পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

একজন মুসলমানের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল পরিচ্ছন্নতা। মুমীন তার ঈমানের অন্যতম অংশ মনে করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে। সুতরাং তারা আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় অবস্থাতেই পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্ন করেন।

রাসূলুল্লাহ সা. সব সময় পরিচ্ছন্ন থাকতেন, আমাদেরকেও সব সময় পরিচ্ছন্ন থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের যে কাজের নির্দেশ করেছেন তা হলো মিসওয়াক করা। মিসওয়াকের মাধ্যমে আমাদের মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়। মুখ পরিচ্ছন্ন হয়। দাঁত ভালো থাকে। আমার মুখের দুর্গন্ধ দ্বারা অন্যে কষ্ট পায় না। হাদীস শরীফে এসেছে- সকালে ঘুম থেকে উঠে নবীজী সবার আগে মিসওয়াক করতেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৫৯৭৯

আমরা যদি সকালে মিসওয়াক (মুখ ও দাত পরিষ্কার) না করে ঘর থেকে বের হই তাহলে যার সাথেই দেখা হবে সেই আমাদের মুখের দুর্গন্ধে কষ্ট পাবে। এটা আমরা আরো ভালোভাবে তখন বুঝতে পারি যখন অন্য কারো মুখের দুর্গন্ধে কষ্ট পাই। শুধু তাই নয়, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম বাইরে থেকে যখন ঘরে ফিরতেন, তখন ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে মিসওয়াক করতেন; যাতে মুখের দুর্গন্ধের কারণে ঘরের মানুষ কষ্ট না পায়। আয়েশা রা. বলেন, নবীজী যখনই ঘরে প্রবেশ করতেন প্রথমে মিসওয়াক করতেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৩

মুখের পরিচ্ছন্নতা মানুষের জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মিসওয়াকের বিষয়ে আমাকে এত বেশি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আমার আশংকা হচ্ছিল, মিসওয়াক করা ফরয করে দেওয়া হবে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬০০৭

পরিচ্ছন্নতার আরেকটি দিক হলো লেবাসের পরিচ্ছন্নতা। এটিই আমাদের সবচেয়ে বেশি নজরে পড়ে। যার পোশাক পরিচ্ছন্ন থাকে তাকে আমরা পরিচ্ছন্ন বলি। যার পোশাক অপরিচ্ছন্ন থাকে তাকে বলি ‘নোংরা ছেলে’। আর পোশাক অপরিচ্ছন্ন থাকলে মন ও শরীরের উপর এর প্রভাব পড়ে। মন মরা মরা থাকে, মেযাজ খিটখিটে হয়ে যায়, শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। তার সাথে কেউ মিশতে চায় না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করতন। সুতরাং পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা একটি সুন্নত। আর তিনি অপরিচ্ছন্ন পোশাক পছন্দ করতেন না। হযরত জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাদের বাড়িতে এলেন, এক ব্যক্তির পোশাক ময়লা দেখে বললেন, সে কি তার কাপড় পরিচ্ছন্ন রাখার মত পানি পায় না? -সুনানে আবু দাউদ হাদীস ৪০৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৪৮৫০

খুব দামী পোষাক পরিধান করে অপরিচ্ছন্ন থাকার চেয়ে স্বল্প মূল্যের পোষাক পরিচ্ছন্নভাবে পরিধান করা শ্রেয়। ঘর্মাক্ত অবস্থায় শরীরে দুর্গন্ধ নিয়ে অন্য কারো সাথে মেশা উচিত নয়। এতে লোকেরা কষ্ট পায়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে জুমার দিন গোসল করার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, জুমার দিন মসজিদে অনেক মানুষের সমাগম হয়, এখন এর মধ্যে যদি গোসল না করার কারণে কিছু মানুষের শরীর থেকে ঘামের দুর্গন্ধ বের হয়, তাহলে অন্য সকলের কষ্ট হবে। জুমার মত এমন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে ব্যঘাৎ ঘটবে। যা কখনোই কাম্য নয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ যখন জুমার জন্য মসজিদে আসে সে যেন গোসল করে আসে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৭৭

শুধু গোসল নয় বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন গোসল করে, মিসওয়াক করে, আতর লাগিয়ে আসতে বলেছেন। আর প্রতি জুমার দিন হাত-পায়ের নখ কাটতে হয়- একথা আমাদের সকলেরই জানা রয়েছে। এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দশটি বিষয় মানুষের স্বভাবজাত; তার মধ্যে একটি হল, হাত-পায়ের নখ কাটা।”  রুচিশীল মানুষ কখনো হাত-পায়ের নখ না কেটে থাকতে পারে না। যদি সময় মতো নখ না কাটা হয় তাহলে নখের মধ্যে ময়লা জমে; সেটা পেটে গিয়ে পেটের ক্ষতি করে। যারা নখ বড় রাখে তাদের আমরা কখনো রুচিশীল মানুষ বলতে পারি না। সুতরাং কেউ যদি রুচিশীলতার পরিচয় দিতে চায়, তার হাত-পায়ের নখ কখনো অতিরিক্ত মাত্রায় বড় থাকতে পারেনা।

আলোচ্য প্রবন্ধে পরিচ্ছন্নতার কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও আমাদের ঘর, পড়ার টেবিল, বিছানা-পত্র, কাথা-বালিশ, বাড়ির আঙিনা সবই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। সুস্থ্য থাকতে পরিচ্ছন্নতার কোন বিকল্প নেই। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা মানবজীবনে নানাবিধ রোগ-ব্যাধির জন্ম দেয়। সুতরাং, আমাদের পরিচ্ছন্ন জীবন গড়তে আমাদের নিজেদেরকে সচেষ্ট হতে হবে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন নগর-শহর গড়ায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

Top