়ে প্রথমে সৌরমন্ডল বহির্ভুত বস্তু সম্পর্কে মানুষ যা নির্ণয় করতে পেরেছে সে সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন এবং তারপর বিশ্বজগতের গঠনপ্রণালী বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান যে ধারণায় উপনীত হয়েছে তাও জানা প্রয়োজন। পরে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করব।

বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক বিষয়ে যাওয়ার আগে সৃষ্টি সম্পর্কে কুরআনে যে খবর আছে, সেদিকে আর একবার নজর দেয়া যেতে পারে। উপরে লিখিত আয়াতগুলি থেকে এ খবর পাওয়া যায়, ১. সৃষ্টির জন্য সাধারণভাবে ছয়টি মেয়াদ আছে। ২. আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়ে পরষ্পরের সংযোগ সাধন। ৩. একটি প্রাথমিক ধুম্ররাশি খন্ডীত হওয়ার পর তাঁর মধ্য থেকে বিশ্বজগত সৃষ্টি। ৪. আকাশ ও পৃথিবী বহুসংখ্যক হওয়া। ৫. আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর অন্তর্বর্তী স্থানে সৃষ্টবস্তু থাকা। ###

 

Related posts

Top