পহেলা বৈশাখ ও ইসলাম

আমাদের এ বঙ্গদেশে প্রতি বাংলা নববর্ষে ঘটা করে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। হিন্দু-মুসলিম, দল-মত নির্বিশেষে সবাই এ উৎসবে অংশগ্রহণ করে। অনেকে বলে এটা বাঙালী জাতির ঐতিহ্য, কারো মতে এটা দেশীয় উৎসব আর কারো নিকট এটা নিছক রঙ-তামাশা ও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যম মাত্র। একধাপ এগিয়ে কোনো কোনো বুদ্ধিজীবি এটাকে ইসলামের দৃষ্টিতেও বৈধ বানানোর অপচেষ্টা করেছে। মোটকথা, প্রত্যেকেই এটাকে স্বীকৃত ও বৈধ উৎসব হিসেবে প্রমাণের জন্য যুক্তি পেশ করেছে। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে এক্ষেত্রে ইসলামী দিক-নির্দেশনা কী সে কথা ভেবে দেখার লোক নিতান্তই কম। এ বিষয়ে উদাসীনতা আজ আমাদের মুসলিম সমাজের স্বকীয়তার জন্য মারাত্মক এক অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আজ আমরা এ প্রসঙ্গে এর সূচনা, ইতিহাস ও এর ইসলামী বিধান নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

পহেলা বৈশাখের সূচনা ও ইতিহাস :
আমাদের দেশে ১৪ই এপ্রিল অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়ে থাকে। বর্তমানের প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত আরবী হিজরী সনেরই একটি পরিবর্তিত রূপ। মোঘল শাসনামালে ভারতে হিজরী পঞ্জিকানুসারেই জনগণ থেকে খাজনা-ট্যাক্স উসুল ও অন্যান্য সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। কিন্তু কিছুদিন এভাবে চলার পর খাজনা-কর আদায়ে সমস্যা দেখা দিলো। কেননা, হিজরী সন চান্দ্রমাসের উপর নির্ভরশীল, যা সৌর বৎসরের চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। আর চাষাবাদ ও এ জাতীয় অনেক কাজ সৌরবৎসরের সাথে সম্পৃক্ত। এতে করে সৌর বৎসরের হিসেবের সাথে চান্দ্র বৎসরের হিসেবের গড়মিল হওয়ায় যথাসময়ে প্রজাদের ফসলের কর-খাজনা আদায় করা দুষ্কর হয়ে পড়ছিলো। তখন ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সিদ্ধান্তে প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সম্রাট আকবার তার দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমীর ফতেহুল্লাহ সিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবার হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন, যা এখন বাংলা সন বলে পরিচিত। তবে সম্রাট এ থেকে ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ সালের গণনা শুরু হয়। ইতিপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাস ছিলো শকাব্দ বা শক তথা চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিলো বাংলা বৈশাখ মাস এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাস এবং পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়। তাহলে বাংলা সন মূলত হিজরী সনেরই পরিবর্তিত রূপ। রাসূলুল্লাহ সা.-এর হিজরত থেকেই এ পঞ্জিকার শুরু। ১৪২৫ বঙ্গাব্দ অর্থ রাসূলুল্লাহ সা.-এর হিজরতের পর ১৪২৫ বৎসর। এর মধ্যে ৯৬২ পর্যন্ত চান্দ্র বৎসর ও পরবর্তী ৪৬৩ বছর সৌর বৎসর। সৌর বৎসর চান্দ্র বৎসরের চেয়ে ১১/১২ দিন বেশি হওয়ায় প্রতি ৩০ বৎসরে চান্দ্র পঞ্জিকাবর্ষে এক বৎসর বেড়ে যায়। এজন্য ১৪৩৯ হিজরী সাল মোতাবেক বাংলা ১৪২৫ সাল হয়।

মোঘল আমলে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতো এবং পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে কিছু আনন্দ উৎসব করতো। এছাড়া বাংলার সকল ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা পহেলা বৈশাখে হালখাতা করতো। প্রথম প্রথম পহেলা বৈশাখ এসব কর্মকান্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। এরপর ধীরে ধীরে এতে বিভিন্ন বিষয় সংযোজন হতে হতে আজকের এ জাকজমকপূর্ণ স্বতন্ত্র উৎসবের রূপ নিয়েছে।

ইসলামে পহেলা বৈশাখ পালনের বিধান :
ইসলামে দিবস পালনের বিষয়ে কয়েকটি মূলনীতি জানলেই পহেলা বৈশাখ পালনের বৈধতা-অবৈধতা উপলব্ধি করা সহজ হবে। আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রথমে মূলনীতিগুলো উল্লেখ করছি।

১ নং মূলনীতি : ইসলামে জাতিগতভাবে উৎসব পালনের জন্য শুধুমাত্র দু’টি দিন নির্ধারণ রয়েছে। এক হলো ঈদুল ফিতর আর দ্বিতীয়টি হলো ঈদুল আযহা। আল্লাহ তাআলা বলেন, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যই আমি নিয়ম-কানুন নির্ধারণ করে দিয়েছি, যা তারা পালন করে। সুতরাং তারা যেনো এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গে বিতর্ক না করে। (সূরা হজ : ৬৭) আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. যখন মদীনায় আসলেন তখন তাদের দু’টি উৎসবের দিন ছিলো। তিনি বললেন, এ দু’টি দিনের তাৎপর্য কী? তারা বললো, জাহিলিয়্যাতের যুগে আমরা এ দু’টি দিনে উৎসব পালন করতাম। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, এ দিনগুলোর পরিবর্তে আল্লাহ তাআলা তোমাদের উত্তম দু’টি দিন দিয়েছেন; কুরবানীর ঈদ ও রোযার ঈদ। (সুনান আবু দাউদ : ১১৩৪) এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে জাতীয়ভাবে দু’টি উৎসবই নির্ধারিত। আর কুরআনের ভাষ্যমতে মুসলিমদের জন্য নিজ ধর্মের অনুমোদিত উৎসবই শুধু বৈধ, এর বাহিরে অন্য কোনো উৎসব-পার্বন পালনের অনুমতি নেই।

২ নং মূলনীতি : ইসলামে বিধর্মী ও বদদীন লোকদের সাদৃশ অবলম্বন করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ : ৫১১৫) এ হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, বিজাতীয় ও বদদীন লোকদের অনুষ্ঠানে শরীক হওয়া, এতে সমর্থন দেয়া নাজায়েয ও হারাম। এতে এরাও তাদের শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবে।

৩ নং মূলনীতি : অশ্লীলতাপূর্ণ উৎসব পরিত্যাগ করা মুসলিমদের জন্য একান্ত আবশ্যক। নিজে অশ্লীল কাজ করা; এমনকি অশ্লীল কাজের প্রচার কামনা করাও জঘণ্যতম অপরাধ ও হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সূরা নূর : ১৯) অতএব অশ্লীলতাপূর্ণ সকল ক্ষেত্র মুসলিমদের জন্য হারাম। তাতে শরীক হওয়া কিংবা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয়া সবই নাজায়েয।

৪ নং মূলনীতি : অপচয় ও অনর্থকমূলক কাজ থেকে মুসলমানদের বেঁচে থাকা কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা খাও, পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীকে ভালোবাসেন না। (সূরা আ’রাফ: ৩১) আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, নিশ্চয় অপচয়কারীরা হলো শয়তানের ভাই। (সূরা বনী ইসরাঈল : ২৭) আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অনর্থক বিষয় ত্যাগ করা। (সুনানে তিরমিযী : ২৩১৭)

৫ নং মূলনীতি : সংশয়পূর্ণ বিষয় পরিত্যাগ করে সংশয়মুক্ত বিষয় গ্রহণ করার নির্দেশ রয়েছে। হাসান বিন আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যা তোমাকে সন্দেহে নিপতিত করবে তা পরিত্যাগ করো আর যাতে কোনো সন্দেহ নেই সেটাই করো। (সুনানে নাসায়ী : ৫৭১১) সুতরাং কোনো বিষয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ থাকলে তা যদি আবশ্যকীয় জাতীয় কাজ না হয়ে থাকে তাহলে একজন মুমিনের কর্তব্য হলো তা পরিত্যাগ করা। কেননা, কাজটি বৈধ হলেও তা না করার কারণে তার কোনো গোনাহ হবে না, কিন্তু তা অবৈধ হয়ে থাকলে এতে জড়িত হওয়ার দরুন সে গোনাহগার হয়ে পড়বে, যা কখনো একজন সাচ্চা মুমিনের কামনা হতে পারে না।

সারকথা :
এ পাঁচটি মূলনীতিকে সামনে রেখে বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কারভাবে বুঝে আসে যে, বর্তমানের প্রচলিত পহেলা বৈশাখ পালন করা, এতে শরীক হওয়া ও এর সমর্থন করা হারাম ও নাজায়েয। কেননা, আমাদের মুসলিমদের জন্য কুরআন এবং সুন্নাহর বাহিরে যাওয়ার কোনো অধিকার নেই। আর কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের উৎসবের জন্য নির্ধারিত দু’টি দিন রেখে অন্যান্য সকল জাতীয় উৎসবকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয়ত, পহেলা বৈশাখের সূচনার সাথে বিধর্মীয় কোনো উৎসব জড়িত না থাকলেও কালের পরিক্রমায় তা এখন সম্পূর্ণরূপে বিজাতীয় কৃষ্টি-কালচারের মৃগোয়া ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাস্তবতাকে আজ কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আর যদি এটাকে বিজাতীয় উৎসব নাও মানা হয় তথাপি এটা যে, বদদীন ও ফাসেকদের উৎসব এতে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। সর্বাবস্থায়ই এতে করে বিজাতীয় ও বদদীন লোকদের সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন হয়, যা হাদীসের ভাষ্যনুসারে নিন্দনীয় ও নাজায়েয। তৃতীয়ত, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ইদানিং যে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনী দেখা যাচ্ছে তা শুধু ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়; বরং সুস্থ রুচিশীল ও বিবেকসম্পন্ন যে কোনো লোকের জন্যই তা চরম বিব্রতকর এক পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অশ্লীলতাপূর্ণ একটি উৎসবকে সামান্য ইসলামের জ্ঞান রাখে এমন কেউ-ই বৈধ বলার মতো দুঃসাহস দেখাবে না। চতুর্থত, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পান্তা-ইলিশ, নবান্ন উৎসব, রং-বেরঙয়ের সাজ, নাচগান, হৈ-হুল্লোড় এসবই অপচয় ও চরম অনর্থক পর্যায়ের কাজ, যা নাজায়েয হওয়ার পাশাপাশি একজন মুসলিম হিসেবে মারাত্মক লজ্জাজনক একটি বিষয়। পঞ্চমত, যদি কারো ভুল ব্যাখ্যায় এটাকে বৈধ মনে করার সামান্য অবকাশ আছে বলে কারো মনে হয় তথাপিও হাদীসের ভাষ্যনুসারে তার জন্য এতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। কেননা, সংশয়পূর্ণ কাজে জড়িত হওয়া কোনো মুমিনের জন্য কক্ষনো শোভা পায় না। এটা বরং সুযোগসন্ধানীদের বৈশিষ্ট্য, যা মানুষকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

এছাড়াও এতে আরো অনেক শিরক ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস রয়েছে, যা একজন মুমিনের ঈমানকে মুহুর্তেই ধ্বংস করে দিতে পারে। যেমন মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা, নববর্ষের প্রথম প্রহরে সূর্যকে স্বাগত জানানো, রবি ঠাকুর রচিত শিরকমিশ্রিত বৈশাখী গান গাওয়া, এদিনে বিশেষ কাজকে মঙ্গলজনক বা অমঙ্গলজনক মনে করা এ জাতীয় অসংখ্য ঈমানবিধ্বংসী আকীদা-বিশ্বাস এর সাথে জড়িত। তাই সার্বিক বিবেচনায় এতে অংশগ্রহণ করা, সমর্থন করা ও প্রচার করা পরিষ্কার হারাম ও নাজায়েয এবং ক্ষেত্র বিশেষে আকীদাগত কারণে তা শিরকের পর্যায়েও চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। তাই মুসলিমদের জন্য বিজাতীয় এ উৎসবকে সর্বাত্মকভাবে বর্জন করে জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে রাসূলুল্লাহ সা. এর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য চেষ্ট করা একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর নির্দেশিত পথে চলে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন।

তারেকুজ্জামান
লেখক, কলামিস্ট ও শিক্ষক
শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা

Top