পুরুষের জন্যে স্বর্ণ পরিধান কেনো নিষিদ্ধ?

প্রশ্ন : পুরুষদের জন্য স্বর্ণ পরিধান করা নিষিদ্ধকরণের কারণটি কী? কেননা, আমরা জানি যে, দীন ইসলাম মুসলিম ব্যক্তির ওপর শুধু ঐসব বস্তুই হারাম করে, যাতে তার জন্য ক্ষতিকারক দিক রয়েছে—  সুতরাং স্বর্ণের তৈরি অলংকার পরিধান করার মধ্যে পুরুষদের জন্য কী ক্ষতি রয়েছে?

উত্তর : প্রথমেই জেনে রাখুন যে, প্রত্যেক মুমিনের জন্য শরীয়তের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কারণ হলো আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূলের (সা.) বাণী বা বক্তব্য । কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন—

﴿ وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ ﴾

অর্থ : আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ের ফয়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। [সূরা আহযাব, আয়াত ৩৬]

শরয়ী কারণ : সুতরাং যে কেউ আমাদেরকে কোনো বস্তু ওয়াজিবকরণ অথবা নিষিদ্ধকরণের ব্যাপারে আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র হিকমত ও তাৎপর্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, তার উত্তরে আমরা বলবো, এ ব্যাপারে অন্যতম প্রধান কারণ হলো আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল বলেছেন বলেই এটা হয়েছে এবং এ কারণটিই প্রত্যেক মুমিনের জন্য যথেষ্ট । আর এ জন্যই যখন আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, ঋতুবর্তী নারীর কি অবস্থা— সে সাওমের কাযা আদায় করবে, অথচ সালাতের কাযা আদায় করবে না? তখন জবাবে তিনি বলেন—

« كَانَ يُصِيبُنَا ذَلِكَ فَنُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ وَلاَ نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلاَةِ » . ( متفق عليه ) .

অর্থাৎ আমরা এ পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলাম; তখন আমাদেরকে সাওমের কাযা আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; সালাতের কাযা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়নি। [বুখারী, হাদিস ৭৮৯]

কেননা, আল্লাহর কিতাব অথবা তার রাসূলের সুন্নাহ’র অন্তর্ভুক্ত ‘নস’ তথা বক্তব্য প্রত্যেক মুমিনের জন্য শরীয়ত সাব্যস্ত হওয়ার আবশ্যকীয় ‘ইল্লাত’ বা কারণ; কিন্তু জনগণ কর্তৃক আল্লাহর বিধানসমূহের হিকমত ও তাৎপর্য অনুসন্ধান করাটা দোষের নয়; কারণ, এটা তার আস্থা ও বিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, তাছাড়া এটা ইসলামী শরীয়তের মর্যাদা বর্ণনা করে, যেহেতু বিধিবিধানসমূহ তার হেতু বা যৌক্তিকতার সাথে সংযুক্ত; আর তাছাড়া এর দ্বারা কিয়াসের ক্ষেত্র তৈরি হয়, যখন শরীয়তের বক্তব্য দ্বারা নির্ধারিত এ বিধানটির ‘ইল্লত’ বা কারণ অপর কোনো বিষয়ের মধ্যে বিদ্যমান থাকে, যার ব্যাপারে শরীয়তের কোনো ‘নস’ বা স্পষ্ট বক্তব্য নেই। সুতরাং শরয়ী হিকমত ও তাৎপর্য সম্পর্কে জানার এ তিনটি উপকারিতা রয়েছে।

বাহ্যিক কারণ : এরপর কথা হলো, নবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে স্বর্ণ পরিধান করা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে পুরুষদের জন্য, নারীদের জন্য নয় । কারণ, স্বর্ণ হলো সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের বস্তু, যার দ্বারা মানুষ সুসজ্জিত হয় এবং সুন্দর রূপ ধারণ করে । সুতরাং এটা হলো সৌন্দর্যের অলঙ্কার; আর এই ধরনের সৌন্দর্য পুরুষের উদ্দিষ্ট বিষয় নয় । অর্থাৎ সেই পুরুষ (পরিপূর্ণ) মানুষ নয়, যে অন্যের দ্বারা পরিপূর্ণতা অর্জন করে, বরং পুরুষ সেই, যে নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ।

কেননা, তার মধ্যে পুরুষত্ব আছে । তাছাড়া অপর ব্যক্তিকে তার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য সুন্দর সাজ গ্রহণ করা পুরুষের কোনো প্রয়োজন নেই । তবে নারীর বিষয়টি তার বিপরীত । কেননা, নারী অসম্পূর্ণ, তার সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা বিধানের প্রয়োজন রয়েছে । তাছাড়া সর্বোচ্চ মানের অলঙ্কার দ্বারা তার সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে, এমনকি তার ও তার স্বামীর মাঝে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতার জন্য এ ধরনের সুসজ্জিত হওয়ার বিষয়টি দাবি করে । সুতরাং এ কারণেই নারীর জন্য স্বর্ণের অলঙ্কার পরিধান করার বিষয়টি বৈধ করে দেওয়া হয়েছে, পুরুষের জন্য নয় । আল্লাহ তাআলা নারীর গুণ বা বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন—

﴿ أَوَ مَن يُنَشَّؤُاْ فِي ٱلۡحِلۡيَةِ وَهُوَ فِي ٱلۡخِصَامِ غَيۡرُ مُبِينٖ ١٨ ﴾

আর যে অলঙ্কারে লালিত-পালিত হয় এবং সে বিতর্ককালে স্পষ্ট বক্তব্যে অসমর্থ, সে কি? (আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে?)। [সূরা যুখরুফ, আয়াত ১৮] এরই মাধ্যমে পুরুষদের ওপর স্বর্ণ পরিধান করা নিষিদ্ধকরণের মধ্যকার শরয়ী হিকমত ও তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে যায়।

যারা পরে তাদের করণীয় : সুতরাং যারা স্বর্ণের অলঙ্কার পরিধান করে বিপথগামী হয়েছে; কেননা, তারা এর দ্বারা আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.)-এর অবাধ্য হয়ে গেছে এবং তারা নিজেদেরকে নারীদের সাথে সম্পৃক্ত করেছে । তারা অলঙ্কার হিসেবে পরিধানের জন্য আগুনের জ্বলন্ত অঙ্গার তাদের হাতে তুলে নিয়েছে, যা নবী (সা.) থেকে প্রমাণিত। সুতরাং তাদের জন্য জরুরি হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকট তাওবা করা ।

পুরুষের অলঙ্কার : তবে যদি তারা শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে রৌপ্যের অলঙ্কার পরিধান করতে চায়, তাহলে এতে কোনো অসুবিধা নেই । অনুরূপভাবে স্বর্ণ ব্যতীত অন্যান্য খনিজ পদার্থ থেকে তৈরি আংটি পরিধান করতেও তাদের জন্য দোষের কিছু হবে না, যদি তা অপচয় বা ফিতনার পর্যায়ে না পৌঁছায়।

পুরুষের ব্যবাহার্য স্বর্ণ বিক্রির বিধান : পুরুষের জন্য তৈরি করা স্বর্ণের আংটি বিক্রয় করাও হারাম, যখন বিক্রেতা জানতে পারবে যে, ক্রেতা অচিরেই তা পরিধান করবে অথবা তার প্রবল ধারণা মতে সে তা পরিধান করার সম্ভাবনা থাকবে; কারণ, এ উম্মতের পুরুষ ব্যক্তিদের উপর স্বর্ণ ব্যবহার করা হারাম; সুতরাং সে যখন তা এমন ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করবে, যার ব্যাপারে সে জানে অথবা তার প্রবল ধারণা হয় যে, সে তা পরিধান করবে, তখন সে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করল । অথচ আল্লাহ তা‘আলা অন্যায় ও সীমালংঘনের কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন; আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿ ۘ وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ ﴾

অর্থ : আর নেককাজ ও তাক্ওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। [সূরা মায়িদা, আয়াত ২]

পুরুষ ব্যক্তিদের পরিধানের জন্য স্বর্ণকার কর্তৃক স্বর্ণের আংটি তৈরি করা বৈধ নয়।

ফতোয়া : শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন।
সূত্র : মাজমূয়াতু আসইলাতিন ফি বাইয়ি ওয়াশশিরাই আয-যাহব

 

Related posts

Top