যৌতুকের নৃশংসতা ও ইসলামে বিধান

ইসলাম একটি কল্যাণময় জীবন ব্যবস্থা । এ জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে অকল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের সাথে চলার পথ দেখায় ইসলাম। মানুষের জন্য অবমাননাকর কোনো কিছুই ইসলামে অনুমোদনযোগ্য নয়। মনুষ্যত্বের জন্য অবমাননাকর যৌতুক প্রথার কোনো ঠাঁই ইসলামে নেই। নারী নিগ্রহের এ প্রথা ইসলামী বিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

যৌতুকের নৃশংসতা: বর্তমান সমাজে যৌতুক হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা ছাড়াও টিভি, ফ্রিজ, ঘরের দামি আসবাবপত্র ইত্যাদিসহ ফ্ল্যাট বাড়ি বা উচ্চমানের গাড়ি দাবি করা হয়। ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর খরচ বা চাকরিতে ঢুকিয়ে দেয়ার চুক্তিও করা হয় যৌতুক হিসেবে। এত কিছুর পরও কন্যার বাবা দায়মুক্ত হতে পারেন না। পুনঃপুনঃ নানামুখী চাপ আসতে থাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে। যদি মেয়ের অভিভাবক চাহিদা পূরণে পাস মার্ক পায় তাহলে বউ-মা লক্ষ্মীমা। আর যদি মেয়ের অভিভাবক অক্ষম হয় তখনই শুরু হয় নির্যাতন-নিপীড়ন ও অমানবিক অত্যাচার। বউয়ের কথাবার্তা আর যাবতীয় কার্যক্রম যেন তেতো ফলের মতো অস্পৃশ্য। শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনসহ হত্যার চক্রান্ত, কখনো অসহায় মেয়েটিকে নির্মমভাবে হত্যার শিকারও হতে হয়। হত্যার পর লাশ সিলিংফ্যানে ঝুলিয়ে রাখা হয় আত্মহত্যা প্রমাণে অথবা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয় কিংবা রাতের অন্ধকারে মাটির নিচে পুঁতে দেয়া হয়; যেন লাশ লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়, কাকপক্ষিও টের না পায়। এ হলো যৌতুক প্রথার বিষময় পরিণতি। সংসদে বারবার আইন করেও যৌতুকের নৃশংসতা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

ইসলামের বিধান: ইসলাম নারীকে মর্যাদার আসন দিয়েছে। বিয়ের  সময় স্ত্রীর কাছ থেকে যৌতুক নেওয়া নয় বরং স্ত্রীকে মোহর দেওয়ার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে وَآتُواْ النَّسَاء صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ‘তোমরা নারীদের তাদের মোহর, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করবে।’

ইসলাম শুধু যৌতুক প্রথার বিরোধীই নয় বিয়েশাদির ক্ষেত্রে সব ধরনের অপচয়ের বিপক্ষে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সেই বিয়েই সর্বাধিক বরকতময়, যে বিয়েতে ব্যয় খুব সামান্যই হয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিয়ে করেছেন সাধারণভাবে, নিজের প্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.) কে বিয়ে দিয়েছেন একইভাবে। বিয়েতে অপব্যয় পাত্র-পাত্রীর পরিবারের জন্য কষ্টকর পরিণতি ডেকে আনে। সামাজিক সম্মান রক্ষার অজুহাতে অনেকে বিয়েতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় করে দেউলিয়া হয়ে পড়ে। যা ইসলাম কোনোভাবেই অনুমোদন করে না।

যৌতুককে শোষণ এবং নারী নিগ্রহের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় আমাদের সমাজে। যৌতুক আদায়ের জন্য স্ত্রীর ওপর দৈহিক নির্যাতন চালানো এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের অমানবিক আচরণ হারাম।

আমাদের দেশের মুসলমানদের মধ্যে যৌতুক প্রথা বেশ জোরেশোরে প্রচলিত। এ দেশীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত যৌতুক প্রথা মুসলিম সমাজকে এতটাই আক্রান্ত করেছে যে, আমাদের দেশে যৌতুক ছাড়া বিয়ে খুবই কম হয়। অথচ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে কিংবা পরবর্তীতে ইসলামী সমাজে কখনো যৌতুক চালু ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ বিধান কোরআন হাদিসের পরিপন্থী বিধায় তা বর্জন করা মুসলমানদের কর্তব্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। পবিত্র কোরআনে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বিবাহযোগ্য মেয়ের অভিভাবকরা তাদের মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যৌতুক দিতে বাধ্য হয়। যারা যৌতুক নেন তারা অন্যায়ভাবে এ অর্থ বা সম্পদ নেন। এটি অবৈধ এবং সুনিশ্চিতভাবে গুনাহের কাজ। আল্লাহ আমাদের যৌতুকের গর্হিত ও নিন্দিত পথ থেকে দূরে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Top