কোরআনিক বিজ্ঞান : একটি সাধারণ পর্যালোচনা

যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের সাথে বিজ্ঞান ও বাস্তবতার যেমন অনেক সাদৃশ্য আছে তেমনি আবার কিছু বৈসাদৃশ্যও রয়ে গেছে। তবে বিজ্ঞানের সাথে ইসলামের যেসকল জায়গায় বৈসাদৃশ্য আছে সেগুলো নিয়ে বিজ্ঞান কাজ করে না – অর্থাৎ বিষয়গুলো বিজ্ঞানের আওতাভুক্ত নয়। যেমন: এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মৃত্যুপরবর্তী জীবন, ফেরেশতা, জ্বীন, পাপ, পূণ্য, আত্মা, হালাল, হারাম, জান্নাত, জাহান্নাম, ইত্যাদি। বিজ্ঞান কখনোই বলবে না বা বলতে পারবে না যে, এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মৃত্যুপরবর্তী জীবন, ফেরেশতা, জ্বীন, পাপ, পূণ্য, আত্মা, হালাল, হারাম, জান্নাত, জাহান্নাম বলে কিছু নাই।

উল্লেখ্য যে, যেখানে মানব জাতির শুরু থেকে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছে সেখানে বিজ্ঞানের যাত্রা অনেক পরে শুরু হওয়াতে ইসলাম কোনো ভাবেই বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল হতে পারে না। অধিকন্তু, বিজ্ঞান যেখানে এই মহাবিশ্বকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ দ্বারা ব্যাখ্যার জন্য মনুষ্য তৈরী একটি টুল সেখানে ইসলাম হচ্ছে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার মনোনিত দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা। কোরআনের অনেক শিক্ষা ও বাণী ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। একটু চিন্তা করলেই যে-কেউ ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। এখানে কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হচ্ছে।

সাদৃশ্যের ভূমিকা : যাদের বৈজ্ঞানিক জার্নাল পড়ার অভিজ্ঞতা আছে তারা জানেন যে, প্রত্যেকটি জার্নালের শুরুতেই একটি সারাংশ (Abstrac) থাকে। শুধুমাত্র সেই সারাংশ পড়েই জার্নালের কাজ সম্পর্কে সম্যক একটা ধারণা পাওয়া যায়। কোরআনের শুরুতেও আল-ফাতিহা নামে সংক্ষিপ্ত একটি সূরা আছে, যেটি পড়ে যেকেউ ইসলাম সম্পর্কে একটা ধারণা পেতে পারেন। কাজেই সূরা আল-ফাতিহাকে বৈজ্ঞানিক জার্নালের সারাংশের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যেমন—  শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা। যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

সার্ভে : বৈজ্ঞানিক জার্নালে সারাংশের পর লিটারেচার সার্ভে, অন্যের কাজের সমালোচনা এবং নিজের কাজ নিয়ে আলোচনা থাকে। কোরআনেরও বড় একটি অংশ জুড়ে লিটারেচার সার্ভে তথা অতীত ইতিহাস, অন্যের বিশ্বাসের সমালোচনা, ও নিজস্ব তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা আছে।

সংশোধনীর চ্যালেঞ্জ : বৈজ্ঞানিক জার্নালে পূর্বের সঠিক কাজকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি কোনো ভুল-ভ্রান্তি থাকলে তার সংশোধনী-সহ আরো উন্নত তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়। কোরআনেও তার আগের সত্য বাণীকে স্বীকৃতি দেওয়া-সহ (৫:৪৮, ৩:৩, ৩৭:৩৭, ৩৫:৩১, ১৫:৯, ১০:৩৭) প্রচলিত কিছু বিশ্বাসকে সংশোধন করে সঠিক বা আরো উন্নত তত্ত্ব অফার করা হয়েছে (৪:১৭১, ৫:৭৩, ২১:২২, ২:১১৬, ৪:১৫৭)। স্যার কার্ল পপারের সময় থেকে বিজ্ঞানে ভুল-প্রতিপাদন (Falsification test) নামে নতুন একটি ডানা যুক্ত হয়েছে। পপারের মতে কোনো তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে উত্তীর্ণ হতে হলে সেই তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করার সুযোগ থাকতে হবে। কোরআনকেও ভুল প্রমাণ করার জন্য একাধিক সুযোগ দেওয়া হয়েছে (৪:৮২, ১৭:৮৮, ১১:১৩, ২:২৩-২৪, ৫২:৩৩-৩৪, ১০:৩৭)। কিন্তু পূর্ববর্তী সবাই যে ব্যর্থ হয়েছে, সে-কথাও কোরআনে বলা হয়েছে ।

শাব্দিক সাদৃশ্য : বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন বৈজ্ঞানিক (scientific) ও অবৈজ্ঞানিক (unscientific)  শব্দ দুটি প্রচলিত আছে, ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তেমনি হালাল (pure/legal) ও হারাম (impure/illegal) শব্দ দুটি প্রচলিত আছে।

মেসেজ : কোনো রকম সংশয়-সন্দেহ ছাড়াই বিষয়টি আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বেতারের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের সাথে সরাসরি যেমন কথা বলা যাচ্ছে তেমনি আবার মেসেজ আদান-প্রদান করাও সম্ভব হচ্ছে। বেতারের মাধ্যমে যোগাযোগ শুধুমাত্র পৃথিবীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এমনকি বিভিন্ন গ্রহ-উপগ্রহে স্যাটেলাইট পাঠিয়ে তাদের সাথেও যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ বেতারের মাধ্যমে যোগাযোগ একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। কোরআন অনুযায়ী আল্লাহ নূর তথা আলোর তৈরী ফেরেশতার মাধ্যমে কিছু মানুষের (নবী-রাসূল) সাথে যোগাযোগ করেছেন বা মেসেজ পাঠিয়েছেন।

বিচারিক বিজ্ঞান : কোরআন অনুযায়ী এই পার্থিব জীবন একটি পরীক্ষাক্ষেত্র (কোরআন ১৮:৭, ৬৭:২, ২:২১৪, ২:১৫৫)। বাস্তবেও মানুষকে প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে – তা লিখিত বা মৌখিক বা যেকোনো পরীক্ষাই হোক না কেন। বাস্তব জগতে যে বিচার ব্যবস্থা চালু আছে সে অনুযায়ী বিচারকের তত্তাবধানে বিচার হওয়ার পর যারা দোষী সাব্যস্ত হয় তাদের অপরাধের মাত্রার উপর নির্ভর করে তাদেরকে বিভিন্ন স্তরে শাস্তি দেওয়া হয়। সেই সাথে ভালো মানুষকে পুরস্কৃত করার রীতিও বিভিন্ন সমাজে প্রচালিত আছে। এটি পুরোপুরি ইসলামিক ধারণা। ইসলাম অনুযায়ী আল্লাহ হচ্ছেন সবার বিচারক যিনি শেষ বিচার দিবসে বিচার করার পর মানুষকে ভালো কাজের জন্য বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত আর খারাপ কাজের জন্য বিভিন্ন স্তরে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন।

ইসলাম অনুযায়ী যে অপরাধ করবে, তাকেই শুধু শাস্তি দেওয়া হবে। একজনের অপরাধের জন্য অন্য কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না। বাস্তব জগতের বিচার ব্যবস্থা অনুযায়ীও যে অপরাধ করে, তাকেই সরাসরি শাস্তি দেওয়া হয়। অন্যদিকে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের জন্মান্তরবাদ অনুযায়ী, একজনের অপরাধের শাস্তি তাকে সরাসরি না দিয়ে অন্য কাউকে দেওয়া হয়। ধরা যাক, একজন হিন্দু বা বৌদ্ধ অনেক পাপ কাজ করে মারা গেল। তার আত্মাকে কোনো পশু/পাখি’র দেহে ঢুকিয়ে দিয়ে সেই পশু/পাখি’কে শাস্তি দেওয়া হবে! এইটা কি কোনো ন্যায়বিচার হলো?

তথ্য সংরক্ষণ : কোরআনের একাধিক আয়াতে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকের সারা জীবনের কর্মকাণ্ড তার চোখের সামনে তুলে ধরা হবে। স্বচক্ষে নিজ কর্মকাণ্ড দেখে কেউই তা অস্বীকার করতে পারবে না। ভিডিও ও সিসিটিভি ক্যামেরা উদ্ভাবনের আগ পর্যন্ত অনেকেই এ নিয়ে সংশয়-সন্দেহ করত এই ভেবে যে, কারো মৃত্যুর পর সারা জীবনের কর্মকাণ্ড তার চোখের সামনে কীভাবে তুলে ধরা সম্ভব! অথচ মানুষের কাছেই আজ ব্যাপারটা ডাল ভাতের মতো হয়ে গেছে। আল্লাহর কাছে তাহলে সেটা কতটা সহজ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। অনুরূপভাবে, সকল মানুষের কর্মের লিখিত হিসাব-নিকাশ রাখার ব্যাপারটাও আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ক্ষুদ্র আকারের একটি ডিস্কেই গিগা বাইট রেঞ্জের তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

সূত্র : ১. ইসলাম অনলাইন.কম। ২. সদালাপ ডটকম। ৩. বিজ্ঞান ও কুরআনে মানব সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তর।

Related posts

Top