জুয়াবাজি সম্পূর্ণরূপে হারাম ও ঘৃণ্য কাজ

জুয়া একটি ঘৃণ্য ও গর্হিত কাজ এবং মারাত্মক সামাজিক অপরাধ। জুয়া ব্যক্তির জীবন-সংসার কুরে কুরে বিনষ্ট করে দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে ইহা সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম। এ ব্যাপারে কোনো আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। আরবিতে জুয়াকে বলা হয় মাইসির ও কিমার। বাংলা ও উর্দুতে এর প্রতিশব্দ হচ্ছে জুয়া। জুয়ার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনের লেখক মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, যে চুক্তিতে কোনো সম্পদের মালিকানায় এমন সব শর্ত আরোপিত হয়, যাতে মালিক হওয়া না হওয়া উভয় সম্ভাবনাই সমানভাবে বিদ্যমান থাকে, এর ফলে পূর্ণ লাভ কিংবা লোকসান উভয় দিকেই বজায় থাকে, এটাই হলো জুয়া। (ফাতাওয়া শামী : ৫/৩৫৫) জাহেলিয়াতের যুগে জুয়ার কার্যক্রম ব্যাপক আকারে প্রচলিত ছিল। তারা এর প্রতি এমন আসক্ত ছিল যে, কখনও কখনও স্ত্রী-ছেলেমেয়েদেরও বাজির উপকরণ বানিয়ে ফেলত। এছাড়াও তাদের মধ্যে জয়-পরাজয়ের বিভিন্ন খেলাধুলাসহ নানা রকম জুয়ার প্রচলন ছিল।

বর্তমানে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী চলে এই অবৈধ জুয়াবাজি। বিশেষ করে ক্রিকেট খেলা নিয়ে জুয়াবাজির মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোন খেলায় কোন দল জিতবে, কোন দল হারবে, কোন ওভারে কয় রান করবে, কয়টা ছক্কা চার মারবে, কয় উইকেট পড়বে, কয়টা বল ওয়াইড-নো হবে, এমনকি বলে বলেও চলে জুয়াবাজি। সাধারণভাবে জুয়াবাজিকে হারাম জানলেও এ ক্ষেত্রে বন্ধু-বান্ধব, রুমমেট কিংবা সহকর্মীদের মধ্যে হাসতে হাসতেই চলে তা। অমুক দল জিতলে তুমি আমাকে দেবে এক হাজার টাকা, আর হারলে আমি তোমাকে দেব এক হাজার টাকা_ এটাই হলো জুয়ার ধরন। শুধু একপক্ষ থেকে দেওয়ার শর্ত করা হলে তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না। আন্তর্জাতিক বাজিকররা কোটি কোটি টাকা লাভ-লোকসান করে ক্রিকেট খেলা নিয়ে। তাদের কারণে অনেক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও বর্তমান সমাজে লটারি, হাউজি, বাজি ধরা, চাক্কি ঘোরানো, রিং নিক্ষেপ প্রভৃতি নামে নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন রয়েছে। এগুলো কখনও মানুষের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

জুয়া সম্পর্কে কুরআনে যা বলা হয়েছে:                                                                                                                                                                                 জুয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়াকে হারাম এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আল্লাহতায়ালা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلاَمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ. إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللّهِ وَعَنِ الصَّلاَةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ অর্থাৎ, “হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শুত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন ও কি নিবৃত্ত হবে?”

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ ‘তারা আপনাকে (নবী) মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, উভয়ের মধ্যেই রয়েছে মহাপাপ।’ (সূরা বাকারা :২১৯)

জুয়া সম্পর্কে হাদিসে যা বলা হয়েছে:                                                                                                                                                                                 আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মদ, জুয়া ও বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন।’ (বায়হাকি, হাদিস: ৪৫০৩; মিশকাত, হাদিস: ৪৩০৪)

আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে যাবে না।’ (দারেমি, হাদিস: ৩৬৫৩; মিশকাত, হাদিস: ৩৪৮৬)

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ লাত-উজ্জার শপথ ইত্যাদি বললে, তবে সে যেন সঙ্গে সঙ্গে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে। আর কেউ যদি অন্যকে প্রস্তাব দেয়, এসো আমরা জুয়া খেলি; সে যেন (জরিমানাস্বরুপ) দান-সদকা করে। (বুখারি, হাদিস: ৪৮৬০; মুসলিম, হাদিস: ১৬৪৭; তিরমিজি, হাদিস: ১৫৪৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০৯৬)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নবী (সা.) যখন (মক্কা) এলেন, তখন কাবাঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানান। কেননা কাবা ঘরের ভেতরে মূর্তি ছিল। তিনি নির্দেশ দিলে মূর্তিগুলো বের করে ফেলা হয়। (এক পর্যায়ে) ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর প্রতিকৃতি বের করে আনা হয়। উভয় প্রতিকৃতির হাতে জুয়া খেলার তীর ছিল। তখন নবী (সা.) বললেন,  আল্লাহ! ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! অবশ্যই তারা জানে যে, [ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)] তীর দিয়ে অংশ নির্ধারণের ভাগ্য পরীক্ষা কখনো করেননি। এরপর নবী (সা.) কাবাঘরে প্রবেশ করেন এবং ঘরের চারদিকে তাকবির বলেন। তবে ঘরের ভেতরে সালাত আদায় করেননি। (বুখারি, হাদিস: ১৫০৩)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘বলা হতো, উটের জুয়াড়িরা কোথায়? তখন দশজন প্রতিযোগী একত্রিত হতো এবং জুয়ার উটটির ক্রয়মূল্য হিসেবে দশটি উটশাবক নিৰ্দ্ধারণ করতো। তারা জুয়ার পাত্রে তীর স্থাপন করে সেটিকে চক্কর দেয়াতো, তাতে একজন বাদ পড়ে নয়জন অবশিষ্ট থাকতো। এভাবে প্রতি চক্করে একজন করে বাদ পড়ে শেষে মাত্র একজন অবশিষ্ট থাকতো এবং সে বিজয়ী হিসেবে তার শাবকসহ অন্যদের নয়টি শাবকও লাভ করতো। এতে নয়জনের প্রত্যেকে একটি করে শাবক লোকসান দিতো। এটাও এক প্রকার জুয়া।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নম্বর: ১২৭১)

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘তীর নিক্ষেপে বাজিধরা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।’ (ফাতহুল কাদির, হাদিস: ১২৭২)

ফুদাইল ইবনে মুসলিম (রহ.) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, ‘আলী (রা.) বাবুল কাসর থেকে বের হলে তিনি দাবা-পাশা খেলোয়াড়দের দেখতে পান। তিনি তাদের কাছে গিয়ে তাদের ভোর থেকে রাত পর্যন্ত আটক রাখেন। তাদের মধ্যে কতককে তিনি দুপুর পর্যন্ত আটক রাখেন। (বর্ণনাকারী বলেন, যারা অর্থের আদান-প্রদানের ভিত্তিতে খেলেছিল, তিনি তাদের রাত পর্যন্ত আটক রাখেন, আর যারা এমনি খেলেছিল তাদেরকে দুপুর পর্যন্ত আটক রাখেন।) তিনি নির্দেশ দিতেন, লোকজন যেন তাদের সালাম না দেয়।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১২৮০)

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল, সবধরনের জুয়াবাজি অবৈধ এবং এর থেকে প্রাপ্ত সম্পদ হারাম। আর হারাম সম্পদ ভোগ করে ইবাদত-বন্দেগি করলে আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। তাই সবধরনের জুয়াবাজি থেকে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন, আমীন।

Top