শিশুসাহিত্যে মুসলমানদের অবদান

প্রাকআলোচনা  : একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ- বীজ থেকে অঙ্কুর, অঙ্কুর থেকে চারা, চারা থেকে শিশুগাছ, শিশুগাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ একটি গাছের রূপ লাভ। প্রকৃতির এ পালাবদলের মত আগামীদিনের পিতা- একজন শিশুর জীবনেও আসে কিছু পালাবদল। দিনবদলের সাথে সাথে আসে রূপ বদলের  মত কিছু ঝড়-ঝাপটা। মানবজীবনের এসব পালাবদলে টিকে থাকার জন্য চাই কিছু সুশিক্ষা। প্রয়োজন পরে কিছু সুদীক্ষার। চাই কিছু সুঠাম হাতের তত্ত্ববধায়ন। সুমতি লালনপালন।  আগামীদিনের রাহবার-আকাবিরকে  দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য দরকার কিছু সুখপঠন সামগ্রী। কঁচি মন-ক্যানভাসে এখনই এঁকে দেয়া চাই সুর্দশনা-সুন্দর আদর্শময়া কিছু ছবি, কিছু মডেল।

কবে, কার হাতে, কীভাবে এবং কাকে উৎসর্গ করে বাংলাভাষায় শিশুসাহিত্যসাধনার জন্ম ঘটে, ঠিক বলা মুসকিল। তবে বঙ্গদেশে হিন্দু পন্ডিতদের হাতে শিশুসাহিত্যসাধনার দ্বার উন্মোচিত হয়- একথা যেমন সত্য, মুসলমান সাহিত্যিকদের এপথে বিলম্বে অংশগ্রহণের বিষয়টাও অসত্য নয়। বাংলাসাহিত্যের অনান্য শাখা-পল্লবের মত শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমানদের অবদান-সূর্য অনেক বিলম্বে উদিত হয়। অনেক পরে হলেও সক্রিয় এবং স্বার্থক অংশগ্রহনের মাধ্যমে বিলম্বিতের দোষ এড়াতে পেরেছিল তারা, শতভাগ।

শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনার মধ্য দিয়ে বঙ্গদেশে শিশুসাহিত্যসাধনা শুরু হয়। বাংলাভাষাতে যারা প্রথম শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনায় ব্রতী হন বলে আমরা ইতিহাস গবেষনায় দেখতে পাই- তারা ছিলেন র্ফোট উলিয়াম কলেজের খ্রীস্টান ও হিন্দু পন্ডিতগণ। পরবর্তীকালেও তাদের ধারাবাহিকতায় অনেক হিন্দু পন্ডিত এপথে আগ্রহী হন এবং সাধনামুখর জীবন গড়তে সক্ষম হন। বিদ্যাসাগর, অক্ষয়দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, রাজকৃষ্ণ, রাজেন্দ্রলাল, মধুসুধন মুখোপধ্যায়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ নাম হিন্দু শিশুপাঠ্য রচনা-আদিপর্বের গৌরব।

১৮০০ খ্রীস্টাব্দের প্রথম দিকে র্ফোট উলিয়াম কলেজের পন্ডিতরা মিশনারী এবং দেশী ছাত্রদের জন্য শিশু পাঠ্যপুস্তক রচনা আরাম্ভ করেন।  এ মিশনারী যুগেই তাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়, ‘কলিকাতা বুক সোসাইটি’ (১৮১৭),  ‘ভার্নকুলার লিটারেচার কমিটি’ (১৮৫০), এবং অনুবাদ সাহিত্য গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গ অনুবাদ সমাজ’ (১৮৫০)।

ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তকগুলি ১৮৫০-১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। অক্ষয় দত্ত রচিত ‘চারুপাঠ’ (৩খন্ড) প্রকাশিত হয় ১৮৫৩-১৮৫৯ সালে। মদন মোহন রচিত ‘র্তকালংকারে শিশুশিক্ষা’ ১৮৪৯-১৮৫০ সালে তিনখন্ডে প্রকাশ পায়।

একদিকে শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনা যেমন শিশুসাহিত্য সাধনার গতিকে তড়ানিত্ব কওে, তেমনি তৎকালে প্রকাশিত বিভিন্ন শিশুতোষ পত্রিকায় ছোটদের জন্য লেখা-রচনা সাহিত্যের এ ধারায় উন্নয়নের জোয়ার আনে।  যদ্দুর জানা যায়, ১৮১৮ খ্রীস্টাব্দে ‘দিকদর্শণ’ নামে সর্বপ্রথম এদেশে শিশুতোষ পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। এরপর সময়ের সাথে সাথে ‘পঞ্চাবলী’ (১৮২৯) ‘বালকবন্ধু’ (১৮৭৮) ‘সখা’ (১৮৮৩) ‘বালক’ (১৮৮৫) ‘সাথী’ (১৮৯০) ‘সখা ও সাথী’ (১৮৯৪) ‘মুকুল’ (১৮৯৫) ‘প্রকৃতি’ (১৯০০) ইত্যাদি শিশুপাঠযোগ্য পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাভাষায় শিশুসাহিত্য সাধনায় নতুন প্রাণের জোয়ার আসে। নব উষার স্বর্নদ্বার উন্মোচিত হয়। এসব পত্রিকার পাতায় তখন নতুন নতুন এবং শ্রেষ্ঠ সব শিশুসাহিত্যিকদের সমাগম ঘটতে থাকে। এককথায় বলা চলে, সেকালে রচিত শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক এবং প্রকাশিত শিশুপাঠ্য পত্রিকার মাধ্যমে  সে যুগের বাঙালি শিশুদের জীবনযাপনের ও আনন্দ-উপভোগের যথাযথ  খোরাক বন্টন হয়েছিল।

শিশুচিত্তের চাহিদা মোতাবেক ধীরে সুধীরে  বাংলা শিশুসাহিত্যসাধনা প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। লেখক-প্রকাশক উভয় শ্রেনী উদ্ভুদ্ধ হয়ে ওঠেন শিশুতোষ প্রকাশনায়। ফলে আধুনিক বিশ্বের শিশুসাহিত্যসাধনার পাশাপাশি আমাদের বাঙালি শিশুসাহিত্যসাধনাও প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়। আর্ন্তজাতিক মহলে বাঙালি শিশুসাহিত্যকে গর্বিত-প্রশংসিত করে তোলার পিছনে যে সব শিশুপত্রিকা ভূমিকা পালন করেছে বলে দেখা যায়, তা হলো- ‘শিশু’ (১৯১৩) ‘ধ্রুব’ (১৯১৩) ‘সন্দেশ’ (১৯১৩) ‘মৌচাক’ (১৯২০) ‘বঙমশাল’ (১৯২০) ‘শিশুসাথী’ (১৯২২) ‘খোকাখুকু’ (১৯২৩) ‘রামধনু’ (১৯২৭) ‘মাসপয়লা’ (১৯২৮) ‘পাঠশালা’ (১৯৩৬) ইত্যাদি।

শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমান : মুসলমান লেখক-সাহিত্যিকরাও শিশুতোষ রচনার ক্ষেত্রে আশ্চর্য সব অবদান রাখতে সক্ষম হন। শিশুসাহিত্যসাধনার প্রথম যুগ থেকেই আমরা কিছু কিছু মুসলিম লেখককে সাহিত্যের এ শাখায় অংশগ্রহন করতে দেখি।  যেমন- হায়দার বক্স (১৮০৩), মুন্সী আবদুল আলী (১৮৮৩)

এরপরপরই আমরা এপথে দেখতে পাই বাংলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের পদচারনা। তিনি ‘পদ্যশিক্ষা’ (২খন্ড,১৮৮৯-১৮৯০) রচনার মাধ্যমে শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমানদের অবদানের স্বার্থক উদ্বোধক হিসেবে পরিচিতি-প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এরপর মুহাম্মদ মিয়াজান (১৮৯৩) এবং মোসলেমুদ্দিন খান (১৮৯৪) সহ আরো কিছু মুসলিম লেখক এপথে আগ্রহী হয়ে ওঠেন । সেকালের শিশুসাহিত্যসাধনায় তারা  নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হন। বলাবাহুল্য, পরবর্তীকালের শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমানদের স্বগৌরব পদচারনা এবং সুসাধনাময় জীবনের পিছনে তারাই ছিলেন মুল উৎসাহ। আসল উদ্যোগতা।

এরপর বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশে মীর মোশাররফ হোসেন ‘মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা’ র্শীষক শিশুতোষ পুস্তক রচনার মাধ্যমে খুব নাম করেন। তাদের অংশগ্রহনের পরপর অনান্য মুসলিম লেখকদের মাঝে শিশুসাহিত্য সাধনায় আন্তনিয়োগের মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। এসময় অনেক মুসলিম লেখক নিজেদের এ সাধনায় নিয়োজিত করেন। অনেকে করেন নিজেকে এপথে উৎসর্গ। তখনকার কয়েকজন মুসলিম লেখক-লেখিকাদের নাম উল্লেখ করা হলো- শেখ শাহ আবদুল্লাহ, তফাজ্জল হোসেন, আফজানুননেসা, আব্দুল ওয়াহেদ, মোহাম্মদ মোবারক আলী, আলী আকবর খান, ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী ইমদাদুল হক, মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ, শেখ আব্দুল জব্বার, আবুল হোসেন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, হাবীবুল্লাহ বাহার, শামসুন্নাহার, কাজী আকরম আলী, গোলাম মোস্তফা, আব্দুল কাদির, মইনুদ্দিন, ইব্রাহিম খা, আ.ন.ম.বজলুর রশীদ, ড.মুহাম্মদ এনামুল হক, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী প্রমুখ।

অনেক শিশুব্রতী এবং মুসলমান সাহিত্যিকদের তৎকালিন শিশুসাহিত্য সাধনায় এতোবেশি অগ্রণী এবং স্বার্থক ভূমিকার পিছনে নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি ছাড়াও যে বিষয়টি কাজ করেছিল, তা হলো- তখনকার মুসলমান প্রকাশক-সম্পাদকবৃন্দের উৎসাহ-উদ্দিপনা প্রদান। বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা মুসলমান লেখক-সাহিত্যিকদের শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনায় উদ্ভূদ্ধ করতেন। সম্পাদকরা পত্রিকার পাতায় তাদের শিশুতোষ রচনা, গল্প, কবিতা এবং জীবনকাহিনী  ছেপে তাদের উৎসাহ দান  করতেন। হিন্দু লেখক-লেখিকাদের নিরঙ্কুশ হিন্দু সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ে শিশুতোষ সাধনার বিপরীতে মুসলমানদের এসব উদ্যোগ ছিলো যুগোপযুগী এবং ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন রক্ষার সবচে’ বড় প্রয়াস। মুসলিম সংস্কৃতি, ইসলামী নীতি-ধর্ম-আদর্শ এবং ইতিহাস সর্ম্পকিত বিভিন্ন বিষয়কে শিশুকিশোরদের সামনে পরিবেশনের জন্য পরমউৎসাহ দান করে বিশ্ববিখ্যাত পন্ডিত, ভাষাবিজ্ঞানী ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন-  “প্রথমেই চাই মুসলমান বালক-বালিকাদের জন্য পাঠ্যপুস্তক। কি পরিতাপের বিষয়! আমাদের শিশুগণকে প্রথমেই রাম, শাম এবং গোপালের গল্প পড়িতে হয়। সে পড়ে, গোপাল বড় ভালো ছেলে । কাসেম বা আব্দুল্লাহ কেমন ছেলে সে তা পড়িতে পায় না। তখন হইতেই তাহার সর্বনাশের বীজ উপ্ত হইল। স্বভাবত তাহার ধারনা জন্মিয়া যায় , আমরা মুসলমান ছোট জাতি, আমাদের মাঝে বড়লোক নাই। এসকল পুস্তক দ্বারা আমাদের মুসলমানিত্বহীন করা হয়।

একথা ঠিক বাংগালী মুসলমান বাংগালী হিন্দু সম্বন্ধে যতটুকু জানে, বাংগালী হিন্দু বাংগালী মুসলমান সম্বন্ধে তাহার এক আনাও জানে না। কাজেই মুসলমানগণ পাঠ্যপুস্তক সংকলনে হস্তক্ষেপ করিলে অধিক কৃতকার্য হইবেন বলিয়া আশা করা যায়।…স্কুলপাঠ্যে হিন্দু রাজাদের সম্বন্ধে অগৌরবজনক কথা প্রায় ঢাকিয়া  ফেলা হয় আর মুসলমানদের বেলায় ঢাক-ডোল বাজাইয়া প্রকাশ করা হয়, গুণের কথা বড় একটা উল্লিখিত হয় না। ফলে দাড়ায় এই, ভারতবর্ষের ইতিহাস পড়িয়া ছাত্ররা বুঝিল মুসলমান নিতান্ত অপদার্থ, অবিশ্বাসী, অত্যাচারী এবং নিষ্ঠুর জাতি। পৃথিবী হইতে তাহাদের শীঘ্র লোপ হওয়াই মঙ্গল।”

একদিকে শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং মুসলমান সম্পাদিত শিশুকিশোর উপযোগী পত্রিকার পাতায় মুসলমানদের শিশুসাহিত্যসাধনা ধীরে ধীরে আরো গতিমান হয়ে ওঠতে থাকে। তখনকার হিন্দু সম্পাদিত পত্রিকায় মুসলমান লেখকদের অংশগ্রহণ ছিলো সীমাবদ্ধ এবং খুব নিয়ন্ত্রিত। তাদের প্রকাশনা ছিলো নিজস্ব মানসিকতা মাফিক নির্বাচিত। হিন্দু সমাজ-সংস্কৃতির সাথে সর্ম্পকিত। হিন্দুদের সম্পাদিত শিশুতোষ পত্রিকার পাশাপশি মুসলমানদের সম্পাদিত যে সব পত্রিকা মুসলমান শিশুসাহিত্যিকদের শিশুসাহিত্যসাধনায় নিজস্ব গতি দাঁড় করাতে সহযোগীতা করেছিলো তা হলো- এ.কে ফজলুল হক সম্পাদিত সপ্তাহিক ‘বালক’ (১৯০১), টাঙ্গাইলের মাসিক ‘উৎসাহ’ (১৯১৩), মাসিক ‘বালক-নুর’, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত মাসিক ‘আঙুর’ (১৯২০), শাখাওয়াৎ হোসেন সম্পাদিত মাসিক ‘মকতব’ (১৯২৭), আফজাল উল হক সম্পাদিত মাসিক ‘শিশুমহল’ (১৯২৭), শেখ ফজলল করীম সম্পাদিত মাসিক ‘জমজম’ (১৯৩০), মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সম্পাদিত মাসিক ‘শিশুসওগত’ (১৯৩০), আব্দুল ওহাব সম্পাদিত মাসিক ‘গুলবাগিচা’ (১৯৩৭), মুহাম্মদ শফীউল্লাহ সম্পাদিত মাসিক ‘ফুলঝুরি’ (১৯৩৮), মওলভী রজীউর রহমান সম্পাদিত (পরে শাহেদ আলী সম্পাদিত) মাসিক (পরে পাক্ষিক) ‘প্রভাতী’ (১৯৪২), এমাদ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী সস্পাদিত মাসিক ‘সবুজপাতা’ (১৯৪২) প্রভৃতি পত্র-পত্রিকা অন্যতম। এসব পত্রিকার মাধ্যমে তখনকার শিশুসাহিত্য অনেকাংশে মুসলমানদের দখলে চলে এসেছিল।

বৃটিশযুগকে শিশুসাহিত্যের বিকাশ এবং উদ্ভব যুগ বলা হয়। শিশুসাহিত্যসাধনার আদিপর্বে এসব পত্রিকা মুসলমান লেখকদের নানান আঙ্গিকে শিশুসাহিত্য সাধনার সুযোগ করে দেয়। বর্তমানে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন এমন নামীদামী অনেক শিশুসাহিত্যিকদের শিশুসাহিত্যবিষয়ক হাতেখড়ি হয় এসব পত্রিকার মাধ্যমে। মুসলিম শিশুসাহিত্যিকরা কেবল যে মুসলিম প্রকাশিত-সম্পাদিত পত্রিকায় লিখতেন এমনটা নয়, হিন্দুদের প্রকাশিত-সম্পাদিত বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তারা লিখেছেন সিদ্ধহস্ত। যদিও সে লেখা-সুযোগ ছিলো হিন্দুদের নিজস্ব সংস্কৃতিময়। সীমানাবদ্ধ এবং বিভিন্ন নিয়মনীতিবদ্ধ ছিল তা । তখন কিছু কিছু মুসলিম সাহিত্যিকরা কেবল শিশুসাহিত্যে নয় বরং সাহিত্যের গোটা আসরে নিজেদের এমন সর্বাঙ্গীনভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলো যে, হিন্দু প্রকাশিত-সম্পাদিত পত্রিকাতে তাদের নাম যাওয়াটাও সম্পাদক-পত্রিকার গর্বের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হত ।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘তোষণী’ (১৯১০),  ‘সোপান’ (১৯১০), ‘রাজভোগ’ (১৯২০), ‘পাপিয়া’ (১৯২৮) ইত্যাদি পত্রিকাতে কায়কোবাদ, কাজী নজরুল ইসলাম, শেখ আব্দুল জব্বারদের মত মুসলিম লেখকরাও  শিশুতোষ লেখা লিখেছেন। প্রসংগত উল্লেখ্য, কলকাতার থেকে প্রকাশিত  কিছু কিছু হিন্দু সম্পাদিত পত্রিকাতেও মুসলিম শিশুসাহিত্যিকদের লেখা ছাপতে দেখা যায়। তারমাঝে ‘মৌচাক’ (১৯২০), ‘শিশুসাথী’ (১৯২১) অন্যতম।

তৎকালে বিশেষভাবে শিশুপত্রিকা প্রকাশ ছাড়াও বিভিন্ন সপ্তাহিক এবং দৈনিক পত্রিকাতেও শিশুদের জন্য আলাদা আয়োজন রাখা হত। সেখানেও এসব মুসলিম শিশুসাহিত্যিকরা সিদ্ধহস্ত লিখতেন। পত্রিকামহলও তাদের লেখা খুব সাজিয়ে গুজিয়ে ছাপাতেন।

‘বংগীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ প্রকাশিত পত্রিকার  ছোটদের পাতার নাম ছিলো ‘কোরাক’। কোরাকের জমিনে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, নজরুল ইসলাম এবং লুৎফুর রহমানের মত মুসলিম সাহিত্যিকরা শিশুরচনা লিখতেন। হিন্দুদের সম্পাদিত আনন্দবাজার, যুগান্তর, সত্যযুগ এসব পত্রিকার পাশাপশি মুসলিম শিশুসাহিত্যিকরা দৈনিক আজাদ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘মুকুলের মাহফিলে’, দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার ‘মিতালী মজলিসে’, সপ্তাহিক মুহাম্মাদির ‘ছোটদের আসরে’ এবং দৈনিক নবযুগের ‘আগুনের ফুলকিতে’ বহু শিশুতোষ রচনা লিখেছেন। এসব পত্রিকার পাতা ঘিরে মুসলিম শিশুসাহিত্যিকরা নিজেদের  মুক্তচিন্তা-ভাবনাপ্রসূত আনন্দময় এক জগত নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যা ছিলো তৎকালিন মুসলিম শিশুসাহিত্যিকদের সবচে’ বড় অর্জন। তৎকালিন লেখক-প্রকাশক-সম্পাদকদের অবদানের ফলে আমরা আজ এতোদূর এসে দাঁড়াতে পেরেছি। শিশুসাহিত্যসাধনায় খুঁজে পেয়েছি আপন ঠিকানা।

উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীকালে এসে মুসলিম শিশুসাহিত্যসাধনা পাঠ্যপুস্তক রচনা-সীমা ছাড়িয়ে অনান্য নানা দিক ও বিষয়ে প্রবেশ করে। তখন এয়াকুব আলী চৌধুরী, কাজী নজরুল ইসলাম, সফিউদ্দিন আহমেদ, তোরাব আলী, জসিম উদ্দিন, কায়কোবাদ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ডাঃ মুহাম্মদ লুৎফুর রহমান, কাদের নেওয়াজ, শেখ আব্দুল জব্বার, বন্দে আলী মিয়া এসব মুসলমান লেখকরা পাঠ্যবিষয় বর্হিভূত শিশুসাহিত্য সাধনায় হাত দেন।

এরপর আসে পাকিস্তানযুগ (১৯৪৭-১৯৭০) : পাকিস্তান আমলের প্রথমদিকে মুসলিম শিশুসাহিত্যাকাশে সাময়িক দূর্যোগের ঘনঘটা দেখা দেয়। এতোকাল ধরে যারা শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনায় আতœমগ্ন ছিলেন, তারাও এসময় এসে শিশুপাঠ্যের বাহিরে নিছক আনন্দ-আয়োজন ও কল্পনাবিলাস জাতীয় শিশুতোষ রচনার পথ বেছে নেন। এতোকাল যাবত যারা শিশুদের মন-মানস এবং মেধা-বয়স অনুসারে নিজেদের ধর্ম-দেশ-জাতির কথা শোনাতেন, তারাও এসময় এসে হাস্য-কৌতুক, রসমধু এবং রোমাঞ্চকর পঠনসামগ্রীর নতুন জগতে আগ্রহী হয়ে পড়েন। শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনা করে করে যাদের হাত পেকেছিলো তারাও কেবল সুখপাঠ্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। লিখতে আরাম্ভ করেন শিশুতোষ-শিশুপাঠ্যযোগ্য ছড়া, গল্প, কবিতা, জীবনী, প্রবন্ধ, ভ্রমরকাহিনী, উপন্যাস, হাস্য-কৌতুক এমন নানা বিষয়। এসব রচনার ফলে বাংলা শিশুসাহিত্য এক  নবমুগ্ধ ভূবনে প্রবেশ করে । তখন যারা যারা এপথে প্রয়াসী হয়েছিল তাদের মাঝে শেখ হাবিবুর রহমান, শেখ ফজলল করীম, গোলাম মোস্তফা, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ নাসির আলী, কাদের নেওয়াজ, ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, গোলাম রহমান প্রমুখ শিশুসাহিত্যিকদের নাম উল্লেখযোগ্য।

প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে মুসলিম এসব শিশুসাহিত্যিকদের কলমে যে সব বিষয় স্থান পেত, তার মাঝে ছিল কোরআন-হাদীস, ইসলামের চার খলীফা কাহিনী, ইসলামের ইতিহাস, সমাজ ব্যবস্থার নানা দিক, মুসলিম বিশ্বের গৌরবজনক প্রতিষ্ঠান-স্থান। জীবনি লেখার ক্ষেত্রে মুলত নবী-রাসূল এবং মুসলিম বীর-পীর-গাজী-শহীদ-মহাপুরুষদের কাহিনী প্রাধান্য পেত।গল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে স্থান পেয়েছে ইরান-তুরানের গল্প, আরব্য উপন্যাস, পারস্য উপন্যাস। শাহনামা, মাসনভী, গুলিস্তা ইত্যাদি থেকে নির্বাচিত আদর্শ দিকগুলি নিয়ে রচিত হত নানান শিশুতোষ গল্প-উপন্যাস। মুসলিম বিশ্বে নানা  হাস্য-কৌতুক রচনার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কলমে চলে আসতো গ্রাম বাংলার বিভিন্ন চিত্র, লোক-কাহিনী। মুসলিম  শিশুসাহিত্যিকরা ইসলামী নীতিকথাকে একেকজন একেক ভাষাশৈলী অবলম্বনে উপস্থাপন করতেন। এতে মুসলিম শিশুসাহিত্যসাধনাঙ্গনে সৃষ্টি হয় নানানধর্মী আবেদন। নানামুখী উৎকর্ষেও ছোয়ায় আলোকিত-মুখরিত হয়ে ওঠে মুসলিম শিশুসাহিত্য সাধনাকাশ।

১৯৪৭ সালে হিন্দুস্থান পাকিস্থান হওয়ান পর মুসলিম শিশুসাহিত্যিকদের শিশুসাহিত্যসাধনায় নতুন প্রাণের  জোয়ার আসে। অনেক পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এসময় এসে এমন সব লেখকরাও শিশুতোষ রচনা আরাম্ভ করেন যারা এতোদিন কেবল বড়দের জন্য লিখতেন। নতুন দেশের নতুন আলো-বাতাসে শিশুসাহিত্য সাধনা সতেজ হয়ে ওঠে। নবীন প্রবীন লেখকদের ভিড়ে আলোকিত-মুখরিত হয়ে ওঠে শিশুতোষ পত্রিকার পাতাগুলি।

সে আমলে যেসব শিশুপত্রিকাগুলিকে এ মহৎ কাজের বাণী বাহন করতে দেখা যায়, তাহলো-  পাক্ষিক ‘মুকুল’ (১৯৪৮), মাসিক ‘ঝংকার’ (১৯৪৮), মাসিক ‘মিনার’ (১৯৪৮), মাসিক ‘আজান’ (১৯৪৮), পাক্ষিক ‘নতুন আলো’ (১৯৪৮), মাসিক ‘দ্যুতি’ (১৯৪৯), মাসিক ‘হুল্লোড়’ (১৯৫০), মাসিক ‘সবুজ নিশান’ (১৯৫১), মাসিক ‘প্রতিভা’ (১৯৫৩), মাসিক ‘বিদ্যুৎ’ (১৯৫৩), মাসিক ‘খেলাঘর’ (১৯৫৪), মাসিক ‘আলাপনী’ (১৯৫৪), পাক্ষিক ‘শাহিন’ (১৯৫৫), মাসিক ‘বর্নালী’ (১৯৫৬), মাসিক ‘কিশোর সাহিত্য’ (১৯৫৬), মাসিক ‘সবুজ সেনা’ (১৯৫৭), পাক্ষিক ‘কিশলয়’ (১৯৫৯), মাসিক ‘রংধনু’ (১৯৬০), মাসিক ‘মধুমেলা’ (১৯৬০), মাসিক ‘সবুজ পাতা’ (১৯৬২), মাসিক ‘সোনার কাঠি’ (১৯৬৩), ষান্মাসিক ‘ফুলকি’ (১৯৬৪), সিলেট থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘নবারুণ’ (১৯৬৪), মাসিক ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ (১৯৬৪), মসিক ‘টরেটক্কা’ (১৯৬৪), দ্বিমাসিক ‘পূরবী’ (১৯৬৫), মাসিক ‘কঁচি ও কাঁচা’ (১৯৬৫), মাসিক ‘বিজ্ঞানের জয়যাত্রা’ (১৯৬৫), মাসিক ‘টাপুর টুপুর’ (১৯৬৬), ত্রৈমাসিক ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান’ (১৯৬৭), মাসিক ‘কিচির মিচির’ (১৯৭০), মাসিক ‘কলকন্ঠ’ (১৯৭০), মাসিক ‘সাম্পান’ (১৯৭০) ইত্যাদি।

বাংলা সাহিত্যের অনান্য শাখা-পল্লবের মত শিশুসাহিত্য সাধনায় মুসলমানদের বিলম্ভে অংশগ্রহণ হয়, যদিও তাদের সক্রিয় এবং সচেতন অংশগ্রহণ তাদেরকে এপথের স্রষ্টার মর্যাদায় উত্তীর্ণ হতে সক্ষম করেছিল, একথা আমি আগেই বলেছি। সাহিত্যের অনান্য বিষয়ের মত শিশুসাহিত্য বিষয়েও মুসলমান লেখকরা অসংখ্য-অগনিত গ্রন্থ রচনা করেন। ১৮৮৯ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত মুসলিম শিশুসাহিত্যিক রচিত শিশুতোষ গ্রন্থের একটি তালিকা নিম্নে দেয়া হলো-

মোজাম্মেল হকের ‘পদ্যশিক্ষা’ (দুইখন্ড, ১৮৮৯-১৮৯৩)। শেখ ফজলল করীমের- ‘হারুন-আর-রশিদের গল্প’ (১৯১৬), ‘সোনার বাতি’ (১৯১৮)। সফিউদ্দিন আহমদের ‘ছেলেদের হজরত মোহাম্মদ’ (১৯১৮), ‘মোতির মালা’ (১৯২২), ‘পূণ্য কাহিনী’ (১৯২২)। মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর ‘নূর নবী’ (১৯১৮)। মোহাম্মদ ওয়াযেদ আলীর ‘ডন কুইকসোট’ (১৯১৮), ‘সিন্দবাদ হিন্দবাদ’ (১৯২২)। শেখ আব্দুল জব্বারের  ‘দেবী রাবেয়া’ (১৯১৩), ‘গাজী’ (১৯১৭)। ইব্রাহীম খাঁর ‘তুর্কী উপন্যাস’ (১৯১৮), ‘শিয়াল পন্ডিত’ (১৯৫১ নঃসঃ), ‘হীরক হার’ (৬ষ্ঠ সং ১৯৪৭), ‘নিজাম ডাকাত’ (নাটিকা সংগ্রহ ১৯৫০), ‘বাঘ্রমামা’ (৬ষ্ট সং ১৯৬৪)। শেখ হাবিবর রহমানের ‘হাসির গল্প’ (১৯১৭), ‘সুন্দবনে ভ্রমন’ (১৯২৬), ‘ছোটদের গল্প’ (১৯০৫), ‘গুলিস্তার গল্প’ (১৯৫২)। কাজী ইমদাদুল হকের ‘নবী কাহিনী’ (২য় সং ১৩২৪)। আবুল মনসুর আহমদের ‘মুসলমানী গল্প’ (১৯২৮)। কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঝিঙেফুল’ (১৯২৬), পুতুলের বিয়ে’ (১৯৩৩), ‘সঞ্চয়ন’ (১৯৫৫), ‘ঘুম জাগানো পাখি’ (১৯৬৪)। ডাঃ লুৎফুর রহমানের জীবনি গ্রন্থবলী এবং ‘রাণী হেলেন’ (১৯৩৪)। বন্দে আলী মিয়ার ‘চোর জামাই’ ( ১৯৩০),  ‘কোরআনের গল্প’ (১৯৩৪), ‘হাদিসের গল্প’ (১৯৩৪), ‘বাঘের ঘরে ঘোপের বাসা’ (১৯৩৩), ‘জংগলের খবর’ (১৯৩৭), ‘শিয়াল পন্ডিতের পাঠশালা’ (১৯৫৫), ‘টো টো কোম্পানীর ম্যানেজার’ (নাটিকা সংকলন ১৯৫৬)। জসিম উদ্দিনের ‘হাসু’ (১৯৩১), ‘এক পয়সার বাঁশি’ (১৯৪৮), ‘ডালিম কুমার’ (১৯৬০), ‘বাঙালীর হাসির গল্প’ (১ম খন্ড১৯৬০)। ফজলুর রহমানের ‘ফুলকুড়ি’ (১৯৩৮)। মোহাম্মদ মোদাব্বের আলীর ‘হীরের ফুল’ (১৯৩১), ‘তাকডুমা ডুম’ (১৯৩৮), ‘আনলো যারা জীবনকাঠি’ (১৯৪৯), ‘কিসসা শোনো’ (১৯৫৪)। আহসান হাবীবের ‘চোকন মামা’,  ‘ভেংচি খাবে’,  ‘ছুটির দিন দুপুরে’ (কাব্য ১৯৭৮), ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ (কাব্য ১৯৭৯)। কাদের নেওয়াজের ‘দাদুর বৈঠক’ (১৯৪৭)। ফররুখ আহমেদের ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫), ‘নতুন লেখা’ (১৯৬৮), ‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০)। রওশন-ইজ-দানীর ‘ফুলপরী’ (১৯৪৯)। এস. ওয়াজেদ আলীর ‘বাদশাহী গল্প’ (১৯৪৪), ‘ইরান তুরানের গল্প’ (১৯৪৭)। খান মোহাম্মদ মইনুদ্দিনের ‘আমাদের নবী’ (১৯৪১), ‘লাল মোরগ’ (১৯৫৭)। মোহাম্মদ নাসির আলীর ‘ছোটদের ওমর ফারুক’ (১৯৫১), ‘মনি কনিকা’ (৮ম সং১৯৬০), ‘বীর বলের খোশ গল্প’ (১৯৬৪), ‘বোকা বাকাই’ (১৯৬৬)। হাবীবর রহমানের ‘সাগর পারের রুপকন্যা’ (১৯৫৬), ‘ল্যাজ দিয়ে যায় চেনা’ (১৯৫৯), ‘বিজন বনের রাজকন্যা’ (১৯৫৯), ‘আগডুম বাকডুম’ (দুইখন্ড ১৯৬২)।্

একালের মুসলিম শিশুসাহিত্য সাধনা শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা এবং শিশুতোষ পত্রিকার পাতা-সীমা ছাড়িয়ে সংকলন প্রকাশনার পথও ধরে ছিল। অনেক শিশুতোষ সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হয় তখন। তৎকালিন প্রকাশিত সংকলনগ্রন্থের সংখ্যাও কোন অংশে কম নয়। ঢাকা সহ অনেক মফস্বল শহর থেকে এসব সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হতে দেখা যায়। নিম্নে সেকালের প্রকাশিত কিছু শিশুতোষ সংকলন গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো। ‘কাব্য মুকুল’ (১৯৫১), ‘খেলাঘর’ (১৯৫৪), ‘ডালি’ (১৯৫৬), ‘পাপড়ি’ (১৯৫৭), ‘নবারুণ’ (১৯৫৮), ‘স্বাপ্নিক’ (১৯৫৮), ‘কোরক’ (১৯৬০), ‘হরেক রকম’ (১৯৬১), ‘ময়ূরপক্সক্ষী’ (১৯৬১), ‘সপ্তডিঙ্গা’ (১৯৬২), ‘মধুমতি’ (১৯৬৪), ‘কনিকা’ (১৯৬৪), ‘পূবালী ফসল’ (১৯৬৪), ‘টাপুর টুপুর’ (১৯৬৬), ‘এলের পাত বেলের পাত’ (১৯৬৬), ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ’ (১৯৬৬), ‘সূর্যমুখী’ (১৯৬৭), ‘মেঘমাল্লার’ (১৯৬৭), ‘ঝিকিমিকি’ (১৯৬৮),। এরমধ্যে কোনটি নির্মিত হয়েছে কেবল শিশুতোষ কবিতা নিয়ে। কোনটি নির্মিত হয়েছে রুপকথার গল্প নিয়ে। কোনটি কেবল গল্প, কোনটি আবার সাহিত্যের সব শাখা-পল্লব নিয়ে নির্মিত হয়েছে।

সেকালের (মুসলিম শিশুসাহিত্যিকদের শিশুসাহিত্যসাধনায় আন্তনিয়োগ থেকে প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত) মুসলিম শিশুসাহিত্যিকদের শিশুসাহিত্যে আন্তনিয়োগ এবং তাদের ব্যাতিক্রমধর্মী সাহিত্যসম্ভার সৃষ্টির ইতিহাস আজও আমাদের সমাজে স্বীকৃত-সুরভিত-আন্দোলিত। শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমানদের অবদান দরিদ্র নয় বরং সাহিত্যের এ শাখা-পল্লবে মুসলমানদের অবদান স্রষ্ঠার মানপ্রাপ্ত। যার ধারাবাহিকতা আজকের শিশুসাহিত্যেও চরমভাবে বিস্তৃত-অনুসৃত। এককথায় বলা চলে, বর্তমান শিশুসাহিত্য আমাদের সেসব মুসলিম শিশুসাহিত্যিক গুরুজনদের সাধনার ফসল। শিশুসাহিত্য সাধনায় আমাদের মুসলিম পূর্বসূরীদের অবদান-দাবী কোন অনাধিকার র্চচা নয়, নয় কোন জবরদখলের জমি বরং এ এক শাশ্বত সত্য। অমোঘ উচ্চারণ। কালগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিম্নে বাংলা সাহিত্যের ক’জন মুসলিম শিশুসাহিত্যিকের নাম তালিকাভূক্ত হলো- কায়কোবাদ (১৮৫৮-১৯৫২), মোজাম্মেল হক (১৮৬০-১৯৩৩),  সফিউদ্দিন আহমদ (১৮৭৭-১৯২২), শেখ ফজলল করীম (১৮৮২-১৯৩৬), কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৫৯), মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরি (১৮৮৮-১৯৪০), ডাঃ লুৎফুর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৫), এস. ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), শেখ হাবীবর রহমান (১৮৯১-১৯৬৩), ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), তোরাব আলী (১৮৯৮-১৯৭৩), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), সাদাত আলী আখন্দ (১৮৯৯-১৯৭১), আশরাফ আলী খান (১৯০১-১৯৩৯), খান মুহাম্মদ মইনুদ্দিন (১৯০১-১৯৮১), জসিম উদ্দিন (১৯০৪-১৯৭৬), মোহাম্মদ আবিদ আলী (১৯০৭-১৯৮৭), মোহাম্মদ মোদাব্বের (১৯০৮-১৯৮৪), শামসুন নাহার মাহমুদ (১৯১০-১৯৬৪), কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯১০-১৯৮৩), বন্দে আলী মিয়া (১৯১০-১৯৭৯), মোহাম্মদ নাসির আলী (১৯১০-১৯৭৫), শামসুদ্দিন (১৯১০-১৯৮৫), মবিন উদ্দিন আহমদ (১৯১২-১৯৭৮), আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫), রওশন-ইজ-দানি (১৯১৭-১৯৬৭), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪), হাবীবুর রহমান (১৯২৩-১৯৭৬), গোলাম রহমান (১৯৩১-১৯৭২)।

পরিশিষ্ট : শিশুসাহিত্য সাধনায় মুসলমানদের অবদান-আলোচনা থেকে বর্তমান শিশুসাহিত্যের ধারা বা বর্তমান মুসলিম শিশুসাহিত্যিকদেরকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্ননাবিমুখ থাকা হয়েছে তাদের শিশুসাহিত্য অবদান থেকে। শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমানদের অবদান আলোচনার জন্য ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুসলিম মন-মানসের  বিচার-বিশ্লেষণ একটি বিশেষ দিক। আমাদের বর্তমান শিশুসাহিত্যিকদের মাঝে যার অভাব অনেকাংশে পরিলক্ষিত এবং যাদের মন-মানস বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ আমাদের সৃজনশীল প্রায় প্রতিটি অঙ্গনই এখন নাস্তিকতা অথবা ধর্মনিরপেক্ষতার জ্বরে ভুগছে। মাকর্সবাদে দীক্ষিত হয়ে নিজেদেরকে বিপ্লবী ভাবছে। আবার সেসব মত ও মতাদর্শে প্রভাবিত লেখকরাই  কোমলমতি শিশুদের কঁচিহাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন এ্যাঙ্গেলস-লেলিনদের জবিনীগ্রন্থ। যার প্রভাবে আমাদের শিশুদের মাঝে বপিত হচ্ছে ধর্মহীনতার বীজ। আমাদের বাচ্চারা আজ একজন মুহাম্মদ বিন কাসেম, সালাউদ্দিন আয়ূবীকে যতটুকু না চেনে তার চেয়ে সে বেশী চেনে চে গুয়েভারাকে। এতো আমাদেরই অবদান । আমাদের উদাসীন সৃজনশীলতার দান। কমিউনিজমে বিশ্বাসী লেখক-সাহিত্যিকদের সাজানো গোছানো চাল। যা কেবল  আমাদের শিশুদের জন্য নয়, গোটা শিশুশ্রেণীর সুস্থ মন-মানস বিকাশের পথে চরম অন্তরায়। যেসব শিশুসাহিত্যিকরা নিজেদের মুসলমান পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করেন, মুসলমান বাপ-দাদাদের দেয়া নাম পরির্বতন করে হিন্দু নাম নিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চান, নিজেদের  সাহিত্যমেধার পেছনে মুসলমান পূর্বসূরীদের আবদানের কথা অস্বীকার করেন- শিশুসাহিত্য সাধনায় মুসলমানদের অবদান শীর্ষক আলোচনায় তাদের নাম না আসা এবং তাদের সাহিত্যসম্ভার থেকে বর্ণনাবিমুখ থাকাটাই সমিচিন। একজন মুসলমানের মুসলমানিত্বের দাবী। তাই মুসলমান শিশুসাহিত্যিক নির্বাচনের দৃষ্টিতে আমাদের এসব শিশুসাহিত্যিকদের পরিত্যক্ত এবং অকার্যকর  ভাবা হয়েছে। শিশুসাহিত্য সাধনায় মুসলমানদের অবদান র্শীষক আলোচনা থেকে গুডবাই জানানো হয়েছে তাদের।

Top