কুরবানির দশটি জরুরি মাসআলা : প্রত্যেক কুরবানিদাতার যা জানা থাকা অবশ্যক

এক. কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত কয়টি ও কী কী?

কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে- ১. মুসলমান হওয়া। সুতরাং কাফেরের ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না। ২. স্বাধীন হওয়া। সুতরাং কৃতদাসের ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না। চাই সে মুকাতাব-চুক্তিবদ্ধ কিংবা ব্যবসার অনুমতিপ্রাপ্ত হোক। ৩. জ্ঞানসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। সুতরাং পাগল কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না। ৪. মুকিম হওয়া। অতএব মুসাফিরের ওপর তা ওয়াজিব হবে না। এমনকি হজের সফরে গেলেও। ৫. ধনাঢ্য হওয়া। অর্থাৎ সাড়ে ৫২ তোলা রূপা কিংবা সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ অথবা সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। আর এটাই যাকাতের নেসাব।  আর এ সম্পদ জীবনধারণের মৌলিক প্রয়োজন হতে অতিরিক্ত হওয়া চাই। তবে তার ওপর যাকাতের মতো এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়। বরং কুরবানির তৃতীয় দিনও যদি কোনোভাবে এই পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যায়, তার ওপরও কুরবানি ওয়াজিব হয়ে যাবে।  (বাদায়ে-৪/১৯৬-১৯৭)

দুই. মোট কয়দিন কুরবানি করা যায়?

জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। তবে কোনো অসুবিধা না থাকলে প্রথম দিন কুরবানি করা উত্তম। (মুআত্তা মালেক- ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে- ৪/১৯৮,শামি-৬/৩১৬, আলমগিরি-৫/২৯৫, মাহমুদিয়া-১৭/৪৪৫)

তিন. প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানি করা যাবে?

যেসব এলাকায় লোকদের জন্য জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানি করা জায়েয নয়। তবে বৃষ্টি-বাদল বা অন্য কোনো ওজরের কারনে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয়, তাহলে ঈদের নামাযের সময় অর্থাৎ সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলার পর প্রথম দিনেও কুরবানি করা জায়েয। (কাজিখান- ৩/৩৪৪, শামি-৬/৩১৫, আলমগিরি-৫/২৯৫, মাহমুদিয়া-১৭/৪৫৩)

চার. ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানি করলে বৈধ হবে কি-না?

না, জায়েয নেই। কুরবানি হয় নি। আবার কুরবানি করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে- ৬/৩০৮ শামি-৬/৩১৮, মাহমুদিয়া-১৭/৪৫৩)

পাঁচ. পশু জবাই করার পদ্ধতি ও সুন্নাত

জবাই করার শর্ত : কুরআন-হাদিস অনুযায়ী জবাই বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে- ১. জবাইকারী মুসলমান হওয়া। ২. জবাইয়ের সময় আল্লাহ তাআলার নাম নেওয়া। ৩. পশুর কণ্ঠনালী, শ্বাসনালী এবং রক্তনালী কেটে দেওয়া।

জবাইয়ের সুন্নত ও আদব : পশুর গলায় জবাই করতে হবে। ঘাড়ে নয়। ১. কণ্ঠনালী, শ্বাসনালী এবং রক্তনালীর দু’টি রগ হতে অন্তত একটি রগ কাটতে হবে। তবে মাথাকে শরীর হতে বিচ্ছিন্ন করবে না। এরুপ করা মাকরুহ। তবে পশু হারাম হবে না। ২. জবাইয়ের সময় بِاسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَر বলা। ৩. কিভাবে পশুর কম কষ্ট হয় এবং সহজে প্রাণ বেরিয়ে যায়; সেদিকে লক্ষ্য রাখা। এ কারণে জবাইয়ের পূর্বে ভালোভাবে ছুরি ধার দেওয়া উচিত। এবং অন্য পশুর সামনে জবাই না করা। এমনকি পশুর সামনে ছুরি ধার দিতেও নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ৪. সম্পূর্ণরূপে পশুর প্রাণ বের না হওয়া পর্যন্ত চামড়া ছিলা কিংবা কোনো অঙ্গ কর্তন করা যাবে না। ৫. এক কোপে পশুর গর্দান ছিন্ন করা জায়েয নেই। তবে এভাবে জবাইকৃত পশু খাওয়া হারাম নয়। ৬. পশুকে কেবলামুখী করে শোয়াবে। মাথা উত্তর দিকে কিংবা দক্ষিণ দিকেও থাকতে পারে। তবে দক্ষিণদিকে মাথা থাকলে জবাই করতে সুবিধা হয়।  ৭. জবাই করার পূর্বে পশুকে ঘাস-পানি খাওয়াবে। এসময় ক্ষুধার্ত বা পিপাসিত রাখা মাকরুহ। ৮. জবাইয়ের স্থানে পশুকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া মাকরুহ। ৯. ধারালো ছুরি ব্যবহার করা। ভোতা ছুরি ব্যবহার করা মাকরুহ। ১০. পশু শোয়ানোর পূর্বে ছুরি ধার করবে, শোয়ানোর পরে ধার করা মাকরুহ।  (শামি-৬/৩৩৪, মাহমুদিয়া-১৭/২৪৪), জাওয়াহিরুল ফেকাহ-২/২৭৩, ফাতাওয়া রহিমিয়া-১/৯৮, মাহমুদিয়া-১৭/২৪৫-২৬০)

ছয়. ভুলক্রমে বিসমিল্লাহ না পড়লে পশু হারাম হবে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃত ‘বিসমিল্লাহ’ ছেড়েদিলে পশু হারাম হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া-২/৫৫৬)

সাত. কোন্ কোন্ পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েয?

উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, ও দুম্বা দ্বারা কুরবানি করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য হালাল পশু যেমন, হরিণ, বন্যগরু, ঘোড়া ইত্যাদি দ্বারা কুরবানি করা জায়েয নয়। (কাজিখান- ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে-৪/২০৫)

আট. কুরবানির পশুর বয়স সীমা কতটুকু?

উট কমপক্ষে পাঁচ বছরের হতে হবে, গরু ও মহিষ ন্যূনতম দুই বছর, আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি এমন মোটাতাজা হয় যে, দেখতে একবছরের মতো মনে হয়; তাহলে এর দ্বারাও কুরবানি করা বৈধ হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে ছয়মাস বয়সের হতে হবে। উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স একবছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানি জায়েয হবে না। (শামি-৬/৩২১, কাজিখান- ৩/৩৪৮, তাবয়িনুল হাকায়িক-৬/৪৮৪, মাহমুদিয়া-১৭/৩৬০)

নয়. কোন্ পশুতে কতজন শরিক হতে পারবে?

একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একটাই কুরবানি দিতে পারবে। এই প্রাণীগুলো থেকে কয়েকজনে মিলে একটি কুরবানি করলে কারো কুরবানি সহিহ হবে না। আর উট, গরু বা মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক শরিক হলে কারো কুরবানি সহিহ হবে না। (কাজি খান- ৩/৩৪৯, বাদায়ে-৬/৩০৪, মাহমুদিয়া-১৭/৩৯৮)

দশ. সাতজন মিলে কুরবানি করলে সবার অংশ বরাবর হতে হবে। কারো অংশে এক সপ্তমাংশের চেয়ে কম হতে পারবে না। যেমন, কারো আধাভাগ, কারো দেড় ভাগ। এক্ষেত্রে কোনো শরিকের কুরবানি সহিহ হবে না।  (শামি-৬/৩১৫-৩১৬)

Top