বাংলা ও হিজরি নববর্ষ : পরিচয় ও উৎপত্তি-পার্থক্য এবং করণীয়-বর্জনীয় ও উৎসব পালনের রূপরেখা

বাংলা সন সৃষ্টি হয়েছে হিজরি সন থেকে : বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ বাংলাদেশ এবং ভারত বর্ষের একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সৌরপঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিন গণনা শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। এই সময়টাই এক সৌর বছর। গ্রেগরিয়ান সনের মতো বাংলা সনেও মোট ১২ মাস। এগুলো হল ‌ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। বাংলা সন শুরু হয় পহেলা বৈশাখ বা বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে যে দিনটি ইংরেজি বর্ষপঞ্জির ১৪/১৫ এপ্রিল (ভারতে) এবং ১৪ এপ্রিল (বাংলাদেশে)। বাংলা সন সব সময়ই গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির চেয়ে ৫৯৩ বছর কম হয়। বাঙালী জাতি তথা বাঙালী মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে এই দিনটি বিশেষ গুরুত্ববহ একটি দিন।

রাজদরবার চলছিলে সম্রাট আকবরের ফরমান মোতাবেক। ভালোই চলছিলো সবকিছু। সমস্যা ছিলো না কোনো। ছিলো না কোনো অভিযোগ। প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো কেবল রাজার খাজনা আদায়ের হিসাব সংরক্ষণের বিষয়টি।গড়মিল ছিলো হিসাব সংরক্ষণের সময় ও সংখ্যা নিয়ে। সংখ্যা মিলতো কিন্তু সময় মিলতো না। একেক জনের হিসাব সংরক্ষিত হতো একেক সময় হিসেবে। সম্রাট আকবর রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে নির্দেশ দিলেন, এই সমস্যার সমাধান চাই আমি। সুষ্ঠু সমাধান। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি মোতাবেক ৯৬৩ হিজরির ২৮ রবিউস সানি তারিখে সম্রাট জালালুদ্দিন আকবর শাহ সিংহাসনে আসিন হন। সম্রাটের এই ক্ষমতা গ্রহণের স্মৃতিকে চিরভাস্কর করে রাখার উদ্দেশ্যে রাজজ্যোতিষী ফতেহ উল্লাহ সিরাজী ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিলকে পহেলা তারিখ নির্ধারণ করে খাজনা আদায় এবং এর যাবতীয় হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণের উপযোগী করে হিজরি ৯৬৩ সনের সাথে পরবর্তী সৌরমাস ও বছরের সংখ্যা যোগ করে নতুন একটি ফসলি সন প্রবর্তন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এই সন সৌরমাস হিসেবে গণনা হতো। পরর্বতীতে রাজজ্যোতিষী ফতেহ উল্লাহ প্রবর্তিত এই ফসলি সনই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের রুপান্তিত হয়। সুতরাং এই কথার মাঝে কোনো প্রকার কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বাংলা সনের সৃষ্টিতে হিজরি সনের অংশ গ্রহণগত ভূমিকাই মূল।

ইতিহাসও এই কথাই বলে, চলুন একটু দেখি উইকিপিডিয়াতে কি লেখা রয়েছে এই সম্পর্কে। ‘ভারতে ইসলামি শাসনামলে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরি পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরর চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। কারণ সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলি ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এজাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরি চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সম্রাট আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ওমর ফতুল্লাহ্‌ শিরাজির সুপারিশে পারস্যে প্রচলিত সৌর বর্ষপঞ্জীর অনুকরণে ৯৯২ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার হিজরি সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্চির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরি সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।‘ [সূত্র : bn.wikipedia.org/wiki/বাংলা_সন]

এছাড়া বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সৈয়দ আশরাফ আলী তার এক প্রবন্ধে এই বিষয়টিকে বিশদভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা সনের প্রবর্তন যিনি করেন তিনি কোন বাংলাভাষী বা বাংলাদেশি নন। তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত চেঙ্গিস খান ও মহাবীর তৈমুর লং-এর সুযোগ্য বংশধর বিশ্ববিখ্যাত মোঘল সম্রাট আকবর দি গ্রেট। সুদূর দিল্লীতে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত থেকেই তিনি এ দেশে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। ‘সন’ ও ‘তারিখ’ দুটিই আরবি শব্দ। প্রথমটির অর্থ হল ‘বর্ষ’ বা ‘বর্ষপঞ্জী’ এবং অন্যটির অর্থ ‘দিন’। ‘তারিখ’ বলতে আবার ইতিহাসও বোঝায়। ‘সাল’ হচ্ছে একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ হল বৎসর। বাংলা সনের সূত্রপাত হয় আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ ইসলামি সনের ওপর ভিত্তি করেই একজন মুসলমান বাদশাহ কর্তৃক বাংলা সনের প্রবর্তন। স্বভাবতই, যারা ইতিহাসকে স্বীকার করেন না বা যারা ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, তারাই মনে করেন যে, বাংলা সন অমুসলিমদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি বর্ষপঞ্জী। ‘ইংরেজি’ তথা ‘গ্রেগরিয়ান’ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, সর্বশ্রেষ্ঠ ও শেষ নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর মক্কা থেকে মদীনায় ঐতিহাসিক হিজরত অবলম্বন করে প্রবর্তিত, এই হিজরি সন শুরু হয় ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬৫ জুলাই তারিখ থেকে। বাংলা সনের মূলে হিজরি সন বিদ্যমান বিধায় হিজরি সালকেই সুকৌশলে বাংলা সনে রূপান্তরিত করা হয়।

মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে ৯৯৮ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। বাদশাহ আকবর ৯৬৩ হিজরিতে অথাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে (১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে) দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা চিরন্তরণীয়  করে রাখার জন্য ৯৬৩ হিজরি অবলম্বন করেই বাংলা সন চালু করা হয়। অর্থাৎ ১, ২, ৩-এভাবে হিসেব না করে মূল হিজরি সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ফলে জন্ম বছরেই বাংলা সন ৯৬৩ বৎসর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু করে। উল্লেখ্য, হিজরি সনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। মহানবি (সা.) স্বয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সন চালু করেননি। এটি প্রবর্তন করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে। হিজরি সনের ক্ষেত্রে যে রকম হিজরতের দিন ও মাস (১২ রবিউল আউয়াল) সুনির্দিষ্টভাবে অবলম্বন না করে শুধুমাত্র সালটিকেই (৬২২ খ্রিস্টাব্দে) সংরক্ষণ করা হয়, বাংলা সনের ক্ষেত্রেও তেমনি সম্রাট আকবরের রাজ্যভিষেকের দিন ও মাস (১৪ইং ফেব্রুয়ারি) অবলম্বন না করে শুধুমাত্র বৎসরটি (৯৬৩ হিজরি) সংরক্ষিত হয়। হিজরি সনের প্রথমদিন হল পহেলা মহররম। বাংলা সনে তা পরিবর্তন করে পহেলা বৈশাখ করা হয়। ৯৬৩ হিজরিতে মহররম মাস ও বৈশাখ মাস একই সঙ্গে আসে। ফলে, তদানীন্তন শকাব্দের প্রথম মাসটি গ্রহণ না করে হিজরি সনের প্রথম মাস  মহররমের অর্থাৎ বৈশাখ মাসকেই বাংলা সনের মাস হিসাবে পরিচিহ্নিত করা হয়। বাংলা সনের সৃষ্টি হয় ফসল তোলার সময় লক্ষ্য করে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে সৌর বৎসর অবলম্বনে এই নতুন সন গণনা শুরু হয়। তাই, প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ‘ফসলী সন’ নামে অভিহিত হতো। ‘বাংলা’র জন্য উদ্ভাবিত বলে এটি পরবর্তী পর্যায়ে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিহ্নিত হয়। উল্লেখ্য, একইভাবে ভারতের উড়িষ্যা ও মহারাষ্ট্র প্রদেশে যথাক্রমে ‘বিলায়তী’ ও ‘সুরসান’ নামে আঞ্চলিক সনের সৃষ্টি হয়। এসব সনেরও উৎস-সন হিসেবে হিজরি সনকেই গ্রহণ করা হয়।‘

হিজরি সন ও বাংলা সনের পার্থক্য : একটি কথা অবশ্য স্মরণে রাখতে হবে যে, বাংলা সন হিজরি সনভিত্তিক হলেও, ‘বাংলা সন’ ও ‘হিজরি সন’ আদৌ একই ধরনের নয়। ‘হিজরি সন’ হচ্ছে চান্দ্র সন এবং ‘বাংলা সন’ সৌর সন। ফলে, একই সময়কাল থেকে যাত্রা শুরু করলেও (৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই তারিখে) ‘হিজরি’ ও ‘বাংলা’ সন দুটির বয়সে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। দুটির মধ্যে পার্থক্য প্রায় এগারো দিনের। সৌর বৎসর হয় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ সেকেন্ড। চান্দ্র বৎসরের স্থিতি হলো ৬৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড-এর। চান্দ্র বৎসরের সময়কাল সৌর বৎসর অপেক্ষা প্রায় ১১ দিন কম হওয়ার ‘হিজরি সন’ ‘বাংলা সন’ অপেক্ষা ১১ দিন প্রতিবৎসর এগিয়ে যায়। ফলে প্রতি সাড়ে ৩২ বছর পর এক চান্দ্র বছর বৃদ্ধি পায়। এই হিসাব অনুযায়ী বর্তমান সময় পর্যন্ত হিজরি সন (চান্দ্রবছর) বাংলা সন (সৌরবছর) অপেক্ষা ১৩ বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। এভাবে সমতব-অসমতার মাঝে চলে আসছিলো দীর্ঘকাল। অনেক সমস্যা জর্জরিত এই বাংলা সনের সংস্কার-হাল ধরতে এগিয়ে আসেননি কেউ কিংবা সাহস করেননি। অনেককাল পরে এসে ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে ড. মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা সন সংস্কারের একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই কমিটি তাদের গবেষণা রিপোর্ট পেশ করেন। অতপর ১৯৮৮ সালে কার্যকর হয় বর্তমানে প্রচলিত বাংলা সন।

বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ পালন ও ইসলাম : বাংলা নববর্ষ, বাংলা সন তথা বঙ্গাব্দ বাংলাদেশি তথা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত (?) বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে-নগরে, গ্রামে-গঞ্জে বাংলা নববর্ষ আনন্দ-উল্লাসে উদযাপিত হয়। তবে, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা মুসলমানরা অনেকেই মনে করি যে, বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা উচিত নয়। এটি বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ। এর চেয়ে অধিকতর ভ্রান্ত কোন ধারণা আর হতে পারে না। বাংলা নববর্ষ সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে উদযাপিত হলে তার মধ্যে ইসলাম-বিরোধী কোন কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া বাংলা সনের জন্ম দিয়েছে মুসলমানরাই। মহানবি (সা.) এর মহান স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক হিজরত-ভিত্তিক হিজরি সন অবলম্বনেই এই বাংলা সন প্রণীত হয়েছে। আর, পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে যে, এই সনের জনক কোন অমুসলিম নন। এর জন্ম দিয়েছেন একজন মুসলমান বাদশা, একজন মুসলিম রাজজ্যোতিষী।

সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হলে তার মধ্যে ইসলামি শরিয়তের কোনো বাধা নাই ঠিক কিন্তু কথা হলো যারা আবিস্কারক, যাদের হাতে তৈরি হয়েছে বাংলা সন, এতোটা রব-সব এতোটা আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতায় তারা কখনো নববর্ষ পালন করেছেন বলে ইতিহাসে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তখনকারদিনে নববর্ষ ছিলো বছরান্তে পালনকৃত নিছক একটি আনন্দ-উৎসব মাত্র । যে উৎসবের গোটা অবয়ব জুড়ে পরিপূর্ণ ছিলো কৃষকের হাসি ও তৃপ্তি। বছর শেষে সব হিসাবের হালখাতা হত এবং মিষ্টি বিতরণীমূলক কিছু আনন্দ-আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হতো। তখনকার সেই সব উৎসব-আয়োজনের মাঝে ইসলামি শরিয়া লঙ্ঘনগত তেমন কোনো সমস্যা পরিলক্ষিত ছিলো না। ছিলো না কোনো ইসলামি বিধি-নিষেধর তীক্ষ্ণদৃষ্টি । এখন প্রশ্ন হলো- ১লা বৈশাখ বা নববর্ষকেন্দ্রিক বর্তমানে চলমান এই মহা উৎসব-আয়োজন, যাকে আমরা বাঙালি জাতির সংস্কৃতিগত অস্তিত্ব মনে করছি; এই উৎসব-আয়োজন এলো কোথা থেকে? এই উৎসব-আয়োজনের ইতিহাসগত যে কয়টি উল্লেখযোগ্য রেফারেন্স পাওয়া যায় তার মাঝে অন্যতম হলো– ১৯১৭ সালে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের যেন জয় হয়, সেই লক্ষ্যে এই অঞ্চলে ১লা বৈশাখের দিনে বিভিন্ন পূজা-অর্চনা এবং শোভা যাত্রার আয়োজন করানো হয়। সেই পূজা-অর্চনা এবং শোভা যাত্রার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো বৃটিশরা যেন যুদ্ধে জয় লাভ করে। চলুন দেখি এ সম্পর্কে উইকিপিডিয়াতে কি তথ্য প্রদান করা রয়েছে। ‘আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয় নি।‘ [সূত্র : bn.wikipedia.org/wiki/পহেলা_বৈশাখ]

এরপর ১৯৩৭-৩৮ সনের দিকে এই আয়োজন আরো কিছুটা সমৃদ্ধি লাভ করে এবং ১৯৬৩ সনে এসে ১লা বৈশাখকেন্দ্রিক আয়োজনগুলো পরিপূর্ণ একটি রূপ-অবয়ব লাভ করে। তখনকার ইতিহাসে ১লা বৈশাখ উপলক্ষে মেলা, শোভা যাত্রাসহ আরো কিছু নতুন নতুন আয়োজন-অনুষঙ্গ পরিলক্ষিত হয়। ১লা বৈশাখে ঘিরে ঘটা করে এই যে পান্তা ইলিশের একটি প্রথা, এই প্রথাটিও তখন ছিলো না বলেই দেখা যায়। এভাবে দিনে দিনে, বছরে বছরে কিছু কিছু করে নতুন নতুন ইস্যু, নতুন নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত হয় ১লা বৈশাখে। জন্ম রুপ হারিয়ে নতুন এক রূপ-কাঠামোতে আবিস্কৃত হয় নববর্ষকেন্দ্রিক উৎসব-আয়োজন। সর্বশেষ ১৯৮৯ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ম‌ঙ্গল শোভা যাত্রা নামে একটি নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত হয় ১লা বৈশাখের উৎসব-আয়োজনে। মূলত মঙ্গল শোভা যাত্রা হলো বিভিন্ন মুখোশ-প্রতীকের সম্মিলিত মিছিলের মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো। কেবল ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বাঙালী জাতিগত সংস্কৃতি এবং নববর্ষের মৌলিক সংস্কৃতির কোনোটির সাথেই নূন্যতম কোনো সম্পর্ক বা সম্পর্কগত যৌক্তিকতা নেই এই মঙ্ঘল শোভা যাত্রার। সব মিলিয়ে ১লা বৈশাখে নববর্ষ গ্রহণ করার উৎসব-অনুষ্ঠানিকতাটা বর্তমান সময়ে এমন একট রুপ পরিগ্রহণ করেছে যার ইসলামি শরয়ি বিশ্লেষণ ও ব্যাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অথচ এই উৎসব-আয়োজনের শুরুর ইতিহাসটা কিন্তু এমন ছিলো না। সমস্যা তখন ছিলো না যখন এই ১লা বৈশাখ কেবল হালখাতা গ্রহণ, নতুন বছর উপলক্ষে নতুন হিসাবের খাতা উন্মুক্তকরণ এবং মিষ্টিমুখকরণমূলক বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু কালের স্রোতে বয়ে বয়ে যখনি এই ১লা বৈশাখ পালনে পান্তা ইলিশ খাওয়াকে প্রথা হিসেবে গ্রহন করা হয়েছে, বিভিন্ন মুখোশ-মুর্তির সমন্নয়ে গঠিত মঙ্গল শোভা যাত্রাকে জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহন করা হয়েছে এবং এই ভাবা শুরু হয়েছে যে, পহলো বৈশাখ পালন না করলেই নয়; তখন এই বিষয়টিতে ইসলামি শরয়ি ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আকার ধারণ করেছে।

একটি কথা বলা প্রয়োজন, বাংলা সন যেহেতু মুসলিম ঐতিহ্যের হিজরি সনের উপর ভিক্তি করে উদ্ভাবিত হয়েছে, সেহেতু প্রকৃত মুসলমানদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে নিজের সংস্কৃতিকে সুস্থ ধারায় টিকিয়ে রাখার জন্য। কেননা সংস্কৃতি হলো নদীর স্রোতের মত । এক দিকে স্থবির হয়ে গেলে কিংবা গতিপথে বাঁধ দিলে আরেক দিকে প্রবাহিত হবে। হিজরি সনের জন্য কারও মনে যদি এতটুকু অনুভূতি থাকে, বাংলা সনের জন্যও তার মনে সমান বা তার চেয়ে বেশী অনুভূতি থাকা বিশেষভাবে প্রয়োজন। আর বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের জন্য বাংলা সন তো রীতি মতো গর্বের বিষয় যে, বাংলা সনের নামে তারা যে সন পেয়েছে তা তাদের শুধু জাতীয় সনই নয় হিজরি সনেরই নামান্তর । এক দিকে বাংলা সন যেমন জাতীয় দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ঠিক ধর্মীয় দিক থেকেও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নববর্ষের অনুষ্ঠান হোক কিংবা হোক অন্য যে কোনো অনুষ্ঠান বিজাতীয় কৃষ্টি-কালচারের অনুসরণে ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির বিসর্জন দিয়ে কোনো প্রকারের কোনো অনুষ্ঠান-আয়োজনের অনুমতিই ইসলাম প্রদান করেনি। বিভিন্ন উৎসব-আয়োজনের ক্ষেত্রে ইসলাম প্রদত্ত নিজস্ব নীতিমালা ও রূপরেখা রয়েছে। ইসলাম প্রদত্ত সেই নীতি-আইন ও রূপরেখায় সীমা অতিক্রমকারী যেকোনো প্রকারের যেকোনো আয়োজন-অনুষ্ঠানই ইসলামে নিষিদ্ধ। হোক সেটা নববর্ষের আয়োজন কিংবা সেটা হোক কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান।

ইসলামের আলোকে বর্তমান সময়ে আয়োজিত পহেলা বৈশাখ বর্জণীয় : মোটা মোটা কিছু দাগে বর্তমান সময়ে আয়োজিত ১লা বৈশাখকেন্দ্রিক এই সব উৎসব-আয়োজনগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ-বর্জণীয়-হারাম এবং এতে অংশ গ্রহণ করাকেও অনৈসলামিক কাজে অংশ গ্রহণ করার সমান বলেই বিবেচনা করা হয়। বর্তমান সময়ে আয়োজিত ১লা বৈশাখকেন্দ্রিক এই সব উৎসব-আয়োজনগুলো। ইসলাম যে সব কারণে বর্তমান সময়ে আয়োজিত ১লা বৈশাখকেন্দ্রিক উৎসব-আয়োজনগুলোকে বর্জণীয় মনে করে তা উল্লেখ করা হলো-

এক. বর্তমানকালে মঙ্গল শোভা যাত্রা বা এই রাকম যে সব আয়োজন নববর্ষ উপলক্ষে করা হয়, অধিকাংশই ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয় হিসেবে গণ্য।আর পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। সুতরাং কেবল নববর্ষকেন্দ্রিক উৎসব-আয়োজনের ক্ষেত্রে নয় একজন মুসলমানের উচিত জীবনের সব ক্ষেত্রে অপচয় থেকে বিরত থাকা। অপচয়ের মতো অপব্যয়কে নিষিদ্ধ করে কোরান মজিদে বর্ণিত হয়েছে- ‘আর কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ”। [১৭ : ২৬-২৭]

দুই. নতুন দিন বা নতুন বছরকে স্বাগত জানানো। নতুন দিন বা নতুন বছরকে স্বাগত জানানো অর্থ হচ্ছে সূর্যকে স্বাগত জানানো। এই কথার প্রমাণস্বরুপ বাংলা উইকিপিডিয়ার একটি বর্ণনা তুলে ধরা হলো- ‘বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহবান জানান। সূত্র :[bn.wikipedia.org/wiki/পহেলা_বৈশাখ]

ইসলামে সূর্যকে স্বাগত জানানো, সূর্যর আহবান বিষয়টি প্রকারান্তরে সূর্যপূজারই শামিল এবং এই বিষয়টি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। কেবল সূর্য কেন কোনো সৃষ্টিকেই কোনো প্রকার কোনো ক্ষমতার উৎস জ্ঞান করাই ইসলাম পরিপন্থী। সুতরাং সূর্যকে স্বাগত জানানোর সন্দিহানগত প্রমাণ্যতা থাকায় ইসলামি দৃষ্টিতে এমন মানসিকতা লালনে নববর্ষ পালন করা নিষিদ্ধ।

তিন. নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশাগত বিচরণ ও নারীকে জড়িয়ে নানা রকম অশ্লীলতা সৃষ্টি হয় এই সব উৎসব-আয়োজনগুলোতে এবং চরমভাবে লঙ্ঘিত হয় ইসলামের পর্দার বিধান। অথচ ইসলাম পর্দার বিধানকে ফরজ ঘোষণা করেছে। এছাড়া ১লা বৈশাখ উপলক্ষে বর্তমানে আয়োজিত নানা আয়োজনে ইসলামে বর্ণিত নানা প্রকার জিনার প্রবলতা লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশাগত বিচরণ, নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতার প্রবণতা এবং ইসলামের পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হওয়ায় ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই সব আয়োজন পুরোপুরিভাবেই নিষিদ্ধ।

সহিহ হাদিসের আলোকে একথা স্বীকৃত যে, রাসুল [সা.] বলেছেন, তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম অর্থ্যাত এই তিন শ্রেণীর মানুষ কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।  প্রথম শ্রেণী হলো- যারা কোনো প্রকার নেশাদার দ্রব্য পান বা গ্রহণ করে। মদখোর, বিড়িখোর, গাজাখোর, ফেনসিডিলখোর, ইয়ারাখোর, বাবাখোর, হিরোইনখোর, আফিমখোর, আলাখোর, জদ্দাখোর- যে কোনো প্রকার নেশাই গ্রহণ করেন না কেন; এই সব খেলে দেহ অপবিত্র হয়ে যাবে আর এই অপবিত্র দেহ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং এইসব নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা আজকেই ছাড়া উচিত, আজ এবং এখনই তাওবা করা উচিতি এই পাপ কাজ থেকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।  দ্বিতীয় শ্রেণী হলো- যে বা যারা পিতা-মাতার অবাদ্ধ, এই শ্রেণীভূক্ত মানুষরাও জান্নাতে যাবে না। জান্নাত তাদের উপর হারাম। মৃত্যু পর্যন্ত পিতা-মাতার দেখভাল করতেই হবে। পিতা-মাতাকে কোনো কারণেই ত্যাগ করা যাবেনা। পিতা-মাতার খেদমত করতেই হবে। রাসুল [সা.] পরিস্কারভাবে বলেছেন, পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান না হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।  তৃতীয় শ্রেণী হলো- দাইউস। ঐ দাইউস ব্যক্তি যে তার পরিবারে পর্দা প্রথা চালু রাখেনি। পরিবারের সদ্যসের মাঝে বেপর্দা ছিলো, বেহায়াপনা ছিলো কিন্তু সে তা বাধা প্রদান করেনি। পরিবারের কর্তা হিসেবে বেপর্দা-বেহায়াপনা বন্ধ না করার জন্য এই শাস্তি পাবে সে। আপনি যত বড় ইবাদতকারীই হোন না কেন, মক্কার মাটিতে যতবারই হজ পালনে ঘুরে আসুন না কেন, পাঞ্জাবী আপনার যতই সুন্নতি-শক্তিশালী ও সুন্দর হোক না কেন- পরিবারে যদি পর্দার বিধান চালু রাখার ব্যপারে আপনার অবদান না থাকে রাসুল [সা.] –এর হাদিস অনুযায়ী আপনি জাহান্নামি। জান্নাত এই শ্রেণীর মানুষের জন্য হারাম। [মুসনাদে আহমদ : ২/৬৯]

চার. উন্মুক্তভাবে গান-বাজনার ছড়াছড়ি। গান-বাদ্যর ব্যাপারে রাসুল [সা.] আমাদেরকে স্পষ্ট নীতিমালা দিয়ে বলেছেন, আমার উম্মতের মাঝে এমন এক দল আসবে যারা জিনাকে হালাল করবে, পুরুষদের জন্য রেশমি কাপড়কে হালাল করবে, মদকে হালাল করবে এবং গান-বাজনাকে হালাল মনে করবে। অথচ গান-বাজনা এবং বাদ্য-যন্ত্রের ব্যবহার ইসলামে নিষিদ্ধ। গান-গায়িকা এবং এর ব্যবসা ও চর্চাকে হারাম আখ্যায়িত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন- তোমরা গায়িকা (দাসী) ক্রয়-বিক্রয় কর না এবং তাদেরকে গান শিক্ষা দিও না। আর এসবের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই। জেনে রেখ, এর প্রাপ্ত মূল্য হারাম।[জামে তিরমিযি, হাদিস : ১২৮২; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৬৮]

বর্তমানে গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে যাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, এর সকল উপার্জন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমিনে ধ্বসিয়ে দিবেন।[সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০২০; সহিহ ইবনে হিব্বান হাদিস : ৬৭৫৮]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, পানি যেমন (ভূমিতে) তৃণলতা উৎপন্ন করে তেমনি গান মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।[ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৩; তাফসীরে কুরতুবী ১৪/৫২]

পাচ. তথাকথিত বাঙ্গালী চেতনার নামে প্রচারিত পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতির আগাগোড়া হিন্দু ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের নকল বা ফটোকপি। গণেশ পূজার ‘মঙ্গল যাত্রা’ থেকে নেওয়া মঙ্গল শোভা যাত্রা, ‘চৈত্র সংক্রান্তি পূজা’ থেকে নেওয়া চৈত্রসংক্রান্তি, হিন্দু-বৌদ্ধদের ‘উল্কি পূজা’ থেকে নেওয়া উল্কি উৎসব, বিভিন্ন হিংস্র-অহিংস্র জীব-জন্তু পূজা থেকে নেওয়া রাক্ষস-খোক্কসের মুখোশ ও পশু-পাখীর প্রতিমা নিয়ে উৎসব, হিন্দুদের ‘আশ্বিনে রান্না কার্তিকে খাওয়া’ প্রথার আদলে চৈত্রের শেষদিনে রান্না করা অন্নে জল ঢেলে পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা খাওয়ার প্রথা এবং পুজোর অপরিহার্য আইটেম ঢোল-তবলা, কুলা ও হিন্দু রমণীর লাল সিঁদুরের অবিকল লাল টিপ-পুজোর লেবাস শাদা শাড়ী ইত্যাদি হল পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রধান উপাদান!! অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- যে ব্যক্তি কোন ধর্মের মানুষের (ধর্মীয় আচারের) অনুকরণ বা সাদৃশ্য গ্রহণ করবে,  সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। [সুনানে আবু দাঊদ]

ছয়. উল্কি বা ট্যাটু অঙ্কন করা। কেবল পহেলা বৈশাখে নয় বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই উল্কি বা ট্যাটু অঙ্কনের প্রবল প্রচলণ পরিলক্ষিত । উল্কি অঙ্কনের ক্ষেত্রেও বিপরীত লিঙ্গের হাত ব্যবহার করা হয়। যা প্রকাশ্য অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা এবং ইসলামি পর্দান বিধান লঙ্ঘিত হওয়ার কারণ । নাসায়ির বর্ণনা মতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “উল্কি অঙ্কনকারিনী ও যার গায়ে অঙ্কন করা হয়- উভয়ের প্রতি আল্লাহর লানত বর্ষণ হয়।” তাছাড়া এতে আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন করা হয়, যা কোরআনের নির্দেশনা মতে হারাম। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতেও উল্কি অঙ্কন ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আর ইচ্ছাকৃত স্বাস্থ্য হানী করাও ইসলামে নিষিদ্ধ।রাসুলুল্লাহ (সা.) রক্ত বিক্রির বিনিময়ে মূল্য, কুকুর বিক্রয়লব্ধ মূল্য এবং ব্যভিচারের বিনিময় গ্রহণ হতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, উল্কি অঙ্কনকারী, যে নারী উল্কি অঙ্কন করায় এবং যে ছবি উঠায় তাদের সকলকে লানত করেছেন।” (বুখারি শরিফ)

ইসলামের দৃষ্টিতে উৎসবের রূপরেখা : সুরা ইউনুসের ৫৮ আয়াত আল্লাহ মহন ইরশাদ করেছেন, বল, ‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়’। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম। একজন মুসলমানের জীবনে সবচেয়ে বড় খুশি এবং আনন্দের বিসয় হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ। এতো এতো নেয়ামত, এতো সব অনুগ্রহ দিয়ে বাচিয়ে রেখেছেন আল্লাহ মহন- কই সে উপলক্ষে কখনো তো কাউকে কোনো উৎসবের আয়োজন করতে দেখা গেল না?একজন মুমিন মুসলমানের মুল আনন্দ হচ্ছে আল্লাহর রহমত এবং তার অনুগ্রহ-নেয়ামত। এই নেয়ামত ও আল্লাহর রহমত-অনুগ্রহের শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে সুন্তুষ্ঠ থাকাই মুসলিমদের সবচেয়ে বড় উৎসব হওয়া উচিত।

অনেকে উপলব্ধি না করলেও, উৎসব সাধারণত জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। ইসলাম ধর্মে নবি মুহাম্মাদ (সা.) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন এবং বাতলে দিয়েছেন বিভিন্ন নীতি-নিয়ম-পদ্ধতি, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।” [বুখারি, মুসলিম]

বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম ইবনে তাইমিয়া ইসলামের এই উৎসব নীতিমালা সম্পর্কে বলেন, “উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ, যা সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ [আল-মায়িদাহ :৪৮] তিনি আরো ইরশাদ করেন, ‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি ধর্মীয় উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ [আল-হাজ্জ্ব :৬৭]

ইসলাম বিভিন্ন উৎসব-অয়োজন ও আচার-অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রদান করেছে এবং বাতলে দিয়েছে নানাবিধ নীতিমালা। সেজন্য তাদের [অমুসলিমদের] উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই- এমনটা কিন্তু নয়। অমুসলিমদের কৃষ্টি-কালচার, ইসলাম বিরোধী পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করার অর্থ কুফরের সাথে একমত পোষণ করা। আর এসবের একাংশের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের শাখাবিশেষের সাথে একমত হওয়া।

উৎসব-অনুষ্ঠানাদি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার দ্বারা ধর্মগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। উৎসব অনুষ্ঠান যে প্রতিটি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, এর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.) ইঙ্গিত করেছেন, যখন তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’ [বুখারি, মুসলিম] এছাড়া আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন [মদীনায়] আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি (সা.) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন, ইয়াওমুদ্দুহা ও ইয়াওমুল ফিতর ।’ [সূনান আবু দাউদ] এ হাদিস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটো দিনকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরণে যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।

ইসলামের এই যে উৎসব – ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয় এবং এই বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিৎ, যা হচ্ছে- অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকান্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকতাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত, যেমনটি কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন, “আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি।” [সূরা যারিয়াত:৫৬]

সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা ।

সুতরাং চাই সে উৎসব হোক নববর্ষকে স্বাগত জানানো কিংবা হোক কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান কিংবা ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা- প্রত্যেক মুসলমানের উৎসব পালনের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালার প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। আর সেটা হলো- আম যা কিছুই করি না করে সব হবে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করার দিন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এবং শরীয়তসম্মত বৈধ আনন্দ উপভোগের দিন– তবেই হবে এই উৎসব মুসলিমদের ঈমানের চেতনার সাথে একই সূত্রে গাঁথা।

আজকের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে নববর্ষ উৎসবের কোনো মিলই নেই : সৈয়দ আবুল মকসুদ একজন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত। ১৪১৩ সালে একটি দৈনিক পত্রিকার ১ বৈশাখের ক্রোড়পত্রে তার ছাপা হওয়া একটি লেখার অংশ উদ্ধৃত করছি। ‘আমি আমার নিজের শৈশব ও কৈশোরের পহেলা বৈশাখকে যেভাবে দেখেছি, আজকের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে সেই নববর্ষ উৎসবের কোনো মিলই নেই। তখনকার নববর্ষের উৎসবের মধ্যে ছিল অকৃত্রিম প্রাণের আমেজ, তাতে ন্যূনতম কৃত্রিমতা ছিল না, আয়োজনে বিন্দুমাত্র মেকি বা লোক দেখানো বিষয় ছিল না। যা করা হত, তা হতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে, প্রাণের আনন্দে ও অকৃত্রিম জাতীয়তাবাদী আবেগে। আজ আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? পহেলা বৈশাখের সকালে ঘটা করে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে খুব বিত্তবান ঘরের মানুষ মাটির শানকিতে পান্তাভাত, খাট্টা ডাল, ইলিশ মাছের ঝোল, মুড়িঘণ্ট, খেজুর গুড়ের ক্ষীর হাপুস-হুপুস করে খাচ্ছে। এই যে রেওয়াজ শুরু হয়েছে, এটি মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর প্রবর্তিত আয়োজন। এ জাতীয় জিনিস পহেলা বৈশাখে নববর্ষের চিরকালের চেতনা বিরোধী। কারণ এ সমাজের পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ খুবই দরিদ্র, তারা ক্ষুধার জ্বালায় পান্তাভাত, পঁচাডাল ও অখাদ্য জাতীয় জিনিস যা পায় প্রতিদিন তা-ই খায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পান্তাভাত আর ইলিশের তরকারি, মুড়িঘণ্ট যারা খায়, তারা বস্ত্তত এক ধরনের সাংস্কৃতিক অপরাধ করে। এসব আচরণের মাধ্যমে তারা আসলে দেশের অগণিত দরিদ্র মানুষকে পরিহাস করে।’

পহেলা বৈশাখের বর্তমান রেওয়াজ ও মাতামাতি সম্পর্কে এ কথাগুলো কোনো মাওলানা সাহেবের বলা নয়। কথাগুলো যিনি লিখেছেন, তিনি কথিত বাঙ্গালি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম মনে করেন। তারপরও সত্য স্বীকার করে তিনি কথাগুলো লিখতে বাধ্য হয়েছেন।

বর্তমান বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত নানাবিধ আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে চলুন শুনি কি বলছেন বাংলাদেশের আরেকজন গুণী কবি, সংস্কৃতিবিদ। কবি আবদুল হাই শিকদার তার এক বক্তৃতায় বলেন, আজ যে পহেলা বৈশাখ নিয়ে এতো সব আয়োজন, এতো উৎসব করা হচ্ছে কই বাংলা সনের যিনি আবিস্কারক-জনক সেই ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে তো কেউ স্মরণ করেন না।  তার এই আবিস্কারের ধন্যবাদ প্রদানমূলক কোনো সভার তো আয়োজন করা হয় না। যেই মানুষটি না হলে বাংলা সনের জন্ম হতো না তার নাম কেউ নেয় না কিন্তু বাংলা সনের দরদে সারাদিন উৎসবে কাটে। উৎসব হয়, উৎসব হোক আমি উৎসবের পক্ষে- উৎসবের মাঝে দোষের কিছু নেই কিন্তু দোষ হয় তখন যখন আমার শালীনতা, আমার সুস্থতা, আমার দেশপ্রেম এবং আমার সার্বভোমত্বকে আঘাত করে এই সব উৎসব-আয়োজন। গণেশ হিন্দুদের দেবতা। একটি জাতির দেবতা হিসেবে গণেশের প্রতি আমার সম্মান রয়েছে, আমি সম্মান করি হিন্দু ভাই-বোনদেরকেও কিন্তু আমি একজন মুসলামান হয়ে পহেলা বৈশাখে আমার কাধে গণেশ নিয়ে কীভাবে দৌড়াই- এটা কি আমাকে মানায়? এইটা কি শোভন হয়? বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল, ভারতের জাতীয় পাখি ময়ূর। পাখি হিসেবে ময়ূর নিস্পাপ। ময়ূর আমরাও প্রিয় একটি পাখি কিন্তু  কথা হলো- পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভা যাত্রায় ময়ূর পাখির মিশিল হয় আমার দোয়েল গেল কই? পহেলা বৈশাখে আমার কাধে গণেশ উঠলো কিন্তু আমার ফতেহ উল্লাহ সিরাজী কোথায় গেল, কোথায় গেল আমাদের মীর মোশাররফ হোসেন, ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ?

নতুন বছর, নববর্ষকেন্দ্রিক কিছু ভুল ধারণা : আমরা অনেকে এমন ধারণা করি, নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি– এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোনো বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরি নববর্ষ পালনেরও কোন প্রকার নির্দেশনা প্রদান করা হয়নি। না কোরআনে এর কোন নির্দেশ এসেছে, না হাদিসে এর প্রতি কোন উৎসাহ দেয়া হয়েছে, না সাহাবীগণ এরূপ কোন উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পহেলা মু্হাররামকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবিজীর (সা.) মৃত্যুর বহু পরে, উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা.) আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যহীন, এর সাথে জীবনে কল্যাণ-অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, আর সেক্ষেত্রে ইংরেজি বা অন্য কোন নববর্ষের কিই বা তাৎপর্য থাকতে পারে ইসলামে?

কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। যদি সে মনে করে যে আল্লাহ এই উপলক্ষের দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে গেল। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন, “নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়িদাহ :৭২]

পহেলা বৈশাখের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলা হয়, এটি বাঙালী জাতির সর্বজনীন উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রাণের উৎসব। কোনো কোনো সময় আরো স্পষ্ট করে বলা হয়, মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব ঈদ, হিন্দুর ধর্মীয় উৎসব পুজা, আর হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল বাঙালির  উৎসব পহেলা বৈশাখ। এ জাতীয় বক্তব্যে সেক্যুলারিজম ও ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা বলুন জাতিসত্তার পরিচয়ে ধর্মকে বর্জন করার চিন্তাই কার্যকর। এ যে একটি কুফরী চিন্তা তা তো বলাইবাহুল্য। মুসলমানের ধর্ম ইসলাম, মুসলমানের আদর্শ ইসলাম এবং মুসলমানের প্রকৃত পরিচয় ইসলাম। বংশ, গোত্র, ভাষা ও ভূখন্ড-এগুলোও আমাদের পরিচয়, তবে আদর্শিক পরিচয় নয়, প্রাকৃতিক পরিচয়। আমাদের আদর্শিক পরিচয় ইসলাম। সুতরাং ইসলামইআমাদের চিন্তা ও কর্মের নিয়ন্ত্রক। তো পহেলা বৈশাখের উৎসব-অনুষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষতার তত্ত্ব দাখিল করে এর একটি দর্শনগত ভিত্তি দাঁড় করানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? এটা কি বাঙালী মুসলিম সমাজের ইসলাম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতার বিকাশ-প্রচেষ্টা?

পহেলা বৈশাখের তাৎপর্য বর্ণনা করে আরো বলা হয়, এ সকল জাতি বিনাশী চিন্তাভাবনাকে কুরআনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। মুসলমানদের বলা হয়েছে-

يا ايها الذين آمنوا ادخلوا فى السلم كافة. ولا تتبعوا خطوات الشيطان، انه لكم عدوم مبين.

হে ঈমানদারগণ তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হও। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।-সূরা বাকারা (২) : ২০৮

সুতরাং ধর্মপরিচয়ে মুসলিম আর পর্ব-উৎসবে অন্যকিছু এমনটির সুযোগ ইসলামে নেই।  পহেলা বৈশাখের তাৎপর্য বর্ণনা করে আরো বলা হয়, ‘এ হচ্ছে শেকড় সন্ধান, শেকড়ের দিকে ফিরে যাওয়া।’ কিন্তু কী অর্থ শেকড়ের? কোন অতীতকে নির্দেশ করে এই ‘শেকড়’ শব্দটি? এই প্রশ্নের জবাব পেতে খুব বেশি দূর যেতে হবে না। পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা গুলোতে যেসব মূর্তি, মুখোশ বহন করা হয় তার সূত্র সন্ধান করলে শেকড় সন্ধানের তাৎপর্যও বের হয়ে আসবে।

যাদের অন্তরে ঈমানের কণিকা আছে তারা স্মরণ করুন আল্লাহর রাসূলের বাণী-

ثلاث من كن فيه وجد بهن حلاوة الإيمان، من كان الله ورسوله أحب إليه مما سواهما، ومن أحب عبدا لا يحبه إلا لله، ومن يكره أن يعود في الكفر بعد أن أنقذه الله منه كما يكره أن يلقى في النار.

তিনটি গুণ যার আছে সে ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করবে : যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সবার চেয়ে প্রিয়, যে কোনো বান্দাকে ভালবাসলে আল্লাহর জন্যই ভালবাসে এবং আল্লাহর রহমতে কুফর থেকে মুক্তিলাভের পর পুনরায় সে দিকে প্রত্যাবর্তন অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো ভয়াবহ মনে করে।[সহীহ বুখারী, মুসলিম]

যে মুসলিমের হৃদয় ও মস্তিস্ক এই শ্বাশত সত্যের আলোয় আলোকিত তার সামনে কোনো মিথ্যা, কোনো কপটতা মুখ লুকিয়ে থাকতে পারবে না। ‘সর্বজনীন উৎসব’ ‘বাঙালী জাতির নিজস্বতা’ ‘সংস্কৃতির শেকড় সন্ধান’ ইত্যাদি আবেগ উদ্দীপক শব্দসম্ভারের প্রকৃত পরিচয় তার কাছে গোপন থাকবে না। তিনি জানবেন, কুরআনের ভাষায় এগুলোকে বলে-‘তাযঈনুস শয়তান’ বা শয়তানের মায়াজাল বিস্তার। এই মিথ্যার মরিচিকা থেকে রক্ষার জন্যই যুগে যুগে নবি-রাসূল প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وعادا وثمود وقد تبين لكم من مسكنهم وزين لهم الشيطان اعمالهم فصدهم عن السبيل وكانوا مستبصرين.

এবং আদ ও সামুদকে (ধ্বংস করেছিলাম)। তাদের বাড়িঘরই তোমাদের জন্য এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। শয়তান তাদেরকে সুপথ থেকে নিবৃত্ত করেছিল। অথচ তারা ছিল বিচক্ষণ।-সূরা আনকাবূত (২৯) : ৩৮

শেষ বাক্যটি-‘অথচ তারা ছিল বিচক্ষণ’ বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। বর্তমান সময়ের জ্ঞানগর্বী সম্প্রদায়ের জন্য এতে আছে সুস্পষ্ট বার্তা।

পহেলা বৈশাখের উদযাপন-পদ্ধতিতে আরো যেসব অনাচার রয়েছে তার মধ্যে মারাত্মক কয়েকটি হচ্ছে, মুসলিমসমাজে শিরক ও পৌত্তলিকতার বলদর্পী মহড়া, বেশ-ভূষা এবং আচরণেবিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ এবং গান-বাজনা; বেপর্দা-বেহায়াপনা;অপচয়-অপব্যয় ইত্যাদি হারাম ও মুনকার কাজ। এরপরও কি ঈমানদার মুসলিমের কর্তব্য হবে না, এই উৎসব থেকে নিবৃত্ত হওয়া?

 বাঙালী জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত আমাদের রয়েছে নিজস্ব বাংলা সন-বর্ষপঞ্জি : হিজরি সন থেকে বাংলা সন আবিস্কার এবং অনেক পরে এসে বাংলাসনকে পূর্ণতম একটি রুপ প্রদানকেন্দ্রিক সা ক্ষেত্রগুলোতেই মুসলমানদের অবদানের বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট এবং স্বীকৃত। ইতিহাসের সোনালী অধ্যায় আলোকিত করে রয়েছে যে সা ইতিহাস। বাঙালী জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত নিজস্ব বাংলা সন রয়েছে আমাদের, রয়েছে নিজস্ব বাংলা বর্ষপঞ্জি। মুসলিম জাতি হিসেবে গর্বিত আমরা এই সনের অবিস্কারক এবং সংস্কারক আমাদের মুসলিম বিজ্ঞানীরা। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে বসবাস করা, বাংলায় কথা বলা অনেক বাঙালী এমনও রয়েছে যারা দাবি করেন বাংলা সন ও বাংলা বর্ষপজ্ঞি হিন্দুদের অবিস্কার।আরো আফসোস হয়, যখন দেখি এদেশীয় কিছু আলেমসমাজও এই মতের সাথে মত মিলিয়ে বলেন, বাংলা সন তো বিজাতীয় আবিস্কার এবং এরাই আবার নানাভাবে বাধা প্রদান করেন বাংলা সনকেন্দ্রিক নানাবিধ উৎসব-আয়োজনে। বাংলা সন ও বাংলা বর্ষপজ্ঞিকে হিন্দু তথা বিজাতীয় সংস্কৃতিপ্রসূত বলার নেপথ্যে কারণ রয়েছে অনেক, রয়েছে কিছুটা গোড়ামি-অজ্ঞতা এবং হিনমন্যতাযুক্ত মানসিকতাও। এমন ধ্যান-ধারণা পোষনকারীদের উদ্দেশ্যে একটি বক্তব্য আমার- পালক বা নকল মাতা সেজে  সন্তানের লালন-পালনের অধিকার গ্রহণ করার দ্বারা যেমন প্রকৃত মা হওয়া যায় না, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাময়িক দেখভাল করা এবং যত সামান্য সংস্কার-যোগালী প্রদান করেই একটি সন, একটি পজ্ঞিকার স্রষ্ঠা হওয়া যায় কি? ###

Top