দেখা অদেখার সুপার মুন

সন্ধাজ্ঞা বলে আমাদের হোস্টেলে একটা আজ্ঞা চাল আছে। ওটাতে হোস্টেলের বড় ভাইরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। আমরা ওখানে যাওয়ার সাহস করি না। মারপিটের ভয় বিষয়টা তেমন না। বরং উনাদের ফুট ফরমাস খাটতে খাটতে আমাদের সময় যায় । আড্ডা আর দেও হয় না। বড়দের আশেপাশে ছোট কেউ থাকলে বড়রা কেমন যেন অলস হয়ে যায়। এজন্য আমরা আমাদের রুমেই আড্ডা দেই। তবে তা নিয়মিত নয়। মাঝেমাঝে বিশেষ কোন টপিককে সামনে রেখে। আজ আড্ডা হবে। আজকের টপিক ‘সুপার মুন’। আড্ডায় আমরা যে এলেম-কালাম জাহির করি তার অধিকাংশই ধারণা মাত্র। অনেক সময় কেউ কেউ নিজের জ্ঞানের সাথে বিজ্ঞানকে গুলিয়ে এমন বক্তব্য দেয় তাতে অজ্ঞান হওয়ার যোগাড় হই। আমাদের এই অনিয়মিত আড্ডার নিয়মিত অতিথি হলো আবির।

শুভ্র আমাদের রুমমেট হলেও ও এর ধারে-কাছেও আসে না। ওর পড়ার টেবিলে বসে প্যান প্যান করে। আমরা কেউ ওর কথায় পাত্তা দেই না। আজ আকাশে সুপার মুন দেখা যাবে। এ নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম শুভ্র আমাদের আলোচনা খুব মনযোগ দিয়ে শুনছে। যা অন্য কোন দিন দেখা যায় না। খবর শুনে শুভ্র তাতে মহাখুশি। পারলে পা তুলে নাচে। তবে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ওর এক পা নেই। অপরটি তুলে নাচতে গেলে সেটিও ভেঙ্গ যেতে পারে এ ভয়ে। আসলে পা নেই বললে ভুল হবে। পা আছে। তবে তাতে জোর নেই। পলিও রোগের কারণে শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। এককথায় ওর পরিচয় দিতে গেলে। ও একজন ‘‘দেড় পা ওয়ালা মানব”। এজন্য স্ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়। এ নিয়ে ওর কোন খেদ নেই। বরং ও খুব আনন্দেই আছে। দেখলে মনে হয়, পা না থাকাটাই একটা ক্রেডিট। সাধারণত প্রতিবন্ধি ছেলে-মেয়েরা হীনমন্যতায় ভুগে। ভয় পায়। আশেপাশের মানুষের প্রতি দুর্বল হয়।

শুভ্র এ ক্ষেত্রে বিপরীত। দেড় পা ও দুই স্ক্রাচে ভর দিয়ে নিজের কাজ নিজেই করে। কারো সহায়তা নেয় না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি খুব খেয়াল রাখে। আমরা একটু উল্টা পাল্টা করলেই স্ক্রাচ নিয়ে তেড়ে আসে। তখন বলি ও ভাল না থেকে ভালই হয়েছে। মাঝেমাঝে রাগ মিটায় বক্তব্য দিয়ে: শুভ্র কাওকে ভয় পায় না। শুভ্র কারো ধার ধারে না। তবে এমনিতে ও নীরব। কারো সাতেও নেই পাঁচেও নেই। দুনিয়ার কোন খবর সে রাখে না। ক্রিকেটের খবর ছাড়া।

সে কথা আরেক দিন বলবো। সেই শুভ্র আজ সুপার মুনের খবর শুনে হইচই শুরু করে দিয়েছে। ব্যাপারটা কেমন যেন ঠেকলো আমাদের কাছে। একজন তো বলেই বসলো: কিরে তোকে কত কীর কথা বলি, কোন রিঅ্যাকশন দেখি না। হঠাৎ সুপার মুন নিয়ে তোর এত আগ্রহ, কাহিনী কি?

শুভ্র সবাইকে অবাক করে বলল: বারে মানুষের রুচির বুঝি পরিবর্তন আসতে পারে না। এতদিন আগ্রহরা ডিম আকারে ছিল। আজ বাচ্চা ফুটেছে। তাই আগ্রহবোধ করছি। এতে কারো কোন সমস্যা হওয়ার তো কথা না। তাছাড়া এতদিন পর এত্তবড় চাঁদ উঠছে। আশি বছর পর আবার উঠবে। তখন বেঁচে থাকি না থাকি কে জানে। ইস! কত্তবড় চাঁদ। কত্ত আলো। ভাবতেই চোখের মণি বড় হয়ে যাচ্ছে। শুভ্র স্ক্রাচ নাড়াচ্ছে আর কথা বলছে। ওর কথা শুনে। সবাই বিস্মিত। ও যে এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে এর আগে কেউ জানতাম না। ভাবতেই চোখের মণি বড় হয়ে যাচ্ছে।

কথাটা কানে বাজতে লাগলো আমার। নিজের চোখের মণি বড় হবে সেটা নিজে দেখবে কিভাবে! জিজ্ঞেস করলাম, তোর চোখের মণি বড় হচ্ছে তুই বুঝলি কি করে?

: আরে তুই এটাই জানিস না, চোখের মণি বড় হলে সামনের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়- HD প্রিন্টের মত । কখনো কি খেয়াল করেছিস, আমরা যখন অন্ধকার রুমে প্রবেশ করি। প্রথমে কিছুই দেখতে পাই না, কিন্তু একটু পর সবই আবছা আবছা দেখতে পাই। যখন আরো সময় যায়, চারপাশে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। এর কারণ হলো, আলোর মাঝে থাকলে চোখের মণি ছোট থাকে, অন্ধকারে গেলে মণি বড় হয়ে যায়। তবে এর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। সেটা আরেক দিন বলব। তাছাড়া তোর বাঁ চোখের পাপড়ির নিচে ছোট একটি তিল আছে আমি কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমার। মাসুম কে বললাম: দেখতো সত্যি কি না? ও প্রথমে খুঁজে পাচ্ছিল না। লাইটের সামনে গিয়ে ভাল করে দেখে বলল: সত্যিই আমি তো তাজ্জব বনে গেলাম। আমার চোখের পাপড়িতে তিল আমি দেখলাম না। ও দেখে ফেলল কিভাবে। অথচ জন্মের পর থেকে সাত সাত চৌদ্দবছর কেটে গেল আমার।

এবার সত্যি ওকে গুরুত্ব দিলাম। নাহ! ওকে সুপার মুন দেখানো দরকার। আবির গেল ছাদের দরজা খোলা আছে কি না দেখতে। কারেন্ট চলে গেছে। রুমের বাহিরে আবছা অন্ধকার। ভেতরে শুভ্রর টেবিলে আর আমাদের সামনে দুটি মোম জ্বলছে। কেমন ভ্যাপসা গরম। আমি খাতায় আঁকিবুকি করছি। নিশ্বাসে মোমের আলো তিরতির করে কাঁপছে। হঠাৎ করে শুভ্র প্রশ্ন করে বসলো। আচ্ছা! সুপার মুন মানে কি?

মাসুম বলল: বিশেষ চাঁদ বা সেরা চাঁদ।

: সেরা চাদ মানে?

মাসুম বলল: সেরা চাদ মানে বড় চাঁদ। আজ চাঁদ পৃথিবীর কাছে চলে আসবে তাই বড় দেখা যাবে। এরকম সব সময় হয় না হঠাৎ হঠাৎ হয়। তাই এটাকে সুপার মুন বলা হয়।

আমি অবাক হলাম। মাসুম কি সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলে দিল। আমি হলে নিশ্চিত প্যাচ লাগাতাম।

শুভ্র বলল: সেরা চাঁদ মানে যদি বড় চাঁদ হয় তাহলে বিগ মুন না বলে সুপার মুন বলে কেন?

এবার মাসুম কঠিনভাবে জব্দ হল। এর কি উত্তর হতে পারে চিন্তা করছে। মাঝে মাঝে মাথা চুলকাচ্ছে। আচ্ছা মাথা চুলকালে কি বুদ্ধি বের হয়? হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। কবির স্যার ক্লাসে অংক না মিললে মাথা চুলকান। একটু পর সত্যি সত্যি তার সমাধান বের করে ফেলেন। কিন্তু দিপুর বেলায় ফলাফল হয় উল্টো। মাথা চুলকায় যাতে অংকটা মিলে যায়। সাথে মাইর থেকেও বেঁচে যায়। কিন্তু তার চুলকানো কোন কাজ দেয় না। এদিক থেকে থিওরিটা মাঝামাঝিতে আছে। ইতিমধ্যে আবির এসে জানালো ছাদের গেট লাগানো। অতএব ঢাকা শহরের এত ফ্লাট বাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে আর যাই হোক চাঁদ দেখা যাবে না।

খবর শুনে সবার মন খারাপ। শুভ্রর তো আরো। অবস্থা দেখে মাসুম গেল খোঁজ নিতে। এবার সবাই ভরসা পেল। যাক এবার একটা ব্যবস্থা হবে হয়তো। মাসুম যেতেই ভয় হচ্ছিল শুভ্রকে নিয়ে। কখন না আবার উল্টা পাল্টা প্রশ্ন করে বসে। তখন কে গুছিয়ে উত্তর দিবে। বাঁচার জন্য গল্প শুরু করে দিলাম। গত বছরের সুপার মুন দেখার গল্প। এর মাঝে শুভ্র বলল,আমার বাথরুম চেপেছে। আমি আসি। শুনে আমি তো হাঁফ ছেড়ে বাচলাম। তবে বাকিদের আগ্রহে বলা শুরু করলাম। বেশিদূর আগানো গেল না। হাবিবের আজগুবি সব প্রশ্ন বাগরা বসালো। গল্প বলার মুডই নষ্ট করে দিল। এমনিতেই গুছিয়ে বলতে পারি না। তার মাঝে কথায় বাম হাত। পরে জোরেশোরে একটি ধমক লাগালাম। মন চাচ্ছিল কষে একটা থাপ্পড় মারি। কিন্তু তা কখনো উচিত নয় । বন্ধুদের বকতে হয় মারতে নেই। মাসুম চলে এলো। চেহারা দেখে বুঝা গেল এবারও সে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে। মাসুম বলল: দারোয়ান চাচাকে বলে কয়ে রাজি করিয়েছি ছাদের গেট খুলে দিতে। চল আজ মন ভরে জোছনা দেখবো। আমি বললাম, কিন্তু শুভ্র, ওতো আজকের মূল দর্শক।

হাসান বলল: ও আস্তে আস্তে আসুক। আমরা না হয় একবার দেখে আসি।

সবাই এককথায় রাজি হয়ে গেল । যাবার জন্য বের হব তখনই শুভ্র এসে হাজির। এসেই বলল: নারে চাঁদ দেখবো না। কথা শুনে আমরা তো আকাশ থেকে পয়লাম। সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলাম: চাঁদ দেখবি না মানে? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? এত কষ্ট করে তোর জন্য ছাদের গেট খোলা হল আর এখন তুই কিনা বলছিস দেখবি না। মানে কি?

শুভ্র বলল: আগ্রহের চারাটা মরে গেছে । তাই এখন আর আগ্রহ পাচ্ছি না। আবার আগ্রহ জাগলে বলবো। কথাটুকুন বলেই ঠকঠক করে চলে গেল। আমরা শুধু হা করে তাকিয়ে আছি। চেহারা দেখে মনে হল ও বেশ আনন্দে আছে। মনটা একেবারে খারাপ হয়ে গেল। ওতো বিগমুন দেখলো না সাথে আমাদেরও সুপারমুন দেখতে দিল না। আমাদের কষ্ট দিয়ে ও কিভাবে আনন্দে আছে। পরের দিন ওকে খুব করে চেপে ধরলে সত্য বলল । ও নাকি বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে চাঁদ দেখে নিয়েছিল। তাই এসে আমাদের সাথে এমন ভাব নিয়েছে। তখন রাগে মনে হচ্ছিল…।

Related posts

Top