সাহসী কিশোর

বিশাল হলরুম। চতুর্দিকে অন্ধকার । মধ্যভাগে একটি টেবিল । এক টুকরো আলো। টেবিল ঘিরে বসে আছে কিছু লোক। একটি শূন্য চেয়ার। প্রধানের অপেক্ষায় । নিশ্চুপ সবাই। কারো মুখে কোনো রাগ নেই। পিনপতন নিরবতা। সময় বয়ে যায় আপন গতিতে। একসময় পদধ্বনিতে গুঞ্জরিত হয় হলরুম। ক্রমেই ভারি হয়। সবাই দাড়িয়ে যায় । কুর্ণিশ করে। আলখেল্লা পরিহিত সে লোকটি এসে বসে খালি চেয়ারটিতে। গড়গড় শব্দ ধ্বনিত হয়। বিনয় ও নম্রতায় গলে যায় প্রতিটি লোক।

প্রধান মুনাহেম বেগীনই কথার মাধ্যমে সকলের নীরবতা ভাঙে। “আমি ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের ডাকার সাথে সাথে একত্রিত হয়েছেন। আপনারা জানেন, আমাদের কাজ ধীর গতি চলছে। যতোটুকু দ্রুতগতিতে চলার কথা, ততটুকু দ্রুতগতিতে চলছে না। এর পিছনে কী কী কারণ থাকতে পারে সেটা জানার জন্য আপনাদের ডাকা ।”

একজন দাঁড়িয়ে বলল, মহামান্য ইরগুন প্রধান মুনাহেম বেগীন! আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি আমাদের কথা শোনা এবং বর্তমান পরিস্থিতি জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সে সাথে একথাও জানতে চেয়েছেন, আমাদের ধীরগতির কারণ। আমরা শক্তিশালী দল হয়েও বারবার হোঁচট খাচ্ছি। রাত-দিন লড়েও আমরা এগুতে পারছি না। আপনি শোনে থাকবেন, আবদুল কাদির আল হোসাইনীর কথা। তার সাহসী ও বীরত্বের কথা। সে তার কিছু লোক নিয়ে আমাদের বিভিন্ন আক্রমণের নকশা ভঙ্গ করে দিচ্ছে। দিনে দিনে সফলতা অর্জনও করেছে বটে। এতে আরবদের মনোবল সুসংহত হচ্ছে আর আমাদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। যার ফলে আগাতে পারছি না। এখন আমাদের এমন এক পন্থা অবলম্বন করতে হবে, যাতে তাদের মনোবল ভেঙে যায়।”

প্রধান মুনাহেম বেগীন বলল, “আচ্ছা, এরা এতো অস্ত্র পায় কোখেকে? এদের তো কোনো অস্ত্র থাকার কথা নয়!” অন্য একজন দাড়িয়ে বলল, আমার জানামতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কিছু অকেজো রাইফেল রয়ে গিয়েছিলো তাদের কাছে। সেগুলো ছাড়া তাদের আর কিছু আছে বলে আমাদের জানা নেই।

‘তাহলে এরা তোমাদের ঘুম হারাম করে কীভাবে?

তোমরা কী আমাকে বোকা বানাতে যাচ্ছ। তাদের কাছে অস্ত্রও নেই। তারা কী তোমাদের চেয়ে সাহসী? প্রধানের ধমক খেয়ে পুরো হলরুম আবার নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়। এমন সময় দারোয়ান এসে জানায় “আইজ্যাক শ্যামির” এসেছে। আপনার অনুমতি হলে- প্রবেশ করতে চায়। প্রধান মুনাহেম বেগীনের অনুমতি নিয়ে চলে গেলো দারোয়ান। কিছুক্ষণ পর গাম্ভীর্যতার সঙ্গে প্রবেশ করে আইজ্যাক শ্যামির। প্রধান মুনাহেম বেগীন দাড়িয়ে তাকে সম্মান জানিয়ে বলল, “ধন্যবাদ প্রিয় বন্ধু আইজ্যাক শ্যামির! তুমি সময় মতো এসে গেছে। তোমাকে আমি মনে মনে খুঁজে ফিরছিলাম। কঠিন মুহূর্ত। এসময় তোমার আগমন। ভালো লক্ষণই বুঝা যাচ্ছে। বসো।”

একটি চেয়ার খালি করে তাকে বসার সুযোগ করে দেয়া হয়। বিখ্যাত স্টার্নগ্যাঙ দলের প্রধান আইজ্যাক শ্যামির আগমনে সবার চোখে মুখে প্রশান্তির আবেশ ছেয়ে যায়। একটু উদ্যমতা ও উচ্ছাসের রূপ নেয়। যদিও কেউ তা প্রকাশ করেনি ভরা জলশায় । শুরু হয় নতুন করে নতুন নকশা। “আজকে আমরা অনেক ভেবে চিন্তে নতুন এক সিন্ধান্তে উপনিত হলাম। এই সিদ্ধান্তই সঠিক সিদ্ধান্ত। আমরা যে নকশা তৈরি করেছি তা ইরগুন-স্টার্নগ্যাঙ দুনো দলেই একমত পোষণ করেছি। আমরা যদি এই নকশা বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে আরবদের মাঝে এমন এক ভীতি ছড়িয়ে দিতে পারবো। যার ফলে তারা শুধু পালানোর পথ খুঁজবে। আমাদের পরিকল্পনা এমনভাবে বাস্তবায়ন করবো, যা ইতিপূর্বে পৃথিবীর মানুষ দেখেনি।” কথাগুলো বলে প্রধান মুনাহেম বেগান অট্টহাসিতে সরগরম করে ফেলে পুরো হলরুম। তারপর একটু থেকে বলে। আপনারা কী বলেন?

সবাই একবাক্যে বলে ওঠে। হ্যা, আমরা এই নকশা বাস্তবায়ন করার জন্য নিজের রক্ত বিলিয়ে দিবো। তবু আমাদের এই জমিন ছিনিয়ে আনবো মুসলমানের হাত থেকে ।

“শোনে রেখো হাগান-এর পক্ষ থেকে আমাদের আদেশ করা হয়েছে আমরা যেন খুব দ্রুত এর একটা সমাধান করি ।  আগামীকাল শেষরাতে এই অপারেশন করবো। সবাই প্রস্তুত থাকতে হবে। এ কথা কেউযেন জানতে না পারে। ইরগুন ও স্টার্নগ্যাঙ-ই এই অপারশনে অংশগ্রহণ করবে। এতে যে হাগান-এর সমর্থন আছে তাও গোপন থাকবে। এই কথাটা বলার কারণ একটাই-আপনারা যেন ভয় ও শঙ্কায় না ভুগেন ।

৯ এপ্রিল-১৯৪৮ ঈসায়ী। আকাশে ফকফকা চাঁদ। সারারাত মনোমুগ্ধকর জোছনা ঢেলে দেয় পৃথিবীর গায়ে। গলে গলে ঝরে যায়। আপ্লুত ধরাধাম শেষ রজনীতে পশ্চিম আকাশে এক স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে ডুবে যায় চাঁদ। পৃথিবী কেমন অসহায় । এক টুকরো শোক জমা হয় পৃথিবীর গায়ে। সে শোকের একটি রেশ রেখে যায় দিরইয়াসীন বস্তিতে। শেষ রাতের তাহাজ্জুদের এই সুখকর পরিবেশে হঠাৎ কেমন এক অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকে আবদুল কাদির। তাহাজ্জুদ নামায পড়ে একটু ধ্যানমগ্ন। এমন সময় নাকে শক্রর গন্ধ পান। লাফিয়ে উঠেন জায়নামায থেকে। চুপি চুপি সে সংবাদ ছড়িয়ে দেন দিরইয়াসীনের ঘরে ঘরে। দিরইয়াসীন তেলআবীর ও জেরুসালেমের মধ্যবর্তী একটি বস্তি। যা তেলআবীর ও কুদসের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম। জেরুসালেম প্রতিনিয়ত ইহুদিদের আক্রমণে শিকার হচ্ছে। আর দিরইয়াসীনের অকুতোভয় মুজাহিদরা আবদুল কাদির আল হোসাইনীর নেতৃত্বে প্রতিরোধ করছিলো ঈমানী শক্তিতে। ফলে ইহুদীদের কপালে ভাঁজ পড়ে।

দিরইয়াসীন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। ৯ এপ্রিল-১৯৪৮ ঈসায়ীর শেষ রাতে যখন সূর্য ঢলে যায় পশ্চিম কোলে । হারিয়ে যায় পৃথিবীর আলো । এমনি এক নিস্তব্ধ ও নিঝুম সময়ে পৃথিবীর কুখ্যাত সন্ত্রাসী দল ইরগুন ও স্টার্নগ্যাঙ তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে দিরইয়াসীকে। পশ্চিম দিকের রাস্তা লোলা রাখে ফাঁদ হিসাবে।

ইরগুন ও স্টার্নগ্যাঙ দুটি দল মুনাহেম বেগীন ও আইজ্যাক শ্যামিরের নেতৃত্বে ঝাপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত গ্রামবাসীর উপর। বুকে বড় আশা । আজ দিরইয়াসীনের সাহসী মুসলমানকে কচুকাটা করবে বিনা বাধায় বিনা প্রতিরোধে। কিন্তু আবদুল কাদিরের নেতৃত্বে জাগ্রত মুজাহিদ বসে থাকেনি। তারা শত্রুদের আশার আলোতে হতাশার কালো মেঘ হয়ে দাঁড়ায় । যার যা আছে তা নিয়ে প্রতিরোধ করে। ছোট-বড়, শিশু-কিশোর কেউ বাদ পড়েনি এই জিহাদ থেকে ।

সময় বয়ে যায়। কোনো সুবিধা করতে পারে না ইসরাঈলের সন্ত্রাসী যোদ্ধারা। উভয়পক্ষের যুদ্ধের ডঙ্কা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। সময় যতোই বয়ে যায় সন্ত্রাসীদের মনে হতাশার মেঘপুঞ্জিভূত হয়। পশ্চিম আকাশে সূর্য ওঠে যথাসময়ে। যুদ্ধের দামামা বেজে চলছে তো চলছে। একদিকে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ইরগুন ও স্টার্নগ্যাঙের দল আর অন্যদিকে নিরস্ত্র জাগ্রত মুজাহিদ। ক্রমেই আকাশে ঝলসানো সূর্য দৃঢ়তার সঙ্গে রাগ ঝাড়তে থাকে। সে সঙ্গে মরদে মুজাহিদরাও ঈমানী শক্তি প্রয়োগে কিঞ্চিত অলসতা বা অবহেলা করেনি। যুগের খালেদরা জাগ্রত হয়েই লড়ে যেতে থাকে। এক সময় সূর্য মধ্যাহ্ন পেরিয়ে যায় । ঢলে যায় কিঞ্চিত। ততক্ষণে ইরগুন ও স্টার্নগ্যাঙের চারজন নিহত হয়। চল্লিশ আহত । শহীদ হয় ১৫ জন আরব শিশু-নারী-পুরুষ।

ইরগুন ও স্টাগ্যাঙ দিশেহারা। অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধ । যেখানে আশা ছিলো ঘুমন্ত মুসলামানকে শেষ করে দেয়া। সেখানে তাদের জীবন নিয়েই শঙ্কীত। ইরগুন ও স্টার্নগ্যাঙ বাধ্য হয়ে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠায় কুদসের নিকটবর্তী বালমাখ সেনাছাউনীতে। সন্ধ্যার আগে সাহায্য এসে যায়। ততক্ষণে ইরগুন ও স্টার্নগ্যাঙের দশজন নিহত ও পঞ্চাশজন আহত। শুরু হয় নির্বিচারে মর্টারশেল বর্ষণ। টানা দুদিন সে যুদ্ধ চলে । আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মোকাবেলায় নিরস্ত্র মুজাহিদ। বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় দিইয়াসীন। নেমে আসে কেয়ামতের বিভীষিকা। যা কল্পনা করা যায় না। আশিজন যুবককে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। বয়স্ক বুড়োদের চুলদাড়ি কেটে নগরীর গলিতে গলিতে ঘুরায়। শিশুদের প্রাচীরের উপরে তুলে হত্যা করা হয়। শুরু হয় জয়োল্লাস । বড় বড় কূপগুলো লাশে ভরপুর হয়ে যায়।

নির্ভীক কিশোর ইকরামা দাঁড়িয়ে থাকে। তার সামনে বিশাল প্রাচীর । সুউচ্চ । শিশুদের সে প্রাচীরে উঠানো হচ্ছে। ফেলে দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে একে একে। সে চেয়ে চেয়ে দেখে এ মর্মান্তিক দৃশ্য। বুকে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। চোখের সামনে বাবা-মা ও বড় ভাই হারানো বেদনা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে। চুষে নিচ্ছে শরীরের খুন। হাতের পেশিগুলো কেমন জমে যাচ্ছে ক্রমেই।

একসময় ইকরামার পালা আসে । প্রাচীরে তুলে নেয়া হয় তাকেও। জয়োল্লাসে কেঁপে ওঠে আকাশ-বাতাস। দিরইয়াসীন সাহসী কিশোরের মুখ থেকে ভেসে আসে জ্বালাময়ী শেষ বাক্য-“আমাদের রক্তের প্রতিটি বিন্দু তোমাদের জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা হয়ে ফিরে আসবে আলকুদসের পবিত্র ভূমিতে”। তার কথা ছড়িয়ে পড়ে ইহুদিরে কর্ণকুহুরে। ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে পড়ে নগর থেকে নগরে। শহর থেকে শহরে। সাহসী উচ্চরণের ফলে তার হত্যার দৃশ্য দেখতে জমা হয় নরপশুরা। জয়োল্লাস হয় ক্ষণে ক্ষণে। চতুর্দিকে হাসি-ঠাট্টার এক স্রোত বইতে থাকে। ক্রমেই প্রাচীরে থেকে ফেলে তাকে হত্যা করার সময় ঘনিয়ে আসে। কিশোর ইকরামার চোখে ফের ভেসে ওঠে- বাবা-মা-ভাইয়ের হত্যার দৃশ্য। ভেসে আসে শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের হত্যার নির্মম চিত্র । তার হাতের পেশিগুলো আবার সচল হয়। তাকে ওঠানো হয়। বুঝে আসার আগেই সে ঝাপটে ধরে নিক্ষেপকারীকে। সঙ্গে সঙ্গে নিক্ষেপকারীকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাচীর থেকে। কেউ কিছু বুঝার আগে সাহসী কিশোর ইকরামা তার সাধ্যানুযায়ী প্রতিশোধ নেয়। জাগিয়ে দেয় বিবেক। যতোটুকু সম্ভব সে দেখিয়ে দেয়- সাহসী মানুষের নমুনা। মুহূর্তে সকল জয়োল্লাস থেমে যায়। থেমে যায় বিজয়ে অসি। সেখানে জমা হয় কালবৈশাখীর কালো মেঘ। ক্রমেই তা ঘাঢ় হয়…।

Related posts

Top