মজুদদারি সম্পর্কে ইসলামের বিধান

খাদ্যদ্রব্য মজুদ করা অথবা তা বাজার থেকে তুলে নিয়ে যে কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করা হয় তাই মজুদদারী। মূলত একদল মধ্যস্বত্তভোগী অবৈধভাবে মুনাফা অর্জনের আশায় এ কাজ করে থাকে। দাম বাড়ানো এবং অধিক মুনাফার প্রত্যাশা করাকে ইসলাম অবৈধ করেছে। হানাফি মাজহাব মতে তা মাকরূহে তাহরিমি (হারাম সমতুল্য) হলেও অন্যান্য মাজহাব মতে এটি হারাম। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অনেক মানুষ দুর্গতির মধ্যে পতিত হয়। এ ধরনের কাজ মানুষের কষ্টকে বাড়িয়ে দেয়।

মজুদদারি বিষয়ে খোলাফায়ে রাশেদীনের ভূমিকা : খোলাফায়ে রাশেদীনও মজুদদারির বিষয়ে কঠোর ছিলেন। খলিফা উমর (রা). ব্যবসায়ীদের পণ্য মজুদকরণ সম্পর্কে ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের বাজারে কেউ যেন পণ্য মজুদ করে না রাখে। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে তারা যেন বহিরাগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সমস্ত খাদ্যশস্য কিনে তা মজুদ করে না রাখে। যে ব্যক্তি শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট সহ্য করে আমাদের দেশে খাদ্যশস্য নিয়ে আসে সে উমরের মেহমান। অতএব সে তার আমদানীর খাদ্যশস্য যে পরিমাণে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারবে, আর যে পরিমাণে ইচ্ছা রেখে দিতে পারবে”।“ইমাম মালিক, আল-মুয়াত্তা, আল-কাহেরা: দারু ইবনিল হায়সাম, ২০০৫, পৃ. ২৭৫, হাদীস নং-১৩২৯”। উসমান (রা). তাঁর খিলাফত কালে পণ্য মজুদ নিষিদ্ধ করেছিলেন। আলী (রা). মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর খিলাফাতকালে মজুদকৃত খাদ্যদ্রব্য আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। যেহেতু মজুদদারি জনসাধারণের স্বার্থের পরিপন্থী তাই ইসলামে তা নিষিদ্ধ। মজুদদারির কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। কেননা এমন অনেক প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী রয়েছে যেগুলো পরিহার করে চলা যায় না। তাই ইসলাম নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সুলভ মূল্যে বিক্রয় করার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। আর যে কোন ধরনের মজুদদারিকে জঘন্য ধরনের অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রসূলুল্লাহ (স). থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদীনসহ পরবর্তী সাহাবা কিরামগণ মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

ইসলামে মজুদদারির শাস্তির বিধান: তাই ইসলাম এ প্রকার কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যশস্য মজুদ রাখে, আল্লাহপাক তার ওপর দরিদ্রতা চাপিয়ে দেন।’ (আবু দাউদ : ৫৫)

ব্যবসায়িক পণ্য বিক্রি না করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বর্ধিত মুনাফা আদায়ের প্রচেষ্টা একটি সামাজিক অপরাধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে খাদ্যশস্য গুদামজাত করে সে অভিশপ্ত।’ (ইবনে মাজাহ) তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিনের খাবার মজুদ রাখে, সে আল্লাহর জিম্মা থেকে বেরিয়ে যায়।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ২০৩৯৬) অন্য হাদিসে এসেছে : ‘যে ব্যক্তি খাদ্যশস্য গুদামজাত করে সে অপরাধী।’ (আল মু’জামুল কাবির : ১০৮৬)

তবে গুদামজাত পণ্য যদি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু না হয় কিংবা মানুষ এর মুখাপেক্ষী না হয় অথবা এসব পণ্য চাহিদার অতিরিক্ত হয় বা গুদামজাতকারী বর্ধিত মুনাফা অর্জনের অভিলাষী না হয়, তাহলে এসব অবস্থায় পণ্য মজুদ রাখা অবৈধ নয়।

প্রেক্ষিত বাংলাদেশ: সাম্রতিক সময়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ গুদামজাত করার মাধ্যমে এক ধরণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছৈ। ফলে ২০/৩০টাকার পেঁয়াজ বর্তমান বাজারে ২০০/২৫০টাকায় কিনতে হচ্ছে প্রতি কেজি। যদিও বাহ্যিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে এটা ভারত থেকে আমদানী করতে না পারায় পেয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এধরণের মজুদদারী ইসলামে বৈধতা দেয়নি। সুতরাং যারা এ হীন কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে, দুনিয়ায় না হলেও আল্লাহর আদালতে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাক্বওয়ার জিন্দেগী গড়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Top