শিশুকে গল্প শোনাবেন : কী শোনাবেন, কেনো শোনাবেন

আপনার ব্যস্ততা

সকালে হুড়োহুড়ি করে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে, বাচ্চাকে স্কুলের জন্যে তৈরি করে অফিসের দিকে রওনা দেওয়া। সারাদিন একটানা কাজ করে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরা। রাতের বেলা কোনোরকমে খাওয়া দাওয়া শেষে সবাইকে ‘শুভরাত্রি’ বলে ঘুমিয়ে পড়া। এই কি আপনার নিত্যদিনের রুটিন? কেনো এত ব্যস্ত আপনি?

উত্তরটা খুবই সহজ। নিজেদের ভবিষ্যত, সন্তানের ভবিষ্যত, একটু ভালো থাকা, সবাইকে ভালো রাখা। এ জন্যেই তো দিনভর এত ছোটাছুটি। কিন্তু আপনার এই ব্যস্তময় জীবনের ভবিষ্যত যাকে ঘিরে, কখনো তার দিকে তাকিয়ে দেখেছেন সে কী চাচ্ছে? তার সত্যিই কী দরকার?

চারপাশের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে, বর্তমান যুগের মানুষ হতে গিয়ে, সন্তানকে বর্তমান সমাজের সবচেয়ে ভালো সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে আরও অনেক বেশি পিছিয়ে দিচ্ছেন আপনি। মনে করে দেখুন তো, সেই ছোট্টবেলায় বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে, মায়ের কোলে মাথা রেখে গল্প শোনার সময়গুলোর কথা। হয়তো ভাবছেন, এসব এখনকার যুগে অতটা প্রয়োজনীয় নয়। সন্তানকে গল্প শোনানোর ব্যাপারটা অনেকটাই হয়তো সেকেলে ঠেকছে আপনার কাছে। কিন্তু খানিকটা সেকেলে হলেও সত্যি যে, রাতের বেলায় পরম মমতায় বলা এই গল্পগুলো অনেকটা সাহায্য করে আপনার ছোট্ট সোনামণির চিন্তার পরিধিকে আরও বিকশিত করতে। তাকে এগিয়ে নিতে।

কেনো গল্প শোনাবেন

বর্তমান প্রযুক্তির যুগে শিশুদের মানসিক বিকাশ কমে গেছে। তারা এখন কোন কিছু ভাবার চেয়ে সামনা সামনিই সেটা দেখতে অভ্যস্ত। রাতের বেলা মায়ের কোলে শুয়ে আর তাদের কল্পনা করতে হয় না যে পঙ্খীরাজ ঘোড়া ঠিক দেখতে কেমন। তার চেয়ে টেলিভিশন বা কম্পিউটারের সামনে সময় কাটাতেই তারা বেশী সাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আর তাদের এই ভাবনার জগতকে আবার বাড়িয়ে তুলতে গল্প শোনানোর কোন বিকল্প নেই। কেননা, রাতে আপনার শোনানো গল্পগুলো শিশুদের নতুন নতুন জিনিসের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তারা প্রশ্ন করতে শেখে। জানতে আগ্রহ বোধ করে। তার স্মৃতিশক্তিকে আরও জোরদার করে তোলে।

আপনার বলা মজার গল্পটির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গালে হাত দিয়ে মনোযোগ দিয়ে সবটুকু শুনছে আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে যে শিশুটি, সে কিন্তু কেবল আপনার সামনেই নয়, ধীরে ধীরে মনযোগী শ্রোতা হয়ে উঠবে আর সবার সামনেও।

সাধারণত, স্কুলে বাচ্চাদের একটা বড় সমস্যা হলো তারা শিক্ষকের কথা না শুনে পাশের বন্ধুদের সঙ্গে বেশি কথা বলে থাকে। শিক্ষক বা অন্য কারো কথায় মনযোগ দেবার ধৈর্যটা তাদের থাকে না। অনেক কথা, অনেক চেষ্টাতেও কোনো লাভ হয়না। এই সমস্যার একটা চমৎকার আর সহজ সমাধান হতে পারে গল্প শোনানো।

তাছাড়া, প্রতিদিনকার শোনা নতুন নতুন গল্প বাড়িয়ে তোলে আপনার ছোট্ট শিশুটির শব্দ ভা-ারকে। তাকে পরিচিত করে দেয় নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে। শব্দের খেলাকে এ সময় সে অনেকটা আপন করে ভাবতে শেখে। ফলে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য অনেক শিশুর চাইতে এদিক দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা এগিয়ে থাকে সে।

মনে রাখবেন, বর্তমান প্রযুক্তির যুগে মানুষের ভাবাবেগ বেশ কমে গেছে। কমে গেছে শিশুদের নানা রকম অনুভূতিও। সে সবকে বাড়িয়ে আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে এই গল্প শোনানোর প্রক্রিয়াটি।

শিশুদের নানা রকম ছোট ছোট শিক্ষামূলক গল্প শোনানোর মাধ্যমে কোনো অতিরিক্ত চাপ ছাড়াই ওরা আরও অনেক বেশি সচেতন হয়ে ওঠে নানা বিষয়ে। এছাড়া রাজা-রাণী, খরগোশ-ভাল্লুকের গল্পের ভেতরেও ওরা স্বাদ পায় নিজেদের ঐতিহ্যের।

কী বই কিনবেন?

শৈশবে গল্প শোনা আর কৈশরে গল্প পড়ার প্রতি প্রবল ঝোঁক, প্রায় সবার জীবনে অল্পবিস্তর এমনটাই হয়ে থাকে। আমরাও এখন ছোটদের পড়াই, আমাদের বড়রাও পড়েছেন। রূপকথা পড়তে পড়তে রাক্ষস-খোক্কস, দৈত্য-দানো, হিজিবিজি সব গল্প পড়েছি। পড়েছি বিদেশের অনেক গল্প, মালয়-চীনের কল্পকথা। কোথাও বেড়াতে গেলে বুকশেলফ, টেবিলের পা-দানির নীচে ঘেঁটে-ঘুটে বই খুঁজে পড়ে সময় কাটাতাম। কিছু বই পড়ে কল্পনাশক্তি বাড়তো, আনন্দ হতো। কিছু বই পড়ে গা ঘিনঘিন লাগতো কেননা গল্পের দৃশ্যপট খুব বাজে ও নোংরা মনে হতো। স্মৃতিগুলো আমি ভুলি নি, মনে দাগ কেটে আছে সেসব সময়গুলো…

এখন বাচ্চাদের বই কিনতে দোকানে গেলে প্রায়ই মাথা চুলকে ফিরে আসতে হয় আমাদের। বই কিনতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। কেনা সেই বই থেকে একটা বাচ্চাকে গল্প বলা হবে, সে সেই বিষয়গুলো কল্পনা করবে, সেখানে সে শিখবে, সে নিজেও সেই জিনিস বলবে, এই চক্রটার শুরুটায় সুন্দর কিছু থাকা উচিত এমনই হিসেব-নিকেশ আমার। তাই আমি ঠাকুরমা আর ঠাকুরদার ঝুলি মার্কা গল্পের কথা ভাবতেই বুক কেঁপে ওঠে। একবার পড়েছিলাম, যে সন্তানদেরকে ভূতের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ান মায়েরা, তাদেরকে কীভাবে শত্রুর সামনে সত্য কথা বলতে এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে বলীয়ান হতে শেখাবেন তারা?

গল্প শোনানোর আগে ভাবুন

নিঃসন্দেহে বাচ্চাদের কী পড়ানো হবে, তাদের আত্মিক-মানসিক-বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্যে কোনটা উপযোগী, সে বিষয়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং তা গবেষণার এবং পড়াশোনার দাবি রাখে।

একবার  শাইখ হামজা ইউসুফের আলোচনায় শুনেছিলাম যে, প্রতিটি সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য, তার মানসিক উৎকর্ষতার জন্য প্রয়োজন গল্প। প্রতিটি মানব মনে আছে গল্প শোনার একটি তৃষ্ণা যা কেবল ভালো গল্পগুলোই মেটাতে পারে। বিভিন্ন গল্প হয়ত আমাদের মনে আনন্দ দিতে পারে, ভালোলাগা তৈরি করতে পারে কিন্তু হৃদয় জুড়িয়ে যাওয়ার মতো গল্প যদি না হয়, তবে শিশুর অতৃপ্তি ঘুচবে না কিছুতেই। গল্পের আরেকটি উপকার হলো এতে বিশ্বাসকে কর্মে রূপান্তরিত হতে দেখা যায়।

গল্প ভালোবাসে সবাই

কেবল শিশু নয়, যে-কোনো বয়সেই মানুষ গল্প ভালোবাসে। গল্প মানুষকে আনন্দ দেয়। গল্প থেকে শেখার থাকে, বোঝার থাকে। তবে ছোটবেলার শিক্ষা ও প্রেরণা বড় হবার পথে ভিত্তি হিসেবে, শেকড় হিসেবে ভেতরে প্রোথিত হয়ে যায়। সন্তানকে বড় করার পথে তাই ঠাকুমার ঝুলি, গোপাল ভাঁড়, ভূত-পেত্নী-দৈত্য-দানোর গল্প পড়তে দিয়ে কোমল মনগুলোকে তিক্ত করার আগেই কুরআনের গল্পগুলো, হাদিসের গল্পগুলো, সালাফদের জীবনীগুলো আমাদের সন্তানদের শেখানো উচিত। নৈতিক, ঈমানী, আদর্শিক শিক্ষা আমরা এভাবেই সন্তানদের মাঝে, পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে সঞ্চারিত করতে পারি। শুধু সন্তানদের কথাই নয়, যারা শিশু থেকে ‘বুড়ো’ হয়ে গেছি, তাদেরও উচিত এমনসব শিক্ষণীয় গল্পের আসর করা যেনো শ্রোতা মাত্রই উপকৃত হতে পারে।

 

Top