সুদের সামাজিক কুপ্রভাব; ইসলামের বিধান

কুরআন মাজীদে সুদের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘রিবা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূলে রয়েছে আরবী ভাষায় ر ب و তিনটি হরফ। এর অর্থের মধ্যে বেশী, বৃদ্ধি, বিকাশ, চড়া প্রভৃতি ভাব নিহিত। যেমন, ربا (রাবা)অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া ও বেশী হওয়া। ইসলামী শরীয়ায় লেনদেনের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তানুযায়ী শরীয়াহ সম্মত কোনরুপ বিনিময় ব্যতীত মূলধনের উপর অতিরিক্ত যা কিছু গ্রহণ করা হয় তাকে সুদ বলে। তাফসীরবিদ ইবনে জারীর মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণনা করেন, জাহেলিয়াত আমলে প্রচলিত ও কোরআনে নিষিদ্ধ ‘রিবা’ হলো কাউকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ঋণ দিয়ে মূলধনের অতিরিক্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা। আরবরা তাই করতো এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সুদ বাড়িয়ে দেবার শর্তে মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া হতো

সুদ হচ্ছে শোষণের হাতিয়ার। এজন্য ইসলামে ‘সুদ’কে সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুদ গরীবকে আরো গরীব করে দেয় এবং ধনীকে আরো ধনী হবার ব্যবস্থা করে দেয়। তাই সুদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের অসংখ্য কুফল। অষ্টম হিজরীতে সুদ হারাম হওয়া সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধি বিধান অবতীর্ণ হয়। পবিত্র কুরআনে ৭টি আয়াত দ্বারা এবং ৪০টিরও অধিক হাদীস এবং ইজমা দ্বারা সুদের নিষিদ্ধতা প্রমাণিত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেছেন : الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لاَ يَقُومُونَ إِلاَّ كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُواْ إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَن جَاءهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَىَ فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَـئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ অর্থাৎ, “যারা সুদ খায় তারা কিয়ামতের দিন (কবর থেকে) ঐ ব্যক্তির ন্যায় ওঠবে যাকে শয়তান আছর করে মাতাল করে দিয়েছে। এ ধরনের শাস্তির কারণ এই যে, সুদখোর লোকেরা বলত, বেচা-কেনাতো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ তা’আলা বেচা কেনাকে হালাল করেছেন আর সুদরকে করেছেন হারাম। সূরা আল বাক্বারাহ-২৭৫।

ব্যবসায় ও রিবার মধ্যে নীতিগত পার্থক্য: আমরা যাতে ব্যবসা ও সুদের মদ্যে সামঞ্জস্য করে না ফেলি সেজন্য এদুয়ের মাঝে পার্থক্য জেনে রাখা জরুরী। ব্যবসা বলতে বুঝায় যেখানে ক্রেতা বিক্রেতা দু’টি পক্ষ আছে। বিক্রেতা একটি বস্তু বিক্রির জন্য পেশ করে। ক্রেতা ও বিক্রেতা মিলে বস্তুটির একটই মূল্য স্থির করে। এ মূল্যের বিনিময়ে ক্রেতা বস্তুটি কিনে নিয়ে নেয়। এ ক্ষেত্রে বিক্রেতা নিজে পরিশ্রম করে এ অর্থ ব্যয় করে ঐ বস্তুটি তৈরী করেছে অথবা সে কোথাও থেকে বস্তুটি কিনে এনেছে-এ দুটির যে কোন একটি অবস্থার অবশ্যিই সৃষ্টি হয়। এ উভয় অবস্থায়ই সে বস্তুটি কেনার বা সংগ্রহ করার ব্যাপারে নিজের যে মুলধন খাটিয়েছে,তার সাথে নিজের পরিশ্রমের অধিকার সংযুক্ত করে এবং এটিই তার মুনাফা।

অন্য দিকে রিবা বলতে বুঝায়,এক ব্যক্তি নিজের মূলধন অন্য একজনকে ঋন দেয়। এ সংগে শর্তে আরোপ করে যে,একটি নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋন গ্রহীতাকে মূলধনের চেয়ে একটি নির্দ্দিষ্ট পরিমান বেশী অর্থ আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মূলধনের বিনিময়ে বাড়তি অর্থ লাভ করা হয়—পূর্বাহ্নে একটি শর্ত হিসেবে যেটিকে নির্দ্দিষ্ট করা হয়ে থাকে। এ বাড়তি অর্থের নাম সুদ বা রিবা। এটি কোনো বিশেষ অর্থ বা বস্তুর বিনিময় নয় বরং নিছক অবকাশের বিনিময়। যদি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারিত হবার পর ক্রেতার নিকট শর্ত পেশ করা হয় যে, মূল্য আদায় করতে (মনে করুন) এক মাস দেরী হলে মূল্য একটি নির্দ্দিষ্ট হারে বেড়ে যাবে,তাহলে এ বৃদ্ধি সুদের পর্যায়ভুক্ত হবে।

কাজেই নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মোকাবেলায় শর্ত সাপেক্ষে মূলধনের উপর যে নির্দ্দিষ্ট পরিমান বাড়তি অর্থ গ্রহন করা হয় তাকেই সুদ বলা হয়। যদি কোন জাতি নিজেদের উন্নতি চায় এবং অন্যান্য জাতিসমূহের সাথে নিজেদের সমৃদ্ধশালী জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে প্রথমেই সুদী লেনদেন বর্জন করা ও ইসলামী অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আঁকড়ে ধরা এবং অবাধ ও স্বচ্ছ লেনদেনের সুব্যবস্থা করা।

সুদের কুপ্রভাব: সুদের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়তে গিয়ে মানসিক দিক থেকে অপরিসীম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সুদর গ্রহণের ফলে অন্তর এমনই পাষাণ হয়ে যায় যে, কারো প্রতি কোন মায়া মমতা থাকে না। কারো বিপদে সুদখোরের মনে সহানুভূতি জাগে না। এমনকি আপন আত্মীয়ের কাছ থেকেও সুদ গ্রহণ করতে তার বিবেক বাধা দেয় না। এজন্য বলতে চাই সুদ বর্জনেই হলো উন্নতির বিকল্প পথ। সুদের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দিয়ে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে অস্থায়ী সুখ লাভ করা যেতে পারে কিন্তু সাদকার মাধ্যমে শুধুমাত্র অস্থায়ী সুখই লাভ হবে না বরং সাদাক্বাহ্ পরকালের দীর্ঘ ও চিরস্থায়ী সুখ শান্তি বয়ে আনবে।
সুদখোর কঠোর নিষ্ঠুর, নির্মম ও নির্দয়। দরিদ্র জনগণের প্রতি তাদের মায়া মমতা ও সহানুভূতির লেশমাত্র নেই। তাই সমাজের অসহায় ও রগীব লোকেরা সুদখোরদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে বাহ্যিক ভয় করে বটে, কিন্তু সম্মান করে না। ভয় ও সম্মান এক জিনিস নয়। এদেরকে ভয় করার কারণ তারা কারো কোন ক্ষতি করতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু সমাজের কোন স্তরেই তাদের সম্মান নেই। সবাই তাদেরকে ঘৃণা করে। সুতরাং সুদখোরদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে পৃথিবীর কোথাও সুদখোরদের সুখে সম্মানে নেই। পক্ষান্তরে যারা হালাল পন্থায় জীবিকা উপার্জন করেন এবং দান খয়রাত করেন, তারা সুখ শান্তি ও সম্মান নিয়ে বসবাস করছেন। তাদেরকে কখনো ধন-সম্পদের পিছনে দিশেহারা হয়ে ঘুরতে দেখা যায় না। তাদের সুখ শান্তি হয়তো কম। তাদের বাহ্যিক চাকচিক্য হয়তো নেই কিন্তু স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে তারা সুখ শান্তিতে আছে। আর এটাই হলো প্রকৃত সুখ।

সুদ সম্পর্কে ইসলামের বিধান: হজরত জাবির (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সা.) সুদ গ্রহীতা, দাতা ও সুদি কারবারের লেখক এবং সুদি লেনদেনের সাক্ষী— সবার ওপর লানত করেছেন। (মুসলিম, হাদিস ৪১৩৮)।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে: يَمْحَقُ اللّهُ الْرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللّهُ لاَ يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ আল্লাহতায়ালা সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং দান-সাদকাকে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহতায়ালা কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত ২৭৬)।

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: ‘আর তোমরা যে সুদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলত আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে জাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টির কামনা করে (তা-ই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগণ সম্পদপ্রাপ্ত। (সুরা রুম, আয়াত ৩৯)।

রসুল (সা.) ইরশাদ করেন : সুদের গুনার সত্তরটি স্তর রয়েছে, তার মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে আপন মাকে বিয়ে (মায়ের সঙ্গে জিনা) করা। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৭৪)।

এ জঘন্য কাজের শাস্তি কতটা ভয়াবহ হবে তার চিত্র আল্লাহ তায়ালাই কুরআনে উপস্থাপন করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে : الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لاَ يَقُومُونَ إِلاَّ كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُواْ إِنَّمَا الْبَيْعُ مِثْلُ الرِّبَا وَأَحَلَّ اللّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا فَمَن جَاءهُ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّهِ فَانتَهَىَ فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَـئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ যারা সুদ খায়, তারা তার মতো (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, বেচাকেনা সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হলো, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাওয়ালা। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী-জাহান্নামি। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। (সুরা বাকারা, আয়াত ২৭৫)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে: فَإِن لَّمْ تَفْعَلُواْ فَأْذَنُواْ بِحَرْبٍ مِّنَ اللّهِ وَرَسُولِهِ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لاَ تَظْلِمُونَ وَلاَ تُظْلَمُونَ আর যদি তোমরা সুদ পরিত্যাগ না কর তবে আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। আর যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের জুলুম করা হবে না। (সুরা বাকারা, আয়াত ২৭৯)।

সুদ খাওয়া বা দেওয়া আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করার নামান্তর। যারা সুদের লেনদেন করবে তারা অভিশপ্ত। কিন্তু আল্লাহ অধিক দয়ালু। তিনি আমাদের রক্ষার জন্য হাজারো পথ রেখে দিয়েছেন। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অপরাধ হয়ে গেলেও আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য তওবার পথ রেখে দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত রাখুন। আমীন।

Top