কয়েকটি সুরা ও আয়াতের ফজিলত: পর্ব-০১

সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াতের ফজিলত : হযরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের (বিপর্যয়) থেকে নিরাপদ থাকবে। [সহীহ মুসলিম]

সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াতে যা বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, যে সময় তৎকালীন রোম সাম্রাজ্যের অধীন খ্রিষ্টানদের উপর কঠোর নির্যাতন চালানো হচ্ছিলো এবং তাঁদেরকে একথা স্বীকার করতে বাধ্য করা হচ্ছিলো যে, তারা এক আল্লাহকে পরিত্যাগ করে রোমীয়দের মাবুদ এবং দেবতাদের প্রভু হিসাবে মেনে নিবে এবং এদের সামনে মাথা নত করবে। এই কঠিন সময়ে কয়েকজন নওজোয়ান হযরত ঈসা (আ.) এর উপর ঈমান আনে এবং তারা এই অমানুষিক অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের ঘর-বাড়ি সব কিছু ফেলে রেখে পালিয়ে আসে। তারা এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, আমরা কোন অবস্থাতেই আমাদের মহান প্রতিপালককে পরিত্যাগ করবো না এবং শিরকের পথও ও অবলম্বন করবোনা- এতে যাই হোক না কেন। সুতরাং তারা কারো আশ্রয় না চেয়ে কেবল আল্লাহর উপরে ভরসা করে পাহাড়ে গিয়ে এক গুহায় বসে যায়।

বলা হয়েছে যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের এই প্রাথমিক আয়াতগুলো মুখস্থ করে নিবে এবং তা নিজের মন- মগজে বসিয়ে নেবে সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে। প্রকাশ থাকে যে, দাজ্জালের ফিতনাও এই ধরনেরই হবে- যেমন ঐ সময়ে এই যুবকগন যার সম্মুখীন হয়েছিলো। এজন্য যে ব্যক্তির সামনে আসহাবে কাহাফের দৃষ্টান্ত মওজুদ থাকবে সে দাজ্জালের সামনে মাথা নত করবে না। অবশ্য যে ব্যক্তি এই দৃষ্টান্ত ভুলে গেছে সে দাজ্জালের ফিতনার স্বীকার হয়ে পড়তে পারে। এরই ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি এই আয়াতগুলো নিজের স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করবে সে দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে বেঁচে যাবে। [কুরআন শিক্ষার ফজিলত, লেখক: আহমাদ মুসা]

সূরা মুমিনুনের ফজিলত

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর যখন অহী নাযিল হতো তখন তাঁর মুখের কাছ থেকে মৌমাছির গুনগুন শব্দের মতো আওয়াজ শুনা যেত। আমি কিছুক্ষন বসে থাকলাম তিনি কিবলার দিকে ফিরলেন এবং দুই হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ, আমাদের আরো দাও এবং কমিয়ে দিওনা, আমাদের মনে- সম্মান দান করো এবং অপদস্থ করোনা, আমাদের (তোমার নিয়ামত ) দান করো এবং বঞ্চিত করোনা, আমাদের অন্যদের অগ্রবর্তী করো, অন্যদেরকে আমাদের অগ্রবর্তী করোনা, আমাদের উপর তুমি রাজী হয়ে যাও এবং আমাদের সন্তুষ্ট করো।” অতঃপর তিনি বললেন,এই মাত্র আমার উপর এমন দশটি আয়াত নাযিল হয়েছে যার মানদণ্ডে কেউ উত্তীর্ণ হলে সে নিঃসন্দেহে জান্নাতে যাবে। অতপর তিনি পাঠ করলেন,নিশ্চিতই ঈমানদার লোকেরা কল্যাণ লাভ করেছে। –অতঃপর তিনি দশটি আয়াত পাঠ সম্পন্ন করলেন। [তিরমিযি, নাসাঈ, আহমাদ ও হাকেম]

হযরত ইয়াজীদ ইবনে বাবনুস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র কিরূপ ছিল? তিনি বললেন, কুরআনই হল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের চরিত্র। অতঃপর তিনি পাঠ করলেন, নিশ্চিতই ঈমানদার লোকেরা কল্যাণ লাভ করেছে তিনি এবং যারা নিজেদের নামায সমূহের পূর্ণ হেফাজত করে, পর্যন্ত পাঠ করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, এরূপই ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র। [নাসাঈ]

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতে ‘আদন’ নামক জান্নাত সৃষ্টি করেছেন। এর একটি থাম সাদা মুক্তা পাথরের, একটি থাম লাল চুনি পাথরের এবং একটি থাম সবুজ পুষ্পরাগ মনির তৈরি। এর মেঝে কস্তুরির, এর নুড়ি পাথরগুলো মোতির তৈরি এবং লতাকুঞ্জ কুমকুমের তৈরি। অতঃপর তিনি তাঁকে বললেন, কথা বল। সে বলল, নিশ্চিতই ঈমানদার লোকেরা কল্যাণ লাভ করেছে। তখন আল্লাহ বললেন, আমার ইজ্জত, শানশওকত ও মহত্ত্বের শপথ, কোন কৃপণ তোমার মধ্যে প্রবেশ করার জন্যে আমার কাছে প্রার্থনা করতে পারবেনা। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করলেন, বস্তুত যেসব লোককে তাঁদের দীলের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই কল্যাণ লাভ করবে।

হাদীসে যে দশটি আয়াতের কথা বলা হয়েছে তা নিম্নরুপ

মুমিন লোকেরা নিশ্চয়ই কল্যাণ লাভ করেছে, যারা নিজেদের নামাযে ভীতি ও বিনয় অবলম্বন করে। যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে। যারা যাকাতের পন্থায় কর্মতৎপর হয়। যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। নিজেদের স্ত্রীদের ছাড়া এবং সেই মেয়েদের ছাড়া- যারা তাঁদের দক্ষিন হস্তে মালিকাধিন হবে। এই ক্ষেত্রে ( হেফাজত না করা হলে ) তারা তিরস্কারযোগ্য নয়। অবশ্য যে ব্যক্তি এদের ছাড়া অন্য কিছু চাইবে তারা সীমা লংঘনকারী হবে। যারা নিজেদের আমানত এবং নিজেদের ওয়াদা-চুক্তি রক্ষনাবেক্ষন করে। যারা নিজেদের নামাযের হেফাজত করে। এরাই হচ্ছে উত্তরাধিকারী। তারা ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হবে এবং সেখানে চিরদিন থাকবে।

এখানে মুমিন বলতে সেই সব লোকদের বুঝানো হয়েছে, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াত কবুল করে নিয়েছে, তাঁকে নিজেদের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহন করেছে এবং তাঁর উপস্থাপিত জীবন-বিধানকে অনুসরন করে চলতে প্রস্তুত হয়েছে।

এই সুরার প্রথম ৯ টি আয়াতে ঈমানদার লোকদের সাতটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- কোন মুমিন ব্যক্তি এই সাতটি গুন অর্জন করতে পারলে সে নিশ্চিতই বেহেস্তে যাবে। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা দশম ও একাদশ আয়াতে এদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ বেহেশত জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছেন। অতএব আয়াতে উল্লেখিত গুন বৈশিষ্ট্য গুলো অর্জন করার একান্ত চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য।

প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-  বিনয় ও নম্রতা সহকারে নামায আদায় করা। ‘খুশু’ শব্দের অর্থ কারো সামনে বিনীতভাবে অবনত হওয়া, বিনীত হওয়া, নিজের কাতরতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করা, স্থির রাখা। অন্তরের ‘খুশু’ হচ্ছে এই যে, ব্যক্তি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের কথা চিন্তা করে সন্ত্রস্থ হয়ে পড়বে। আর দেহের ‘খুশু’ হচ্ছে এই যে, ব্যক্তি যখন নামাযে দাঁড়াবে তখন মাথা নত করবে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবসাদ গ্রস্থ হয়ে পড়বে, দৃষ্টি অবনমিত হবে, কণ্ঠস্বর নরম ও বিনয়পূর্ণ হবে। এই খুশুই হচ্ছে নামাযের আসল প্রানশক্তি ও ভাবধারা। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন, এক ব্যক্তি নামায পড়ছে আর মুখের দাড়ি নিয়ে খেলা করছে। তখন তিনি বললেন,এই ব্যক্তির অন্তরে যদি ‘খুশু’ থাকতো তাহলে তাঁর অংঙ্গ- প্রতংঙ্গের উপর ‘খুশু’ পরিলক্ষিত হতো। [তাফসীরে মাযহারী, তাফহীমুল কুরআন]

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা। মূল শব্দ হচ্ছে ‘লাগবুন’-। এমন প্রতিটি কথা ও কাজকে ‘লাগবুন’ বলা হয় যা অপ্রয়োজনীয়, অর্থহীন এবং নিষ্ফল। যেসব কথা ও কাজের কোনই ফল নাই, উপকার নাই, যা থেকে কোন কল্যাণকর ফলও লাভ করা যায় না, যার প্রকৃতই কোন প্রয়োজন নেই এবং যা থেকে কোন ভালো উদ্দেশ্য লাভ করা যায়না- এ সবই অর্থহীন, বেহুদা ও বাজে জিনিস এবং ‘লাগবুন’ বলতে এসবই বুঝায়। ঈমানদার লোকদেরকে এসব জিনিস থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে, মুমিন লোকেরা যদি এমন কোন জায়গায় গিয়ে পড়ে যেখানে অর্থহীন ও বাজে কাজ বা কথা হচ্ছে – তাহলে সেখান থেকে আত্মমর্যাদা সহকারে কেটে পড়ে। [সূরা ফুরকান, আয়াত-৭২]

মুমিন ব্যক্তি সুস্থ স্বভাবের অধিকারী হয়ে থাকে। সে পবিত্র চরিত্র ও উন্নত রুচির ধারক। সে অর্থপূর্ণ কথা বার্তাই বলবে, কিন্তু অর্থহীন গল্প-গুজব করে সময় নষ্ট করতে পারেনা। সে হাস্যরস ও রসিকতা করতে পারে, কিন্তু তাৎপর্যহীন হাসিঠাট্টা নয়। সে অশ্লীল গালিগালাজ, লজ্জাহীন কথাবার্তা বলতেও পারেনা, সহ্যও করতে পারেনা। আল্লাহ তায়ালা বেহেশতের একটি বৈশিষ্ট এই উল্লেখ করেছেন যে, সেখানে তারা কোন অর্থহীন ও বেহুদা কথাবার্তা শুনবেনা। [সূরা গাশিয়া, আয়াত- ১১]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,মানুষ যখন অর্থহীন বিষয়াদি ত্যাগ করে, তখন তাঁর ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে। [তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, মুয়াত্তাই ইমাম মালেক, মুসনাদে আহমাদ]

তৃতীয় বৈশিষ্ট হচ্ছে– যাকাত দেয়া এবং যাকাতের পন্থায় কর্মতৎপর হওয়া। যাকাত অর্থ একদিকে যেমন আত্মার পবিত্রতা অর্জন, অন্যদিকে এর অর্থ ধন সম্পদের পবিত্রতা বিধান।

চতুর্থ বৈশিষ্ট হচ্ছে- লজ্জাস্থানের হেফাজত করা। এর দুটি অর্থ রয়েছে। এক, নিজের দেহের লজ্জাস্থান সমূহকে ঢেকে রাখা, নগ্নতাকে প্রশ্রয় না দেয়া এবং অপর লোকদের সামনে নিজের লজ্জাস্থানকে প্রকাশ না করা।

দুই, তারা নিজেদের পবিত্রতা এবং সতীত্বকে রক্ষা করে। অর্থাৎ অবাধ যৌনাচার করে বেড়ায়না। পাশবিক প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে সীমা লংঘন করেনা।

পঞ্চম বৈশিষ্ট হচ্ছে- আমানতের রক্ষনাবেক্ষন ও তা প্রত্যর্পণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,যার আমানাতদারীর গুন নাই তাঁর ঈমান নাই। [বায়হাকীর শুয়াবুল ঈমান ]

ষষ্ঠ বৈশিষ্ট হচ্ছে- ওয়াদা- চুক্তির রক্ষনাবেক্ষন করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,যে ওয়াদা – চুক্তি রক্ষা করেনা তাঁর কোন ধর্ম নাই। [বায়হাকীর শুয়াবুল ঈমান]

বস্তুত আমানতের খেয়ানত এবং ওয়াদা- চুক্তিকে ভঙ্গ করাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোনাফিকের চারটি লক্ষনের অন্যতম দুইটি বলে উল্লেখ করেছেন। যখন ওয়াদা করে ভংগ করে এবং তাঁর কাছে যদি আমানত রাখা হয় তাঁর খেয়ানত করে। [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

সপ্তম বৈশিষ্ট হচ্ছে- নামাযের হেফাজত করা। নামাযের হেফাজতের অর্থ হচ্ছে নামাযের নির্দিষ্ট সময় সমূহ, এর নিয়ম- কানুন, শর্ত ও রোকন সমূহ, নামাযের বিভিন্ন অংশ- এক কথায় নামাযের সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহের পূর্ণ সংরক্ষণ করা। যে ব্যক্তি এসব গুন বৈশিষ্টের অধিকারী হয়ে যায় এবং এর উপর স্থির থাকে, সে পূর্ণাঙ্গ মুমিন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্যের অধিকারী।###

Related posts

Top