মুহাররম ও হিজরী নতুন বর্ষের সূচনা

১৪৪১। একটি নতুন হিজরী বর্ষের সূচনা। শুধু কি সূচনা? না কি তা এসেছে পরিসমাপ্তির পথ বেয়ে? কাজেই এখানে বিবেচনা দু’টো বিষয়ের-অতীতের এবং আগামীর। অতীতের যে সময়টুকু আল্লাহ তাআলার মর্জি মোতাবেক অতিবাহিত হয়েছে তার জন্য শোকরগোযারী আর যা ভুল-ত্রুটি হয়েছে তা শুধরে নিয়ে আগামীকে আরও ফলপ্রসূ করে তোলার সংকল্প।

তবে এটা শুধু বর্ষকেন্দ্রিক নয়, মাস বা সপ্তাহকেন্দ্রিকও নয়। একজন মুসলিম প্রতিদিন তার কর্মের হিসাব গ্রহণ করে এবং গতদিনের চেয়ে আগামী দিনকে অধিক ফলপ্রসূ করার চেষ্টা করে। এক হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘‘সকল মানুষ প্রত্যুষে উপনীত হয় এবং নিজের সত্তাকে বিক্রি করে-হয় আল্লাহর কাছে বিক্রিত হয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তিলাভ করে, নতুবা শয়তানের কাছে বিক্রিত হয়ে নিজেকে ধ্বংস করে।’’-সহীহ মুসলিম ৩/১০০

তাই কালচক্রের অবিরাম যাত্রায় শুধু বছর নয়, মাস বা সপ্তাহও নয়, প্রতিটা দিনই মানুষের হিসাব-নিকাশের উপলক্ষ।   সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেছেন, ‘যখন তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হও তো প্রত্যুষের অপেক্ষা করো না আর প্রত্যুষে করো না সন্ধ্যার অপেক্ষা। সুস্থতার সময়ই অসুস্থতার কথা মনে রেখে কাজ কর, আর জীবন থেকেই সংগ্রহ কর মৃত্যুর পাথেয়। হে আল্লাহর দাস, তুমি জান না, আগামীকাল তোমার উপাধী কী হবে (জীবিত না মৃত)।-জামে তিরমিযী ৪/৫৬৮

তাই মুসলমানের কর্তব্য হল সচেতনতার ছোট-বড় যেকোনো উপলক্ষকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রেরণায় নতুন মাত্রা যোগ করা।

মুহাররম ও আশুরা: পবিত্র কুরআনে ও হাদীস শরীফে এ মাস সম্পর্কে যা এসেছে তা হল, এটা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ সময়। কুরআনের ভাষায় ‘আরবাআতুন হুরুম’-অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম এই মাস।

এ মাসে রোযা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে: হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হল সর্বশ্রেষ্ঠ।’-সহীহ মুসলিম ২/৩৬৮; জামে তিরমিযী ১/১৫৭

এর মধ্যে আশুরার রোযার ফযীলত আরও বেশি: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।’-সহীহ বুখারী ১/২১৮

হযরত আলী রা.কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুহররম মাসে রাখ। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’-জামে তিরমিযী ১/১৫৭

অন্য হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ -সহীহ মুসলিম ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী ১/১৫৮

আশুরার রোযা সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে যে, ‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।’-মুসনাদে আহমদ ১/২৪১

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে ৯ তারিখেও অবশ্যই রোযা রাখব।’-সহীহ মুসলিম ১/৩৫৯

মহররম ও আশুরাকেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার: এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদিনে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরত প্রকাশ করেছেন। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ডুবিয়ে মেরেছেন।-সহীহ বুখারী ১/৪৮১

তবে এ দিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নানা ভিত্তিহীন কথাও বলে থাকেন। যেমন, এদিন হযরত ইউসুফ আ. জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইয়াকুব আ. চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন। অনেকে বলে, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। হযরত ইউনুস আ. মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইদরীস আ.কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই।-আস আসারুল মারফূআ, আবদুল হাই লাখনেবী ৬৪-১০০; মা ছাবাহা বিসসুন্নাহ ফী আয়্যামিস সানাহ ২৫৩-২৫৭

এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন রা.। বলাবাহুল্য যে, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই তো শিক্ষা-‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয়ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।’

অন্য হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যারা মুখ চাপরায়, কাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যুগের কথাবার্তা বলে।’

অতএব শাহাদাতে হুসাইন রা.কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকান্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলী রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।

এ মাসে যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় তার মধ্যে তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ করা যায়। এজন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে। বলাবাহুল্য এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার।

মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, তওবা-ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক চলাই মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

Related posts

Top