মতভিন্নতার মাঝেও সহাবস্থানে আমাদের করণীয়

কুরআনুল কারীম ও হাদিস শরিফে উম্মাহর পারস্পরিক ঐক্য ধরে রাখার জন্য জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে : وَاعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ اللّهِ جَمِيعًا وَلاَ تَفَرَّقُواْ ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)। রাসূলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেন, المسلمون كرجل واحد، إن اشتكى عينه اشتكى كله، وإن اشتكى رأسه اشتكى كله- অর্থাৎ মুসলিমেরা সকলে মিলে একটি দেহের মতো, যার চোখে ব্যথা হলে গোটা দেহের কষ্ট হয়, মাথায় ব্যথা হলেও গোটা দেহের কষ্ট হয়।  সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৫৮৬/৬৭।  অদৃশ্য এ শক্তিই মুসলমানদের অবিস্মরণীয় বিজয়ের গোপন রহস্য।

ইতিহাসের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোনো জাতি একটি যুদ্ধেও সফলকাম হতে পারেনি; যতক্ষণ না তাদের ঐক্য ও সংহতির সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপিত হয়েছে।  কিন্তু যখন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজস্ব মত-পথ ও চিন্তাধারায় খেয়ালি বিচরণে গা ভাসিয়ে দেবে তখন নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট মতপার্থক্য শত্রুতায় রূপ নেবে; তখন সফলতার আর কোনো প্রচেষ্টাই কাজে আসবে না। বর্তমান বাংলাদেশ অনৈক্য ও অসংহতির মারাত্বক ব্যাধিতে আক্রান্ত।  পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ ঐক্য ও সংহতিতে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল বিগত দিনে। কিন্তু বর্তমানে জাতির এ অবস্থা হল কেন? এর একমাত্র কারণ এ জাতির ভেতরে ঢুকে পড়েছে অনৈক্যের বীজ।  তাদের খণ্ড খণ্ড শক্তি নির্জীব হয়ে আছে। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব মতের পূজায় লিপ্ত।  নিজের দলনেতার কথাই তিল তাবিজ করে গলায় ধারণ করে আছে।  ফলে তারা দিন কাটাচ্ছে মুমূর্ষু অবস্থায়।  শুধু তাই নয় সব সফলতা পর্যবসিত হচ্ছে ব্যর্থতায়। পারস্পরিক অনৈক্য ও সংঘাত কোনো দিনও একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে না। বর্তমান বাংলাদেশীদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে তারা আজ বিচ্ছিন্ন, গঠনমূলক কাজের পরিবর্তে ধ্বংসাত্বক কাজে লিপ্ত।  গড়ার চেয়ে ভাঙার ক্ষেত্রে বেশি উদ্যোগী।

জাতীয় নেতৃত্বের যায়গাও আজ নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বৃহত জণগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব থেকে অনেকটা দূরে অবস্থান নিয়েছে।  হালকা এবং সাধারণ জিনিসকে কেন্দ্র করে স্বজাতিরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া।  অথচ একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্রে রূপ দিতে দেশের সকল মত ও পথের জনসমষ্টিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়।  কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন।  এখানে দলীয় সংকীর্ণতার কাছে দেশের স্বার্থও ম্লান হয়ে যায়।  যা একটি জাতির জন্য কখনোই সুখকর নয়।

একজন মানুষ যিনি ধর্ম ও মানবতায় বিশ্বাস করে, সে যে দলেই সম্পৃক্ত থাকুক না কেন জাতীয় ঐক্য এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদেরকে এক হতে হবে।  কেননা ইসলামসহ সকল ধর্মই মানুষকে এক কাতারে একত্রিত থাকার এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে সংঘাত সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। যেখানে রাসূলুল্লাহ সা. সহ সকল ধর্মপ্রচারকগণই মানুষের মাঝে শান্তি বিনষ্টকারী কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।  সেখানে মানবসমাজে যারা রাজনৈতিক ভিন্নতার সুযোগ নিয়ে অনৈক্য সৃষ্টি করতে চায়, বুঝতে হবে তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন।

বাংলাদেশ বিশ্বের মাঝে অন্যতম ধর্মীয় ও পরমতসহিষ্ণু একটি রাষ্ট্র।  বিশ্বের অন্য যে কোনো রাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে কার্যকরভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সহজতর।  এখানকার মানুষের মাঝে শান্তি বজায় রাখা এবং কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কোনো বিরোধ নেই।  বেশিরভাগ মানুষ একই ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী।  বাংলাদেশের ধর্মীয় নেতৃত্ব সৎ ও আন্তরিক হলে এখানকার মানুষের মধ্যে মুসলিম-অমুসলিম, মাজারপন্থী-মাজার বিরোধী, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থক ও কট্টর বিরোধী−এ সকল পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য অনেকখানি কমিয়ে এনে ব্যাপক ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।  এক্ষেত্রে উদারতা ও পরমত সহিষ্ণুতা হবে প্রধান পাথেয়।  বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন মত, পথ ও পর্যায়ের নেতৃত্বকে অনুধাবন করতে হবে যে, মানবতা আজ বিশ্বব্যাপী বিশেষত দুর্বলরা ব্যাপক অবিচার ও ষড়যন্ত্রের শিকার।  এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে নিজেদের গুণগতভাবে সমৃদ্ধ করতে হবে। হতে হবে ব্যাপকভাবে ঐক্যবদ্ধ। ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একজন সৎ ও আন্তরিক মুসলমান এ কারণেই প্রত্যয়ী হতে পারেন যে, ধর্মের মৌল বিষয়ে অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে কোনো ব্যাপক বিরোধ নেই। মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ধর্মশাস্ত্র বিশেষজ্ঞগণ সৎ ও নিষ্ঠাবান হলে গৌণ বিষয়াবলীর বিরোধ পরিপূর্ণভাবে দূরীভূত করা সম্ভব না হলেও হ্রাস করতে অবশ্যই সক্ষম হবেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন মতের ঐক্য (Unity in Diversity) নীতি গ্রহণীয় হতে পারে।  বৃহৎ জনগোষ্ঠী নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে চাইলে সফলতা অবশ্যই লাভ করবে। কারণ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- إِنَّ اللّهَ لاَ يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنْفُسِهِمْ- অর্থাৎ, আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।  (সূরা রা’দ: ১১)

আল্লাহ তা’য়ালা মুসলিম উম্মাহকে বিশেষত বাংলাদেশের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম, দেশ ও মানবতার জন্য কাজ করার তাওফিক দান করুন।  আমীন।

Top