পবিত্র হজের পবিত্র নিদর্শন [দ্বিতীয় পর্ব]

সাফা পাহাড় : কাবা শরীফ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, ১৩০ মিটার দূরে, সাফা পাহাঙ অবস্থিত। সাফা একটি ছোট পাহাঙ যার উপর বর্তমানে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং এ পাহাঙের একাংশ এখনও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আর বাকি অংশ পাকা করে দেয়া হয়েছে। সমতল থেকে উঁচুতে এই পাকা অংশের ওপরে এলে সাফায় উঠেছেন বলে ধরে নেয়া হবে। সাফা পাহাঙের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এখনও পবিত্র কাবা দেখতে পারা যায়।

মারওয়া পাহাড় : শক্ত সাদা পাথরের ছোট্ট একটি পাহাঙ। পবিত্র কাবা থেকে ৩০০ মিটার দূরে পূর্ব- উত্তর দিকে অবস্থিত। বর্তমানে মারওয়া থেকে কাবা শরীফ দেখা যায় না। মারওয়ার সামান্য অংশ খোলা রাখা হয়েছে। বাকি অংশ পাকা করে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

মাসয়া : সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানকে মাসয়া বলা হয়। মাস’আ দীর্ঘে ৩৯৪.৫ মিটার ও প্রস্থে ২০ মিটার। মাসআ’র গ্রাউন্ড ফ্লোর ও প্রথম তলা সুন্দরভাবে সাজানো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভিঙ হলে প্রথম তলায় গিয়েও সাঈ করতে পারেন। প্রয়োজন হলে ছাদে গিয়েও সাঈ করা যাবে তবে খেয়াল রাখতে হবে আপনার সাঈ যেন মাসআ’র মধ্যেই হয়। মাসআ থেকে বাইরে দূরে কোথাও সাঈ করলে সাঈ হয় না।

রুকনে ইয়ামানি : কাবা শরীফের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ। তাওয়াফের সময় এ কোণকে সুযোগ পেলে স্পর্শ করতে হয়। চুম্বন করা নিষেধ। হাদিসে এসেছে, ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দুই রুকনে ইয়ামানি ব্যতীত অন্য কোনো জায়গায় স্পর্শ করতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি  ৩/১৫১৩)

মুলতাজাম : হাজরে আসওয়াদ থেকে কাবা শরীফের দরজা পর্যন্ত জায়গাটুকুকে মুলতাজাম বলে (আল মুসান্নাফ লি আব্দির রাজ্জাক: ৫/৭৩)। মুলতাজাম শব্দের আক্ষরিক অর্থ এঁটে থাকার জায়গা। সাহাবায়ে কেরাম মক্কায় এসে মুলতাযামে যেতেন ও দু’হাতের তালু, দু’হাত, ও চেহারা ও বক্ষ রেখে দোয়া করতেন। বিদায় তাওয়াফের পূর্বে বা পরে অথবা অন্য যে কোনো সময় মুলতাযামে গিয়ে দোয়া করা যায়। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন, যদি মুলতাযামে আসার ইচ্ছা করে মুলতাজাম হল হাজরে আসওয়াদ ও দরজার মধ্যবর্তী স্থানÑ অতঃপর সেখানে তার বক্ষ, চেহারা, দুই বাহু ও দুই হাত রাখে ও দোয়া করে, আল্লাহর কাছে তার প্রয়োজনগুলো সওয়াল করে তবে এরূপ করার অনুমতি আছে। বিদাযড় তাওয়াফের পূর্বেও এরূপ করতে পারবে। মুলতাজাম ধরার ক্ষেত্রে বিদাযড় অবস্থা ও অন্যান্য অবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর সাহাবগণ যখন মক্কায় প্রবেশ করতেন তখন এরূপ করতেন (শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার মজমূউল ফতুওয়া: ২৬/১৪২)। তবে বর্তমান যুগে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিঙে মুলতাযামে ফিরে যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই সুযোগ পেলে যাবেন অন্যথায় যাওয়ার দরকার নেই। কেননা মুলতাযামে যাওয়া তাওয়াফের অংশ নয়।

মাতাফ : কাবা শরীফের চার পাশে উন্মুক্ত জায়গাকে মাতাফ বলে। মাতাফ শব্দের অর্থ, তাওয়াফ করার জায়গা। মাতাফ সর্বপ্রথম পাকা করেন আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, কাবার চার পাশে প্রায় ৫ মিটারের মত। কালক্রমে মাতাফ স¤প্রসারিত করা হয়। বর্তমানে শীতল মারবেল পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে মাতাফ যা প্রচণ্ড রোদের তাপেও শীতলতা হারায় না, ফলে হজকারীগণ আরামের সাথে পা রেখে তাওয়াফ সম্পন্ন করতে পারেন।

হাতিম : কাবাঘরের উত্তর পাশে একটু উঁচু স্থানে দেয়াল দিয়ে ঘেরা অংশই হাতিম। শবে মেরাজের রাতে এই স্থানে হুজুর সা.’কে জিবরাইল আ. বক্ষ বিদীর্ণ করে জমজমের পানি দিয়ে হৃৎপি- ধুয়ে দিয়েছিলেন।

সাওর পাহাড় : মসজিদুল হারাম থেকে ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। হুজুর সা. ও আবুবকর রা. মক্কা থেকে মদিনায় প্রথম হিজরতের সময় এই পাহাঙের চূঙার একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সাওর পাহাঙের উচ্চতা চার হাজার ফুট।

আবু কুবাইস পাহাড় : মক্কা মুয়াজ্জামার পূর্ব প্রান্তে এই পাহাঙ অবস্থিত। এই পাহাঙের কাছে একটি উপত্যকায় হুজুর সা. তিন বছর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট অবস্থায় চরম কষ্টের মধ্যে ছিলেন। নূহ আ. মহাপ্লাবনের সময় হাজরে আসওয়াদকে এই পাহাঙে রেখেছিলেন। এই পাহাঙের কাছে দাঁডড়য়ে নবী করিম সা. আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখ-িত করেন।

মসজিদুল হারাম : কাবা শরীফ, ও তার চার পাশের মাতাফ, মাতাফের ওপারে বিল্ডিং, বিল্ডিঙের ওপারে মারবেল পাথর বিছানো উন্মুক্ত চত্বর এ সবগুলো মিলে বর্তমান মসজিদুল হারাম গঠিত। কারও কারও মতে পুরা হারাম অঞ্চল মসজিদুল হারাম হিসেবে বিবেচিত। পবিত্র কুরআনের এক আয়াতে এসেছে, তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে (সূরা আলফাত্হ: ২৭)  অর্থাৎ হারাম অঞ্চলে প্রবেশ করবে। সূরা ইসরায় মসজিদুল হারামের কথা উল্লেখ হয়েছে। এরশাদ হয়েছে,  পবিত্র সেই সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় রাতের বেলায় নিয়ে গেলেন, যার চার পাশ আমি করেছি বরকতময় (সূরা আল ইসরা:১) । ইতিহাসবিদদের মতানুসারে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে উম্মে হানীর ঘরের এখান থেকে ইসরা ও মেরাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তৎকালে কাবা শরীফের চারপাশে সামান্য এলাকা জুঙে ছিল মসজিদুল হারাম, উম্মে হানীর ঘর মসজিদুল হারাম থেকে ছিল দূরে। তা সত্ত্বেও ওই জায়গাকে মসজিদুল হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মসজিদে মিকাত : মদিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে মসজিদে নববী থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এ মসজিদটি অবস্থিত। ঐতিহাসিক আকিক উপত্যকার পশ্চিম পাশেই মসজিদটির অবস্থান। রাসুলুল্লাহ সা. হজ বা উমরাহ পালনের উদ্দেশে মক্কা যাওয়ার সময় এখানকার একটি গাছের নিচে নামতেন এবং সেখানে সালাত আদায় করে উমরাহ অথবা হজের ইহরাম বাঁধতেন। এ কারণেই মসজিদটিকে শাজারাহ্ বলা হয়। এটি মদিনাবাসীর মিকাত বলে এ মসজিদটি মসজিদে মিকাত নামে পরিচিত।

মসজিদে জুমুয়া : রাসুলুল্লাহ সা. হিজরতের সময় কুবার অদূরে রানুনা উপত্যকায় একশ’ জন সাহাবাকে নিয়ে মসজিদে জুমুআর স্থানে প্রথম জুমুয়ার নামাজ আদায় করেন। পরবর্তিতে এটি মসজিদে জুমুআ নামে পরিচিত হয়ে যায়।

মসজিদে গামামাহ : এ মসজিদকে মুসাল্লাহও বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সা. প্রথম ঈদের নামাজ ও শেষ জীবনের ঈদের নামাজগুলো মসজিদে গামামাহর স্থানে আদায় করেন। এ স্থানে নবীজি সা. বৃষ্টির জন্য নামাজ পঙেছেন বলে একে মসজিদে গামামাহ বলা হয়। এটি মসজিদে নববীর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে াঅবস্থিত।

মসজিদে আবু বকর রা. : এটি মসজিদে গামামাহর উত্তরে অবস্থিত। হজরত আবু বকর রা. খলিফা থাকাকালে এ মসজিদে ঈদের নামাজ পঙান। তাই এটি মসজিদে আবু বকর রা. হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

মসজিদে কুবা : হজরত মুহাম্মদ সা. মদিনায় আগমন করে প্রথম শহরের প্রবেশদ্বারে কুবায় নামাজ পঙেন। পরে এখানে একটি মসজিদ গঙে ওঠে। মসজিদটি মসজিদে কুবা হিসাবেই পরিচিতি লাভ করে। হজে সময় পেলে দেখে আসতে পারেন মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুরআন ছাপা প্রকল্প। এখানে প্রতি মিনিটে ৫০০ কুরআন ছাপা হয়। দেখতে পারেন ওহুদ বদর প্রান্তর। যে স্থান গুলোতে নবীজি যুদ্ধ করে অর্জন করেছেন ইসলামের বিজয়।

নবীজী সা.-এর বাড়ি : মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ৪৪০ গজ পূর্বে হুজুর সা.-এর পিতার বাডড়। এখানে হুজুর সা.-এর জন্ম হয়। এই বাডড়টি এখন পাঠাগার। হুজুর সা.-এর বাসগৃহ ও মসজিদুল হারামের মাঝে ছিল আবু জাহলের বাডড়। বর্তমানে এই বাডড়টিতে গোসলখানা, প্রগ্রাবখানা ও পায়খানা করা হয়েছে।

জান্নাতুল মুয়াল্লা : মাসজিদুল হারাম থেকে উত্তর দিকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার দূরে এই গোরস্থান। এখানে খাদিজা রা., নবী করিম সা., মাতা আমিনা, দাদা আব্দুল মোত্তালিব, চাচা আবু তালেব, পুত্র কাসেম রা.সহ অনেক সাহাবির রওজা পাক অবস্থিত।

রওজায়ে জান্নাত : হুজরায়ে মোবারক ও মিম্বার শরিফের মাঝখানের জায়গাটি ‘রওজায়ে জান্নাত’ বা ‘রিয়াজুল জান্নাহ’ বা ‘বেহেশতের বাগান’ নামে পরিচিত। এ স্থানটির বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এখানে নামাজ পড়ারও বিশেষ ফজিলত আছে। মসজিদে নববীর ভেতরে কয়েকটি স্তম্ভ রয়েছে সেগুলোকে রহমতের স্তম্ভ বা খুটি বলে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তৈরি মসজিদে খেজুর গাছের খুঁটিগুলোর স্থানে উসমানী সুলতান আব্দুল মাজিদ পাকা স্তম্ভ নির্মাণ করেন। এগুলোর গায়ে মর্মর পাথর বসানো এবং স্বর্নের কারুকাজ করা। প্রথম কাতারে ৪টি স্তম্ভের লাল পাথরের এবং পাথর্ক্য করার সুবিধার জন্য সেগুলোর গায়ে নাম অংকিত রয়েছে।

উস্তুওয়ানা হান্নানা (সুবাস স্তম্ভ) : মিম্বারে নববির ডান পাশে খেজুরগাছের গুঁড়ির স্থানে নির্মিত স্তম্ভটি। নবী করিম (সা.) মিম্বার স্থানান্তরের সময় এ গুঁড়িটি উঁচু স্বরে কেঁদেছিলেন।

উস্তুওয়ানা সারির : এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইতিকাফ করতেন এবং রাতে আরামের জন্য তাঁর বিছানা এখানে স্থাপন করা হতো। এ স্তম্ভটি হুজরা শরিফের পশ্চিম পাশে জালি মোবারকের সঙ্গে রয়েছে।

উস্তুওয়ানা উফুদ : বাইরে থেকে আগত প্রতিনিধিদল এখানে বসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করতেন এবং এখানে বসেই কথা বলতেন। এ স্তম্ভটিও জালি মোবারকের সঙ্গে রয়েছে।

উস্তুওয়ানা আয়েশা (আয়েশা স্তম্ভ) : নবী করিম (সা.) বলেছেন, আমার মসজিদে এমন একটি জায়গা রয়েছে, লোকজন যদি সেখানে নামাজ পড়ার ফজিলত জানত, তাহলে সেখানে স্থান পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করত। স্থানটি চিহ্নিত করার জন্য সাহাবায়ে কিরাম চেষ্টা করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আয়েশা (রা.) তাঁর ভাগ্নে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) -কে সে জায়গাটি চিনিয়ে দেন। এটিই সেই স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি উস্তুওয়ানা উফুদের পশ্চিম পাশে রওজায়ে জান্নাতের ভেতর।

উস্তুওয়ানা আবু লুবাবা (তওবা স্তম্ভ): হজরত আবু লুবাবা (রা.) থেকে একটি ভুল সংঘটিত হওয়ার পর তিনি নিজেকে এই স্তম্ভের সঙ্গে বেঁধে বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত হুজুরে পাক (সা.) নিজে না খুলে দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এর সঙ্গে বাঁধা থাকব।’ নবী করিম (সা.) বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে আল্লাহ আদেশ না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত খুলব না।’ এভাবে দীর্ঘ ৫০ দিন পর হজরত আবু লুবাবা (রা.)-এর তওবা কবুল হলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তাঁর বাঁধন খুলে দিলেন। এটি উস্তুওয়ানা উফুদের পশ্চিম পাশে রওজায়ে জান্নাতের ভেতর অবস্থিত।

উস্তুওয়ানা জিবরাইল : ফেরেশতা হজরত জিবরাইল (আ.) যখনই হজরত দেহইয়া কাল্বী (রা.)-এর আকৃতি ধারণ করে ওহি নিয়ে আসতেন, তখন অধিকাংশ সময় তাঁকে এখানেই উপবিষ্ট দেখা যেত।

মিহরাবে নববি : মাকরুহ ওয়াক্ত না হলে কাউকে কষ্ট না দিয়ে এখানে নফল নামাজ পড়–ন। মিহরাবের ডানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাঁড়ানোর জায়গা।

ওহুদ প্রান্তর : ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় যুদ্ধ সংঘঠিত হয় এই প্রান্তরে। দুই মাথাওয়ালা একটি পাহাড়, দুই মাথার মাঝখানে একটু নিচু স্থানের মতো রয়েছে -এটাই ওহুদের প্রান্তর। তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

Related posts

Top