মানবজাতি : পরিচয়-প্রকৃতি ও ধর্ম

মানুষ বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী জীব। এরা দুপায়ে ভর দিয়ে চলে এবং দলবদ্ধভাবে সামাজিক জীবন যাপন করে। চিন্তার ক্ষমতা এবং জটিল ও বিশদ ভাষার ব্যবহার এদেরকে প্রাণীজগতের মধ্যে স্বকীয় করে তুলেছে।

শব্দ বিশ্লেষণ : বানান বিশ্লেষণ—ম্+আ+ন্+অ+ব্+অ+জ্+আ+ত্+ই। উচ্চারণ—ma.no.bo. ɟa.t̪i (মা.নোব্.জা.তি) । শব্দটি সংস্কৃত मानव (মানব)>বাংলা মানব+সংস্কৃত छाति জাতি)> বাংলা জাতি। সমার্থক শব্দ হলো— আদমি, ইনসান, নর, নরজাতি, নৃ, মনুজ, মনুষ্য,, মনুষ্যজাতি. মানব, মানবজাতি, মানুষ, মানুষজাতি। [http://onushilon.org/ovidhan/m/manobjati.htm]

ধর্মীয় পরিচয় : হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে− ব্রহ্মার মন থেকে উদ্ভূত হয়েছিলেন মনু। আর মনু থেকে মানুষ জাতির উৎপত্তি হয়েছিল। সংস্কৃত ব্যাকরণে মনুর সন্তান অর্থে মানুষজাতিকে মানব শব্দ দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে। সমগ্র মানবের জাতিগত পরিচয়ে মানবজাতি ব্যবহার করা হয়। তবে ইসলামে ‘মানবজাতির’ আরবি করা হয় ‘বনি আদম’ বলে । অর্থাৎ যারা আদমের বংশধর । আদম আল্লাহ তায়ালার প্রথম সৃষ্টি। কুরআনের বর্ননা থেকে জানা যায়, আল্লাহ যখন ফেরেশতাদেরকে জানালেন যে তিনি পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন তখন ফেরেশতারা বলল—  আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়মিত আপনার গুণকীর্তন করছি এবং আপনার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি? তখন আল্লাহ বলেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না। [সূরা বাকারা, আয়াত ৩০]

হজরত আদমকে খরখরে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন। তারপর তাঁর দেহে প্রাণ সঞ্চার করেন। ইরশাদ হচ্ছে—  যিনি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে আর তার বংশধরদের সৃষ্টি করলেন এক তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস (ছুলাল) থেকে। [সূরা সিজদাহ ৭-৮]

আবূ হূরায়রা থেকে বর্ণিত যে, মুহাম্মদ (সা.) বলেন, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টিকালে তার উচ্চতা ছিল ৬০ কিউবিট এবং মানুষ বেহেশতে প্রবেশকালে আদমের আকার লাভ করবে। [বুখারি, হাদিস ৫৫]

বৈজ্ঞানিক পরিচয় : প্রাণীবিদ্যা অনুসারে মানুষ শিম্পাঞ্জীদের নিকটাত্মীয় একরকম দ্বিপদ স্তন্যপায়ী প্রাণী। মানব জাতি সম্পর্কিত গবেষণা এক বিশেষ বিষয় যার নাম নৃতত্ত্ব । যারা বুদ্ধিমত্তার বিচারে শ্রেষ্ঠ, বাক্‌প্রত্যঙ্গ দ্বারা সৃষ্ট ভাষার সাহায্যে সুচারুরূপে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং ভূমির উপর দুই পায়ে সরলভাবে দাঁড়াতে পারে। এরা নিজের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিজেদের প্রয়োজনীয় জীবনধারণের উপকরণ প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করতে পারে এবং উপাদনসমূহ থেকে নানাবিধ উপকরণ তৈরি করতে পারে। উন্নত মানসিক ভাবনার দ্বারা চিত্তবিনোদনের জন্য নানাবিধ বিমূর্তভাবনা উপস্থাপন করতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় প্রাইমেট গণভুক্ত একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী যার বৈজ্ঞানিক নাম— Homo sapiens।

মানব প্রকৃতি : মানবজাতির কিছু বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যথা, চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণের বিভিন্ন ধরন, যেগুলো মানব সন্তান জন্ম থেকেই সমাজ, সংষ্কৃতি, নিজস্ব জগৎ ও পারিপার্শিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রাকৃতিক ও স্বাধীনভাবে লাভ করে। এই চারিত্রিক বৈশিষ্টগুলো কী, কীভাবে তা বিকশিত হয় এবং কীভাবে প্রভাবিত হয় তা পাশ্চাত্য দর্শনের একটি অন্যতম প্রশ্ন। এই প্রশ্নের মধ্যে নৈতিকতা, রাজনীতি, এবং ধর্মতত্ত্বের বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে। মানব প্রকৃতির আচার বা জীবনের উপায় নিয়ম মেনে নির্মিত, সেই সাথে উপস্থাপন অবমুক্ত বা একটি ভাল জীবনের উপর সীমাবদ্ধতা হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে। [Aristotle Nicomachean Ethics Book I and VI; Plato Republic Book IV.]

শারীরিক গঠন প্রক্রিয়া বিবর্তন : চার পায়ের বদলে দুই পায়ে চলতে আরম্ভ করার সাথে সাথে মানব শরীর-গঠন ও শরীর-প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে আরম্ভ করে। যেমন পেটের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলিকে নীচে পড়ে যাওয়ার থেকে রক্ষা করার জন্য শ্রোণীচক্রের (Pelvic girdle) ব্যাস (diameter) ছোট হয়। বাচ্চার জন্মের পথ সরু হয়ে যাওয়াতে গর্ভে মস্তিষ্ক বৃদ্ধি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বাচ্চাকে ভূমিষ্ঠ হতে হয়। তার ফল সদ্যোজাত মানবশিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে পরনির্ভরশীল। তাকে বহুদিন মা-বাবা ও অন্যান্যদের অভিভাবকত্বে বড় হতে হয়। এখানে ভাষার অবদান গুরত্বপূর্ণ। মুখ ও গলার গঠনে পরিবর্তন হওয়ার কারণে মানুষ অনেক জটিল মনোভাব আদানপ্রদানে সক্ষম হয়। মানুষের উদ্বর্তনের সব থেকে মূল্যবান উপহার মস্তিষ্কের উন্নতি। মানুষের মস্তিষ্ক প্রাণীরাজ্যে বৃহত্তম না হলেও আপেক্ষিকভাবে বৃহত্তরদের অন্যতম। মানুষ জন্মাবার বহুবছর অবধি স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ অব্যহত থাকে। অন্যান্য মানুষদের সঙ্গে ভাষা ও ভঙ্গীর সাহায্যে ভাব বিনিময় করতে করতে বহু আচার-ব্যবহার অধীকৃত হয়, যা জন্মগত ভাবে (জীনের মাধ্যমে) সহজে বর্তায়না। দলবদ্ধ সমাজব্যবস্থাও এতে উপকৃত হয়। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে বয়স্কা মহিলাদের মাসিকবন্ধ হয় তথা রজোনিবৃত্তি ঘটে বলে তাদের ভূমিকা মায়ের বদলে দিদিমায় উপনীত হয় । ফলে তাদের দুই প্রজন্ম পরের মানবশিশুদেরও সুরক্ষা বর্ধিত হয়, শিক্ষা ত্বরান্বিত হয়। মানুষই একমাত্র প্রাণী যাদের বয়ঃসন্ধি ও রজোনিবৃত্তি আছে। [Global Mammal Assessment Team (2008). Homo sapiens. In: IUCN 2009. IUCN Red List of Threatened Species. Version 2009.2.]

প্রাচীনধর্ম : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়াল এরশাদ করেন— পুরো মানবজাতি একসময় এক ধর্ম অনুসরণ করতো। তারপর আল্লাহ নবীদের পাঠালেন যারা সুসংবাদ দেন এবং সাবধান করেন। তাদের মাধ্যমে কিতাব পাঠালেন, অকাট্য সত্য দিয়ে, যেন তারা মানুষের মাঝে মতভেদের মীমাংসা করতে পারেন। অথচ যাদেরকে পরিষ্কার প্রমাণ দেওয়া হয়েছিল, শুধু তারাই অন্যকে দমিয়ে রাখার মনোভাবের কারণে তা নিয়ে মতভেদে জড়িয়ে পড়ে। তারপরে আল্লাহ  বিশ্বাসীদেরকে সঠিক পথ দেখান, সে সব ব্যাপারে, যা নিয়ে তারা মতভেদ তৈরি করেছিল। আল্লাহ  যাকে চান, তাকেই পথ দেখান। [সূরা বাকারাহ, আয়াত ২১৩]

অথচ এ-যুগে একদল প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন যে, মানবজাতি শুরু থেকে নানা প্রাকৃতিক শক্তিকে পূজা করতো, মূর্তিপূজাও করতো। কিন্তু বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ চার্লস মার্সটন (Sir Charles Marston) বইয়ে প্রমাণ দেখিয়েছেন যে, মানবজাতির প্রথম ধর্ম ছিলো এক ঈশ্বরে বিশ্বাস বা এর খুব কাছাকাছি একটি বিশ্বাস। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. স্টিফেন ল্যাঙডন (Dr. Stephen Langdon) সুমেরীয় এলাকা খোঁড়াখুঁড়ির পর প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার করে এই উপসংহারে পৌঁছেন যে, মানবজাতির ইতিহাস হচ্ছে এক ঈশ্বরবাদ থেকে বিকৃত হতে হতে চরম পর্যায়ের বহু ঈশ্বরবাদ এবং নানা ধরনের অশুভ শক্তিতে বিশ্বাস। একইসাথে তারা সবাই মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবনে বিশ্বাস করতো। তার বই Semitic Religion-এ তিনি দেখান যে, প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা সম্পর্কে ব্যাপক অপপ্রচারনা চালানো হলেও, তিনি সকল প্রমাণ দেখে নিশ্চিত যে, সুমেরীয় এবং সেমিটিক সভ্যতাগুলো একসময় এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতো, তারপরে তারা বহু ঈশ্বরবাদে ডুবে যায়। [তাফসীর উল কুরআন, মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি]

মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ : শ্রেষ্ঠত্ব একটি গুণ । সন্দেহ নেই, এই গুণ আরও অনেকগুলি গুণের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় । আল্লাহ তায়ালা মানুষকে, বরং বলা ভালো মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে এবং অন্যান্য জাতির ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন । কেনো দিয়েছেন? কারণ মানুষ শ্রেষ্ঠ হবার যোগ্য তা-ই । এই শ্রেষ্ঠত্ব কি গুণাবলি ও কি কারণের ওপর নির্ভরশীল? উত্তরে এ কথাই বলা হবে, আল্লাহতায়ালা আদম-সন্তানকে বিভিন্ন দিক দিয়ে এমন সব বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে নেই। যেমন সুশ্রী চেহারা, সুষম দেহ, সুষম প্রকৃতি ও অঙ্গসৌষ্ঠব ইত্যাদি। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তার ইবাদত করার জন্য। সালাত ও সবরের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে নিজের কামনা বাসনা এবং নিজের মনের আবেগ পেশ করবে। অন্য কারও কাছে কোনো কিছু চাবে না এবং সেজদার উদ্দেশ্যে কারও কাছে নিজের মাথাও ঝুঁকাবে না। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, আমি জিন এবং ইনসানকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। [সুরা জারিয়াত আয়াত ৫৬]

আল্লাহ তায়ালা তার সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে ইবাদত করার জন্য মানুষকে বেছে নিলেন কেনো? এর উত্তর আল্লাহর এই বাণী, যেখানে তিনি বলেছেন, নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদাদান করেছি। তাদের জলে ও স্থলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। [সূরা বনি ইসরাঈল আয়াত ৭০]

আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে একই সঙ্গে তিনটি জিনিস দিয়ে সৃষ্টি করেছেন- ১. যৌবনশক্তি, ২.রাগান্বিত হওয়ার শক্তি, ৩. বিচার বিশ্লেষণের শক্তি। অপরদিকে মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন তিনি উন্নত ও সুন্দর চরিত্র মাধুরী গঠনের পদ্ধতি, যা তিনি অন্য কোনো প্রাণীকে দেন নি। মানবজাতি নিজের বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে, মহান রাব্বুল আলামিনের বিভিন্ন কুদরতকে দেখে নিজের পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন পরিচালনা করবে। এমনকি আল্লাহর চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করবে। তাহলেই এই মানবজাতি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাবে রহমত আর পরকালে পাবে অনাবিল শান্তি, তথা জান্নাত। শুধু তাই নয়, আল্লাহতায়ালা এই বিশ্ব জাহানকে কেয়ামত পর্যন্ত ঠিক রাখবেন এই মানবজাতি দ্বারাই। কিন্তু এই মানবজাতি যদি নিজেদের আল্লাহ ও তার রসুলের প্রদর্শিত পথে সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়ে অন্য কোনো পথে পরিচালিত হয়, তাহলে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, তারা (মানবজাতি) চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তার থেকে আরও নিকৃষ্টতর, বস্তুত তারাই গাফেল জাতি। [সুরা আনআম, আয়াত ১৭৯] [মুফতি আমজাদ হোসাইন, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ আগস্ট ২০১৪] ###

Top