সম্পদের অপচয় একটি গর্হিত কাজ [দ্বিতীয় পর্ব]

যেমনিভাবে একদিকে সম্পদ আল্লাহর নিয়ামত, অপরদিকে তা আমাদের হাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানতও। তাই এর যথাযথ ব্যবহার না করলে, অযথা-অপ্রয়োজনে তা নষ্ট করলে, অপচয় করে বেড়ালে এ আমানতের খেয়ানতকারী হিসেবে জবাবদিহিতার মুখেও পড়তে হবে। হাদীসের ভাষ্য খুবই স্পষ্ট এবং কঠিন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- لاَ تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ القِيَامَةِ حَتّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ ، وَعَنْ عِلْمِهِ فِيمَ فَعَلَ ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ ، وَعَنْ جِسْمِهِ فِيمَ أَبْلاَهُ. অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হওয়ার আগে কোনো বান্দার পা-ই নড়বে না-তার জীবন সে কীসে ব্যয় করেছে, তার ইলম অনুসারে সে কী আমল করেছে, তার সম্পদ সে কোত্থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে আর তার শরীর কীসে নষ্ট করেছে? -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪১৭

অর্থাৎ নিজে কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শারীরিক আরাম বিসর্জন দিয়ে অর্থ উপার্জন করলেই তাতে নিজের যথেচ্ছ ব্যবহারের অধিকার সৃষ্টি হয় না। এ সম্পদ যেহেতু আমাদের হাতে আমানত, তাই এর পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণও আমাদের দায়িত্ব। এখানে স্বেচ্ছাচারের কোনো সুযোগ নেই। খরচ করতে চাইলে যিনি এর প্রকৃত মালিক, তার অনুমতিক্রমেই তা খরচ করতে হবে। অন্যথায় আটকে যেতে হবে কিয়ামতের ময়দানের সেই প্রশ্নোত্তর পর্বে। আরেক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- إِنّ اللهَ كَرِهَ لَكُمْ ثَلاَثًا قِيلَ وَقَالَ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ وَكَثْرَةَ السّؤَالِ. অর্থাৎ, আল্লাহ তোমাদের জন্যে তিনটি বিষয়কে অপছন্দ করেন- ১. অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গে আলোচনা করা/না জেনে আন্দাজে কথা বলা, ২. সম্পদ নষ্ট করা, ৩. অধিক প্রশ্ন করা। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৪৭৭

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, সম্পদ নষ্ট করা আল্লাহ তাআলার নিকট একটি ঘৃণ্য বিষয়। এ সম্পদ যখন তিনি মানুষকে আমানত হিসেবে দিয়েছেন, তা দিয়ে তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে বলেছেন, তা যদি নষ্ট করা হয়, অনর্থক খরচ করা হয়, তাহলে তিনি তা অপছন্দ করবেনই। মহান আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে সম্পদরূপী এ নিআমতের কদর অবশ্যই করতে হবে।

অপচয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ এই নয় যে, আবার কার্পণ্যে জড়িয়ে যেতে হবে। অপচয়ের মতো কার্পণ্যও মানবচরিত্রের এক মন্দ দিক। স্বভাবধর্ম ইসলাম জীবনের সর্বক্ষেত্রে যেমন আমাদেরকে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ শিক্ষা দেয়, তেমনি সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ইসলামের নির্দেশনা-অপচয় ও কার্পণ্যকে দুই পাশে রেখে এর মাঝ দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। পবিত্র কুরআনের এক জায়গায় আল্লাহ তাআলার প্রকৃত বান্দাদের কিছু পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে। সেখানে তাদের সম্পদ ব্যয়ের নীতি উল্লেখিত হয়েছে এভাবে- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, وَ الَّذِیْنَ اِذَاۤ اَنْفَقُوْا لَمْ یُسْرِفُوْا وَ لَمْ یَقْتُرُوْا وَ كَانَ بَیْنَ ذٰلِكَ قَوَامًا. অর্থাৎ, যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়। -সূরা ফুরকান : ৬৭

সুতরাং শুধু ব্যয়সংকোচন নয়, বরং ব্যয়ে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে। যেখানে যা প্রয়োজন, তা ব্যয় করতে হবে। আর প্রয়োজন না হলে ছোট-বড় যে কোনো পরিমাণের ব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, জীবনযাপন তার সে মানেরই হবে। বসবাসের জন্যে যার কেবল একটি কুড়েঘর বানানোর সামর্থ্য আছে, সে ততটুকুতেই ক্ষান্ত থাকবে। যে পাকাঘর নির্মাণ করতে পারে, করবে। কারও যদি আরও বেশি সামর্থ্য থাকে বাড়াবাড়ি না করে সাধ্যমোতাবেক সে এগুলোও করতে পারে। কিন্তু কারও উদ্দেশ্য যদি হয় লোকমুখে খ্যাতি অর্জন, তাহলে সন্দেহ নেই-এটা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। অমুকের বাড়িটি দেখার মতো, তার জামাটি চোখে লেগে থাকার মতো-এমন নাম কুড়ানো কোনো বৈধ প্রয়োজনের আওতায় পড়ে না। এতে না কোনো দ্বীনি কল্যাণ রয়েছে, না আছে পার্থিব কোনো উপকারিতা। তাই জীবনযাপনের সর্বক্ষেত্রে লোকদেখানো এ মানসিকতা পরিহার করাও অপচয় থেকে বেঁচে থাকার অনন্য মাধ্যম।

পরিশেষে অত্র আলোচনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের উচিৎ মহান আল্লাহ তায়ালার দেয়া নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা, অপব্যায়-অপচয় থেকে বেঁচে থাকা এবং অধিক সংকোচন করতে গিয়ে কার্পণ্য থেকেও বিরত হয়ে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা। আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দান করুন।

Related posts

Top