সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণকেন্দ্রিক নানাবিদ কু-প্রথা ও কুসংস্কার এবং ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

সূর্যগ্রহণ  : চাঁদ যখন পরিভ্রমণরত অবস্থায় কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন পৃথিবীর কোন দর্শকের কাছে সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায় (কিছু সময়ের জন্য)। এই ঘটনাকে সূর্যগ্রহণ বলা হয়। আমাবশ্যার পরে নতুন চাঁদ উঠার সময় এ ঘটনা বেশি ঘটে। পৃথিবীতে প্রতি বছর অন্তত দুই থেকে পাচঁটি সূর্যগ্রহণ পরিলক্ষিত হয়। এর মধ্যে শূন্য থেকে দুইটি সূর্যগ্রহণ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়। আরবিতে এর নাম কুসুফ। ইংরেজীতে একে Solar eclipse বলে। [উইকিপিডিয়া]

চন্দ্রগ্রহণ : পৃথিবী তার পরিভ্রমণ অবস্থায় চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে এলে কিছু সময়ের জন্য পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরল রেখায় অবস্থান করতে থাকে। তখন পৃথিবী পৃষ্ঠের মানুষ/প্রাণীদের থেকে চাঁদ কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাকে চন্দ্রগ্রহণ বলে। আরবিতে খুসুফ এবং ইংরেজীতে Lunar eclipse বলে। [উইকিপিডিয়া]

ইতিহাসের পাতা থেকে

সূ্র্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হলো ঐতিহাসিকদের জন্য একটি মূল্যবান রিসোর্স বা ব্যাপার।যার মধ্যে তারা কিছু্ ঐতিহাসিক ঘটনাকে গ্রহন করেন (ঐ তারিখের সাথে বিশষভাবে সম্পৃক্ত করে), যেখান থেকে অন্য কোন দিন অথবা আদিমকালের কোন ক্যালেন্ডারের ব্যাপারে ধারনা বা অনুমান করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৬৩ এর ১৫ জুনে একটি সূর্য গ্রহনের কথা উল্লেখিত হয়েছিল একটি অ্যাসেরিয়ান লিপিতে, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ আদিম প্রাচ্যের কালপঞ্জির জন্য। সেখানে পূর্বের আরো অন্যান্য সূর্য গ্রহনের তারিখও দাবী করা হয়। ৪০০০ বছর আগে সম্রাট জং কং দু’জন জ্যের্তিবিদকে শিরোচ্ছেদ করেছিলেন, তারা হলেন হিসি এবং হো- যারা একটি সূর্য গ্রহনের ভবিষ্যৎদ্বানী করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে ধরে নেয়া হয়। সম্ভবত সবচেয়ে আগের এখনো অপ্রমানিত ব্রুস মাসির দাবি, যিনি কথিতভাবে একটি গ্রহণকে লিংক করেন, যা হয়েছিল ২৮০৭ খ্রিস্টপূর্বের ১০ মে-তে, কতিপয় প্রাচীণ বন্যার পুরা কথার ভিত্তিতে ভারতীয় মহাসগরে একটি সম্ভাব্য উল্কা-প্রভাবের বিবেচনায়, যেখানে উল্লখ আছে একটি সম্পূর্ন সূর্য গ্রহনের কথা। গ্রহনকে বিবেচনা করা হয় পূর্বাভাস বা ভবিষ্যদ্বানীর উপলক্ষ্য হিসেবে।প্রাচীন গ্রীক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস লিখেছিলেন যে, মিলেটাসের থেইলস একটি গ্রহনের ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন যা হয়েছিল মেডিয়ান্স ও লেডিয়ানসের মধ্যে চলমান একটি যুদ্ধ চলার মধ্য কালে।এক্লিপস বা গ্রহনেল কারনে যুদ্ধের উভয় পক্ষ অস্ত্র নামিয়ে রাখলো এবং শান্তির ঘোষনা দিলো। এই এক্লিপস বা গ্রহনটা ঘটালো অবশিষ্ট অনিশ্চয়তা, যদিও এই ব্যাপারটা পঠিত হয়েছে শত শত প্রাচীন ও আধুনিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা। একটি সম্ভাব্য প্রার্থনা বা আকাঙ্খা সংগঠিত হলো ৫৮৫ খ্রিষ্টপূর্বের ২৮ মেয়েতে। সম্ভবত হেলিস নদীর কাছে এশিয়া মাইনোরে। হেরোডোটাস গ্রীসদের বিরুদ্ধে জারজেক্স এর একটি অভিযানের পূর্বে একটি এক্লিপস বা গ্রহন চিহ্নিত করেছেন, যার তারিখ ক্ষন করা হয়েছিল ৪৮০ খ্রিষ্টপূর্বে, যা মিলে গিযেছিল জন রাসেলের দ্বারা চিহ্নিত একটি বলয়াকার সূর্য গ্রহনের সাথে, যা ঘটেছিল ৪৭৮ খ্রিস্টপূর্বের ১৭ ফেব্রেয়ারিতে।

এছাড়াও একটি আংশিক এক্লিপস দেখা গিয়েছির পারস্য থেকে, যা ঘটেছিল ৪৮০ খ্রিষ্টপূর্বের ২ অক্টোবর। হেরোডোটাস স্পার্টায় একটি সূর্য গ্রহনের কথা বলেন, যখন পারস্যদের গ্রীক দ্বিতীয় আগ্রাসন চলছিল।গ্রহনের তারিখটা (১ আগস্ট, ৪৭৭ খ্রিস্টপূর্ব) ঐতিহাসিকদের দ্বারা গৃহিত আক্রমনের প্রথাগত তারিখের সাথে সঠিক ভাবে মিলেনা। চিনাদের গ্রহন রেকর্ড করার কাজ শুরু হয় প্রায ৭২০ খিস্টপূর্বে । খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে জ্যোর্তিবিজ্ঞানী সি সেন বর্ননা করেন যে কিভাবে চন্দ্র ও সূর্যের আপেক্ষিক অবস্থান বিবেচনা করে গ্রহনের (সূর্য বা চন্দ্র) ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বানী করা হয়।রেডিয়েটিং ইনফ্লুয়েন্স তত্ব বা বিকিরণ প্রভাব তত্ত্ব ( চাদের আলো হচ্ছে সূর্যের আলোর প্রতিফলন) খ্রিষ্টপূর্ব ৬ শতাব্দী থেকে ( জি নি জি এর জি রান)চীনাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল।এই চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে ছিলেন ১ম খ্রিস্টাব্দের দার্শনিক ওয়াং চং, যিনি তার লেখায় পরিস্কার করে তোলেন যে এই তত্ব নতুন কিছু না। প্রাচীন গ্রীক যেমনঃ পারমেনিডেস এবং এরিস্টটলও এই থিওরিকে সমর্থন করেছিলেন যে, চাদের বিকিরনের কারন হচ্ছে প্রতিফলিত আলো।

গুড ফ্রাইডে-এর সঠিক দিন ক্ষন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে এভাবে যে, জিজেসের ক্রসিফিক্সন এর অন্ধকারময়তাকে পূর্ব ধারনা করে বর্নিত হয়েছে যে, সেটা ছিল একটি সূর্য গ্রহন। এর গবেষনা কোন চূড়ান্ত ফলাফল দিতে পারেনি। আর গুড ফ্রাইডেকে চিহ্নিত করা হয় ইহুদীদের বাৎসরিক শেষ পর্বের ভোজনের তারিখ হিসেবে, যা একটি পূরণ চন্দ্রের সময় সংগঠিত হয়েছিল।পরবর্তীতে ৬ষ্ঠ থেকে নবম ঘন্টা অর্থাৎ তিন ঘন্টা অন্ধকারচ্ছান্নতা বিদ্যমান ছিল, যা ছিল অনেক।অনেক বেশী অন্যান্য সূর্য গ্রহনের চেয়ে বেশী যে, সবোর্চ্চ সময় সীমা হচ্চে ৮ মিনিট যেকোন সূর্য গ্রহনের জন্য সর্বমোট। পশ্চিমা গোলার্ধে বা ভূ-অংশে কিছু নির্ভরযোগ্য গ্রহনের রেকর্ড পাওয়া যায় ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত, মধ্যযুগের প্রথম দিকে আরবদের আগমন ও মঠ পর্যবেক্ষন হওয়া না পর্যন্ত। প্রথম করোনা বা আলোকমন্ডলের পর্যবেক্ষন চিহ্নিত হয় ৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে, যা সংগঠিত হয়েছিল কনস্ট্যান্টিনোপলে। পর্যবেক্ষন হয় একটি সম্পূর্ন সূর্য গ্রহনের প্রথম টেলিস্কোপিক পর্যবেক্ষন হয় ফ্রান্সে ১৭০৬ সালে।

নয় বছর পরে ১৭১৫ সালের ৩ মেয়েতে ইংলিশ জ্যোর্তিবিজ্ঞানী এডমুন্ড হ্যালি একটি সূর্য গ্রহন পর্যবেক্ষন করেন।মধ্য ১৯ শতক থেকে সূর্যের বৈজ্ঞানিক বুঝাপড়ার উন্নতি হচিছল সূর্যের আলোকমন্ডলের পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে, যখন সূর্য গ্রহন ঘটে। ১৮৪২ সালে করোনা বা আলোকমন্ডলকে চিহ্নিত করা হয় সূর্যের বাযুমন্ডলের অংশ বিশেষ হিসেবে। আর একটি সম্পূর্ন গ্রহনের ফটোগ্রাফ তোলা হয় ১৮৫১ সালের ২৮ জুলাইয়ের সূর্যগ্রহণের সময়। ১৮৬৮ সালের সূর্য গ্রহনের সময় বর্নালীবিক্ষন বা স্পেক্ট্রোস্কোপ পর্যবেক্ষন কেরা হয়, যা সূর্যের রাসায়ানিক উপদানের মিশ্রন বা রাসায়নিক গঠন নির্ধারনে সাহায্য করে। [http://en.wikipedia.org/wiki/Solar_eclipse]

আল-কোরআনে সূর্য-সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্র-চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা

পবিত্র কোরআনে সরাসরি সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পের্কে আলোচনা-বর্ণনা ইরশাদ হয়নি। তবে সূর্য ও চন্দ্র বিষয়ক এমন অনেক বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা এসেছে যার মাঝে মহান আল্লাহর এই নির্দশনের আলোচনার উৎস খুজে পাওয়া যায়।

১. আলোর একমাত্র উৎস হিসেবে সূর্য  : আর আমি নির্মাণ করেছি তোমাদের ওপর সুদৃঢ় সপ্ত (আকাশ) এবং স্থাপন করেছি (তন্মধ্যে) একটি উজ্জ্বল প্রদীপ। [নাবা, ৭৮ : ১২-১৩]

তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে এবং তন্মধ্যে চন্দ্রকে স্থাপন করেছেন আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে। [নূহ, ৭১ : ১৫-১৬]

ব্যাখ্যা : এই আয়াতগুলিতে কোরান মাজিদ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা দেয় যে, আমাদের সৌরজগতের জন্যে সূর্যই একমাত্র আলোর উৎস। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, চন্দ্র আলোর উৎস নয়, বরং সূর্যের আলোর প্রতিফলন মাত্র। কোরান মাজিদ এই সত্যের বর্ণনা দিয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার মাধ্যমে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করার বহু শতাব্দী পূর্বে। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

২. চন্দ্র ও সূর্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতি : তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি সূর্যকে বানিয়েছেন একটি জ্যোতিষ্ক এবং চন্দ্রকে আলোকরূপে। আর নির্ধারণ করেছেন তার জন্য মনজিলসমূহ। যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা ও (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ তা সৃষ্টি করেন না, তবে যথার্থভাবে। তিনি (এভাবে) বিবৃত করেন (তাঁর) নিদর্শনসমূহ বিস্তারিতভাবে, সেসব লোকের জন্যে যারা অনুধাবন করে। [ইউনূস, ১০ : ০৫]

শপথ, সূর্যের এবং তার কিরণের। শপথ, চন্দ্রের যখন তাকে প্রতিফলিত করে। [শামস, ৯১ : ১-২]

ব্যাখ্যা : লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, বাইবেল চন্দ্র ও সূর্যকে সব সময় সমজাতীয় শব্দে উল্লেখ করেছে। যথা Light (বাতি)। এটি সূর্যের আগে greater (বৃহত্তর) বিশেষণ যোগ করে এবং চন্দ্রের আগে Lower (ক্ষুদ্রতর)। তাতে আছে, ‘বৃহত্তর বাতি দিন নিয়ে আসে এবং ক্ষুদ্রতর বাতি নিয়ে আসে রাত।’ (জেনেসিস, ১ : ১৭)  যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরান মাজিদ বাইবেল থেকে নকল করতেন, যেমনটি কিছু খৃস্টান অপবাদ দিয়ে থাকে, তিনিও সূর্য ও চন্দ্রের জন্য একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করতেন। যাহোক, কোরান মাজিদ এই সূর্য ও চন্দ্রের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছে। একটিকে বলা হয়েছে, ‘নূর’ (আলো), যা চন্দ্রকে নির্দেশ করে। অন্যটিকে বলা হয়েছে ‘জিয়া’ (জ্যোতিষ্ক), যা নির্দেশ করে সূর্যকে। এভাবে কোরান মাজিদ এ কথার স্বীকৃতি দিয়েছে যে, সূর্য হল আলোর উৎস এবং চন্দ্র কেবল তার আলোকেই প্রতিফলিত করে। বিজ্ঞানীরা এই সত্যকে আবিষ্কার করেছে মহাকাশ বিজ্ঞানের জ্ঞান-ভান্ডারের উৎকর্ষ সাধনের পর। অথচ কোরান মাজিদ এই বর্ণনা প্রদান করেছে বহু শতাব্দী পূর্বে। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

৩. তাপের একমাত্র উৎসরূপে সূর্য : কল্যাণময় তিনি, যিনি নভোমন্ডলে সৃষ্টি করেছেন নক্ষত্রপুঞ্জ এবং তাতে স্থাপন করেছে সূর্য ও দীপ্তিময় চন্দ্র। [ফুরকান, ২৫ : ৬১]

তোমরা কি দেখতে পাও না কীভাবে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন সপ্ত আসমান, একটির ওপর আরেকটি এবং তাতে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোকরূপে এবং সূর্যকে প্রদীপরূপে। [নূহ, ৭১ : ১৫-১৬]

ব্যাখ্যা : কোরান মাজিদের প্রতিটি শব্দেরই রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ। প্রয়োজন আমাদের সতর্ক মনোযোগ। সূর্য ও চন্দ্রের জন্য দু’টি ভিন্ন ভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করার পাশাপাশি-যেমনটি ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে- কোরান মাজিদে একটি বিশেষ পারিভাষিক শব্দ ‘মিসবাহ’ ও ব্যবহৃত হয়েছে, যার ভাষান্তর করা হয়েছে Lamp বা প্রদীপ শব্দের মাধ্যমে। জেনে রাখা উচিত, কোরান মাজিদ শব্দটি ব্যবহার করেছে কেবল সূর্যের জন্যে, চন্দ্রের জন্যে নয়। আমাদের জানা মতে, একটি Lamp বা প্রদীপ, যার থাকে কিছু জ্বালানি, যা জ্বলে এবং আলোর পাশাপাশি তাপ প্রদান করে। কোরান মাজিদ এভাবে বর্ণনা করে যে, সূর্য কেবল আলোরই উৎস নয়, বরং তাপেরও একটি উৎস।  আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি মাত্রেই লক্ষ্য করবেন, সুরা বাকারার (২য় সুরা) ১৭ নং আয়াতে আগুন থেকে নির্গত আলোর বর্ণনা দেয়ার জন্যে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হল ‘আজাআত’ (أضاءت) , তা ঠিক একই ধাতু বা ক্রিয়ামূল থেকে নির্গত হয়েছে, সূর্যের আলোর বর্ণনা দেয়ার জন্যে যে ‘জিয়া’ (ضياء) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা যেখান থেকে উৎকলতি হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, সূর্য থেকে যে আলোক-রশ্মি বিচ্ছুরিত হয় তা আলো ও তাপ উভয়ই ধারণ করে। পক্ষান্তরে চন্দ্র থেকে যে রশ্মি (নূর) আসে তা কেবল আলোই ধারন করে। কোরান মাজিদের এই বিস্ময়কর শব্দ নির্বাচন দেখে যে কাউকে পুনর্বার বিস্মিত হতে হবে। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

৪. সূর্যের গতি  : সূর্য তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ। [ইয়াসিন, ৩৬ : ৩৮]

ব্যাখ্যা : নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যের আবর্তন, যেমনটি উপরের আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে- বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। আমাদের ছায়াপথ একটি থালার আকৃতিতে বহু সংখ্যক নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে গঠিত। এই ছায়াপথে সেই থালার কেন্দ্র থেকে দূরে সূর্য একটি অবস্থান দখল করে আছে। ছায়াপথটি তার আপন অক্ষরেখার ওপর পরিক্রমণ করে, যা তার কেন্দ্র। ফলে তা সূর্যকে একই কেন্দ্রের চারপাশে একটি বৃত্তাকার কক্ষপথে আবর্তিত করে। ছায়াপথটি তার আপন অক্ষরেখায় তার আবর্তন শেষ করতে সময় নেয় ২৫০ মিলিয়ন বছর। সূর্য, এই আবর্তন সম্পন্ন করার প্রাক্কালে প্রতি সেকেন্ডে মোটামুটিভাবে ১৫০ মাইল বেগে পরিভ্রমণ করে। এটি সূর্যের নির্দিষ্ট গতিপথ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে- এতে কোনো সন্দেহ নেই যেমনটি কোরান মাজিদের এই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।  এটি সুনিশ্চিত যে, না মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর, আর না যারা তার চারপাশে ছিলেন তাদের কাছে সূর্যের পরিভ্রমণের এই সুনির্দিষ্ট জ্ঞান ছিল। কিন্তু    বাস্তবতা হল, এই তথ্যটি কোরান মাজিদে বর্ণিত হয়েছে মানুষ তা আবিষ্কার করারও বহু পূর্বে। যা এ কথার অন্য একটি সাক্ষ্য যে, সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাআলাই এই জ্ঞানের উৎস। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

৫. সূর্যের ভিন্ন ভিন্ন উদয়াচল ও অস্তাচল : তিনিই অধিপতি দুটি উদয়াচল ও দুটি অস্তাচলের। [রহমান, ৫৬ : ১৭]

নিশ্চয় তোমাদের মাবুদ এক। আসমানসমূহ, পৃথিবী ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা এবং পালনকর্তা উদয়াচলসমূহের। [সাফফাত, ৩৭ : ০৫]

আমি শপথ করছি উদয়াচল ও অস্তাচলসমূহের পালনকর্তার। [মাআরিজ, ৭০ : ৪০]

ব্যাখ্যা : কোরান মাজিদের উদ্ধৃত প্রথম আয়াত সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলি বলেন, দু’টি উদয়াচল হল সারা বছর সূর্য উদয়ের দু’টি প্রান্তসীমা। অনুরূপভাবে দু’টি অস্তাচল হল সূর্যাস্তের দু’টি চূড়ান্তত সীমা। কোরান মাজিদের এই সুরায় উল্লিখিত দ্বৈত সংখ্যার সঙ্গে দ্বৈততার সাধারণ আবহ সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্য দুইটি আয়াত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ভিন্ন ভিন্ন স্থান নির্দেশ করে। বিষুবরেখা থেকে কোনো ব্যক্তি যতই দূরে বসবাস করবে তার কাছে সূর্যের উদয়াচল ও অস্তাচলগুলি ততই সুস্পষ্ট হবে।  উল্লেখ্য যে, আরব উপদ্বীপ বিষুবরেখা থেকে ততদূরে অবস্থিত নয়, তাই এই বিভিন্নতার রহস্যটি সেখানে সহজে নির্ণয় করা যায় না। এ কথা বলাবাহুল্য যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদয়াচল ও অস্তাচলের এই বিভিন্নতা প্রত্যক্ষ করেন নি।  তবে কোরান মাজিদই সার্বজনীন বিস্ময়ের সত্যতা সুস্পষ্টভাবে উল্লখে রয়েছে। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

৬. সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথে পরিভ্রমণ : তিনিই (আল্লাহ তাআলা) সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকেই (নভোমন্ডলীয় বস্ত্তসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। [আম্বিয়া, ২১ : ৩৩]

সূর্যের জন্যে অনুমতি নেই যে তা চন্দ্রকে অতিক্রম করে যাবে। আর না রাত আগে চলে দিনের। তারা প্রত্যেকেই (নিজ নিজ) কক্ষপথে সন্তরণ করে। [ইয়াসিন, ৩৬ : ৪০]

ব্যাখ্যা : এসব আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ফালাক (فلك)। কুরআনের অধিকাংশ অনুবাদক এই শব্দের অনুবাদ করেছেন ‘কক্ষপথ’ (ইংরেজিতে Orbit)। স্মর্তব্য যে, মহাশূন্যে অবস্থানরত বস্ত্তসমূহ সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত হয়েছে টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কল্যাণে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরবদের কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না।  তথাপি একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা, সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথে পরিভ্রমণ, যা কি-না কোরান মাজিদে বিদ্যমান রয়েছে। এটি কোরান মাজিদের অন্য একটি মুজিঝা যে, তা গ্রহ-নক্ষত্রের বৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছে, মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় তা আবিষ্কার করার বহু পূর্বে। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

 ৭. সন্তরণের ভঙ্গিতে গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণ : তিনিই (আল্লাহ তাআলা) সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকেই (নভোমন্ডলীয় বস্ত্তসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। [আম্বিয়া, ২১ : ৩৩]

সূর্যের জন্যে অনুমতি নেই যে তা চন্দ্রকে অতিক্রম করে যাবে। আর না রাত আগে চলে দিনের। তারা প্রত্যেকেই (নিজ নিজ) কক্ষপথে সন্তরণ করে। [ইয়াসিন, ৩৬ : ৪০]

ব্যাখ্যা :  উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথীয় পরিভ্রমণের বর্ণনা দিতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘সাবাহা’ (سبح)। আরবিতে তা এমন গতিকে নির্দেশ করে যা নিজে নিজে হয়ে থাকে। অধিকাংশ কুরআনের অনুবাদক তার অনুবাদ করেছেন সাঁতার কাটা (ইংরেজিতে Swiming)। সূর্য ও চন্দ্রের এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতির এই ধারণাটি সাম্প্রতিক মহাকাশ বিজ্ঞানের তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা অভাবনীয় যে, একজন আরবি ব্যক্তি শত শত বছর আগে, বিশ্বের সবচে পশ্চাৎপদ অংশে বসে বিশ্বস্রষ্টার কাছে থেকে কোনো আসমানি নির্দেশনা ছাড়া গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণের বর্ণনার ক্ষেত্রে ‘سبح’ -এর মত এমন একটি সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে পারেন। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

৮. সূর্য ও চন্দ্রের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণ : তিনিই (আল্লাহ তাআলা) সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকেই (নভোমন্ডলীয় বস্ত্তসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। [আম্বিয়া, ২১ : ৩৩]

সূর্যের জন্যে অনুমতি নেই যে তা চন্দ্রকে অতিক্রম করে যাবে। আর না রাত আগে চলে দিনের। তারা প্রত্যেকেই (নিজ নিজ) কক্ষপথে সন্তরণ করে। [ইয়াসিন, ৩৬ : ৪০]

ব্যাখ্যা :  ইতোপূর্বে উল্লিখিত আয়াতসমূহে কোরান মাজিদ বর্ণনা করেছে যে, সূর্য ও চন্দ্র পরিভ্রমণরত অবস্থায় রয়েছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, যদি এই পরিভ্রমণ চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হত তবে কোরান মাজিদ তার বর্ণনা এই বলে দিত যে, ‘উভয়েই ঘূর্ণায়মান’। পক্ষান্তরে, এক্ষেত্রে কোরান মাজিদ যে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছে তা হল ‘কুল্লুন’ (كل)। যার অর্থ, সকলেই ঘূর্ণায়মান। পূর্বেকার তাফসিরবিদগণ এই ‘কুল্লুন’ শব্দের অর্থ পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারেন নি। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, মহাবিশ্বে সূর্য ও চন্দ্রের পাশে আরো কিছু গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে। এবং সেসব গ্রহ-উপগ্রহ পরিভ্রমণ অবস্থায় রয়েছে। কোরান মাজিদ এই সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছে বহু বছর পূর্বে। আরো লক্ষণীয় বিষয় হল, প্রত্যেক বস্ত্তই স্ব-স্ব কক্ষপথে সন্তরণ করে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় এও জানা যায়, কেবল গ্রহ-নক্ষত্রগুলিই নয় বরং তাদের কক্ষপথগুলিও সন্তরণ করে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তিনি আর কে হতে পারেন যিনি এমন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান কোরান মাজিদে সরবরাহ করেছেন? [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

৯. অন্যান্য গ্রহের জন্য চন্দ্র ও সূর্য : তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকে (মহাকাশীয় বস্ত্তসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণশীল। [আম্বিয়া, ২১ : ৩৩]

তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা কর না, চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সিজদা কর যিনি এগুলি সৃষ্টি করেছেন। [ফুসসিলাত, ৪১ : ৩৭]

তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন, একটির ওপর একটি এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন (উজ্জ্বল) প্রদীপরূপে। [নূহ, ৭১ : ১৫-১৬]

ব্যাখ্যা : ইংরেজি ও বাংলা ব্যাকরণে দু’ধরনের সর্বনাম ও ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়- একবচন ও বহুবচন। পক্ষান্তরে আরবি ব্যাকরণে একটি তৃতীয় রূপের সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়, যা কেবল ‘দুই’ নির্দেশ করে। এই দ্বি-বচনের রূপটি বহুবচনের রূপ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। (বহুবচন) যা ব্যবহৃত হয় দুইয়ের অধিক সংখ্যা নির্দেশ করার জন্যে। যারা আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত তারা স্বীকার করবেন যে, উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সূর্য ও চন্দ্রের জন্য যে ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদ ব্যবহৃত হয়েছে তা দ্বিবচনের রূপ নয়, বরং বহুবচনের রূপ।  কোরান মাজিদ এভাবে ইঙ্গিত করে যে, মহাকাশে সূর্য ও চন্দ্রের সংখ্যা কেবল দু’টি নয়, বরং অনেক।  মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে, এমন অনেক গ্রহ রয়েছে যাদের আছে একাধিক চন্দ্র (উপগ্রহ)। এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মহাকাশে আরো অনেক গ্রহজগত রয়েছে। এবং এ সকল জগতেও তাদের নিজস্ব সূর্য ও চন্দ্র রয়েছে। এটি কোরান মাজিদের আরো একটি মুজিঝা যে, তা সূর্য ও চন্দ্রের গতি বর্ণনার জন্যে সর্বনাম ও ক্রিয়ার ক্ষেত্রে দ্বিবচনের শব্দ ব্যবহার করে নি। বরং বহুবচনের শব্দ ব্যবহার  করেছে। প্রকৃতির সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও গবেষণা যার সাক্ষ্য বহন করে। [আল কুরআনের ১৬০ মুজিঝা, মূল- ড. মাজহার ইউ কাজী, অনুবাদ- মাওলানা ফয়জুল্লাহ মুজাহিরী, সম্পাদনা- ড. মাওলানা শামসুল হক সিদ্দিক, মাওলানা লিয়াকত আলী]

আল-হাদিসের আলোকে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ

১. মুগিরা ইবনু শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, “রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর দিনটিতেই সুর্যগ্রহণ হল। তখন আমরা সকলে বলাবলি করছিলাম যে, নবিপুত্রের মৃত্যুর কারনেই এমনটা ঘটেছে। আমাদের কথাবার্তা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, সুর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর অগণিত নিদর্শন সমুহের মধ্যে দুটি নিদর্শন, কারোর মৃত্যু কিংবা জন্মগ্রহণের ফলে চন্দ্রগ্রহণ বা সুর্যগ্রহণ হয়না”। [বুখারি : ১০৪৩, মুসলিম: ৯১৫ – আরবি সংস্করণ]

২. আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় একবার সূর্যগ্রহণ হলো। গ্রহণ শুরু হবার সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রুত মাসজিদের দিকে ধাবিত হলেন এবং সকলকে মাসজিদে আসতে আহবান জানালেন। তিনি নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ করলেন যে এই জামায়াতে আগে কখনো এমন করেননি। অতঃপর রুকূতে গেলেন এবং রুকূ এত দীর্ঘ করলেন যা আগে কখনো করেননি। অতঃপর  দাঁড়ালেন কিন্তু সিজদায় গেলেন না এবং দ্বিতীয় রাকায়াতেও কিরায়াত দীর্ঘ করলেন। অতঃপর আবার তিনি রুকূতে গেলেন এবং তা পুর্বের চেয়ে আরও দীর্ঘ করলেন। রুকূ সমাপ্ত হলে দাঁড়ালেন এবং এরপর সিজদায় গেলেন এবং তা এত দীর্ঘ করলেন যে, আগে কখনো এমনটা করেননি। অত:পর সিজদা থেকে দাঁড়িয়ে প্রথম দু’রাকা’আতের ন্যায় দ্বিতীয়বারও ঠিক একইভাবে নামাজ আদায় করলেন। ততক্ষণে সূর্যগ্রহণ শেষ হয়ে গিয়েছে। নামাজ সমাপ্ত হলে তিনি আল্লাহর হামদ (প্রশংসা) পেশ করে খুৎবা প্রদান করলেন, বললেন, সূর্য এবং চন্দ্র আল্লাহর অগণিত নিদর্শন সমূহের মধ্যে দু’টো নিদর্শন, কারোর মৃত্যু কিংবা জন্মগ্রহণের ফলে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না। অতএব, যখনই তোমরা চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করবে তখনই আল্লাহকে ডাকবে, তাঁর বড়ত্ব ও মহত্ব প্রকাশ করবে এবং নামাজে রত হবে। [বুখারি: ১০৪৪, মুসলিম: ৯০১– আরবি সংস্করণ]

৩. আমর ইবনু আওন (রহ.) আবূ বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবি (সা.) এর কাছে ছিলাম, এ সময় সুর্যগ্রহণ শুরু হয়। রাসূল (সা.) তখন উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের চাঁদর টানতে টানতে মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং আমরাও প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদেরকে নিয়ে সূর্য প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত দু’রাকাআত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করলেন। এরপর তিনি বললেন, কারো মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ কিংবা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন সূর্যগ্রহণ দেখবে তখন এ অবস্থা কেটে যাওয়া পর্যন্ত সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করবে এবং দু’আ করতে থাকবে। [বুখারি : ইফা সংস্করণ : ৯৮৩]

৪. শিহাব ইবনু আব্বাদ (রহ.) আবূ মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি (সা.) বলেছেন, কোন লোকের মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তবে তা আল্লাহর নিদর্শন সমূহের মধ্যে দুটি নিদর্শন। তাই তোমরা যখন সূর্যগ্রহন বা চন্দ্রগ্রহন হতে দেখবে, তখন দাঁড়িয়ে যাবে এবং সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করবে। [বুখারি : ইফা সংস্করণ : ৯৮৪]

৫. মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহ.) নুঁমান ইবনু বশীর (রা.) সূত্রে নবি (সা.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি একদিন অতি দ্রুত মসজিদ অভিমুখে বের হয়ে গেলেন, তখন সূর্যগ্রহণ লেগে গিয়েছিল। তারপর এমনিতে সালাত আদায় করলেন যে, সূর্য আলোকিত হয়ে গেল। তারপর তিনি বললেন, জাহেলি যুগের লোকেরা বলত যে, কোন মহান ব্যক্তির মৃত্যু ব্যতীত চন্দ্র-সৃর্যের গ্রহণ হয় না। অথচ কারো জন্ম মৃত্যুর কারণে চন্দ্র-সূর্যের। গ্রহণ হয় না, বরং তারা আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুসমূহের দুটি বস্তু। আল্লাহ তায়ালা তার সৃষ্টিতে যা যা ইচ্ছা নব নব সৃষ্টি করেন। অতএব সূর্য এবং চন্দ্রের কারো যদি গ্রহণ লেগে যায়, তবে তোমরা সালাত আদায় করতে থাকবে, তা আলোকিত হওয়া অথবা আল্লাহ তাআলার নতুন কোন ফয়সানা না হওয়া পর্যন্ত। [নাসায়ি : ইফা সংস্করণ : ১৪৯৩]

৬. আবূ আমির আশ-আরী আবদুল্লাহ ইবনু বাররাদ, মুহাম্মাদ ইবনুল আলী (রহ.) আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর যুগে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তিনি দাঁড়ালেন এ আশংকায় যে, কিয়ামতের মহাপ্রলয় বুঝি সংঘটিত হবে। তিনি (তাড়াতাড়ি) মসজিদে এলেন। অত্যন্ত দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু- ও দীর্ঘ সিজদার সঙ্গে সালাত আদায় করলেন। আমি আর কোন সালাতে কখনো এরুপ দেখিনি। এর পর তিনি (রাসুল) বলেন, আল্লাহর প্রেরিত এসব নিদর্শনাবলী কারো মৃত্যুর জন্য হয় না, কারো জন্মের জন্যও হয় না এবং তিনি এগুলো প্রেরণ করেন তাঁর বান্দাদের সতর্ক করার জন্য। যখন তোমরা এসব নিদর্শনাবলীর কিছু দেখতে পাও তখন তোমরা আতংকিত হৃদয়ে আল্লাহর জিকিকর, দোয়া ও ইস্তিগফারের মশগুল হও। [মুসলিম : ইফা সংস্করণ : ১৯৮৯]

৭. মূসা ইবনু মাসউদ (রহ.) আসমা বিনতে আবূ বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি (সা.) সূর্যগ্রহণের সময় গোলাম আজাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আলী (রহ.) দরাওয়ারদী (রহ.) সূত্রে হিশাম (রহ.) হাদিস বর্ণনায় মূসা ইবনু মাসউদ (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। [বুখারি : ইফা সংস্করণ : ২৩৫৩]


ইসলামের দৃষ্টিতে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণকে এতদুভয়ের ওপর একটি ক্রান্তিকাল হিসেবে গণ্য করা হয়। সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর মাখলুক তথা সৃষ্টবস্তু এবং এর প্রমাণস্বরূপই আল্লাহ এ দুটোর ওপর ‘গ্রহণ’ প্রদান করেন। ‘গ্রহণ’ সূর্য ও চন্দ্রের ওপর প্রযোজ্য আল্লাহর কুদরতের আলামত বা নিদর্শন বৈ অন্য কিছুই নয়, যদি বিভিন্ন ইতিহাসের গ্রন্থে এ সম্পর্কীয় নানাবিদ বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়। সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ সূর্য ও চন্দ্র পূজারিদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সতর্কবাণী পৌঁছে দেয় যে, এ দুটোও অন্যান্য মাখলুকের মতো আল্লাহর মাখলুক এবং এরা উপাসনাযোগ্য নয়। যেহেতু এরা নিজেরাই বিপদগ্রস্ত হয়, যা থেকে এরা আত্মরক্ষা করতে পারে না, সেহেতু এগুলো উপাসনার যোগ্য হতে পারে না। বরং এ দুটোকে আল্লাহকে চেনার নিদর্শন হিসেবে গণ্য করাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। আল্লাহ বলেছেন, ‘তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সেজদা করো না, আর চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সেজদা করো, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা নিষ্ঠার সঙ্গে শুধু তারই ইবাদত করে থাক। [সূরা হা-মিম আস সাজদাহ : ৩৭]

জাহিলি যুগে মানুষ ধারণা করত যে, বিশ্বে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যু কিংবা দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতির বার্তা দিতে সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণ হয়ে থাকে। ইসলাম এটাকে একটি ভ্রান্ত ধারণা আখ্যায়িত করেছে এবং ‘গ্রহণ’কে সূর্য ও চন্দ্রের ওপর একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল বা বিপদের সময় বলে গণ্য করেছে। এ জন্য সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় মুমিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন এ সময়ে অন্যান্য কাজকর্ম বন্ধ রেখে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ, দোয়া, সালাত আদায় প্রভৃতি আমল করে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনগুলোর দুটো নিদর্শন। এ দুটো কারও মৃত্যু কিংবা জন্মের জন্য ‘গ্রহণ’ হয় না; অতএব তোমরা যখন তা দেখবে তখন আল্লাহর নিকট দোয়া করবে, তকবির বলবে, সালাত আদায় করবে এবং সদকা করবে’ (বোখারি ও মুসলিম)।

সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার : ইসলাম কি বলে?

সূর্যগ্রহণ নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ধরনের কুসংস্কার আছে। ঐ সময়ে খেতে নেই, তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হয়, গর্ভবতী মায়েরা এই সময় যা যা করেন তার প্রভাব নাকি সন্তানের উপর পরে ইত্যাদি। সূর্যগ্রহণ দেখাও অনেকের কাছে নিষেধ। সূর্যকে গিলে ফেলা রাহুর ভয়ে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে বলে জ্যোতিষীরা দাবী করেন। আজকের দিনে আমরা যখন পরিষ্কার বুঝতে পারি পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে চাঁদ এসে যাওয়ার ফলে গ্রহণ হচ্ছে, তাই নতুন জীবাণুর জন্ম, রশ্মির বেশি প্রভাব ইত্যাদি প্রশ্ন অবান্তর। আর ইসলাম এই সব কুসংস্কারকে কখনোই গুরুত্ব প্রদান করেনি। কেবল সূর্যগ্রহণকেন্দ্রকই নয় ইসলাম কোনো প্রকারের কোনো কুসংস্কারকই সমর্থন করে না। রাসুল [সা.] -এর কয়েকটি হাদিস দ্বারা সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্কারভাবে প্রতিয়মান, এমনকি সূর্যগ্রহণের সাথে কারো জন্ম-মৃত্যুকে জাড়ানোর ক্ষেত্রেও রাসুল [সা.] নিষেধাঙ্গা আরোপ করেছেন। সুতরাং সূর্যগ্রহণের সময়ে খেতে নেই, তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হয়, গর্ভবতী মায়েরা এই সময় যা যা করেন তার প্রভাব নাকি সন্তানের উপর পরে ইত্যাদি কথাকে ঝেড়ে ফেলে মুমিন-মুসলিম হিসেবে আমলে মশগুল হওয়া উচিত।

সূর্যগ্রহণ দেখে ভীত-শঙ্কিত হতেন রাসুল [সা.]

সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ দ্বারা আল্লাহ তার বান্দাদের ভীতি প্রদর্শন করেন বলেও হাদিসে উল্লেখ আছে, যাতে মানুষ ঈমান ও আমলমুখী হয় এবং পাপাচার বন্ধ করে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, একদা সূর্যগ্রহণ হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) ভীত হয়ে মসজিদে প্রবেশ করে দীর্ঘ সালাত আদায় করে বললেন, ‘এ হচ্ছে একটি নিদর্শন, যা আল্লাহ প্রেরণ করেন। এটা কারও মৃত্যু কিংবা জন্মের জন্য সংঘটিত হয় না; বরং এর দ্বারা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ভীতি প্রদর্শন করেন। তোমরা যখন এর কোনো কিছু দেখবে তখন ভীত মনে তাঁর (আল্লাহর) জিকির, দোয়া ও তার ক্ষমা প্রার্থনার দিকে দ্রুত গমন করবে’। [বোখারি ও মুসলিম]

আধুনিক সৌর বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহ দু’টির কক্ষপথের মধ্যবলয়ে রয়েছে এস্টিরয়েড (Asteroid), মিটিওরিট (Meteorite) ও উল্কাপিন্ড প্রভৃতি ভাসমান পাথরের এক সুবিশাল বেল্ট, এগুলোকে এককথায় গ্রহানুপুঞ্জ বলা হয়। গ্রহানুপুঞ্জের এই বেল্ট (Belt) আবিষ্কৃত হয় ১৮০১ সালে। এক একটা ঝুলন্ত পাথরের ব্যাস ১২০ মাইল থেকে ৪৫০ মাইল। বিজ্ঞানীরা আজ পাথরের এই ঝুলন্ত বেল্ট নিয়ে শঙ্কিত। কখন জানি এ বেল্ট থেকে কোন পাথর নিক্ষিপ্ত হয়ে পৃথিবীর বুকে আঘাত হানে, যা পৃথিবীর জন্য ধ্বংসের কারণ হয় কিনা? গ্রহানুপুঞ্জের পাথর খন্ডগুলোর মাঝে সংঘর্ষের ফলে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথরখন্ড প্রতিনিয়তই পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে।কিন্তু সেগুলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে এসে জ্বলে ভস্ম হয়ে যায়।কিন্তু বৃহদাকার পাথখন্ডগুলো যদি পৃথিবীতে আঘাত করে তাহলে কি হবে? প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে এমনই একটি পাথর আঘাত হেনেছিল।এতে ডাইনোসরসহ পৃথিবীর তাবৎ উদ্ভিদ লতা গুল্ম সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।উত্তর আরিজন (Arizon) -এ যে উল্কাপিন্ড এসে পরেছিল তার কারণে পৃথিবীতে যে গর্ত হরেছিল তার গভীরতা ৬০০ ফুট এবং প্রস্থ ৩৮০০ ফুট।

বিজ্ঞানীরা বলেন, সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণের সময় ঝুলন্ত পাথরগুলো পৃথিবীতে ছুটে এসে আঘাত হানার আশংকা বেশী থাকে।কারণ হচ্ছে, এসময় সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী একই সমান্তরালে, একই অক্ষ বরাবর থাকে। আগন্তুক গ্রহাণু S-M-E লাইনের অনুকূলে স্বল্প কৌণিক মান সৃষ্টি করে ধাবমান হওয়ার সময় ত্রয়ী বিন্দু শক্তি লাইন দ্বারা বিচ্যুত হয়ে সুজাসুজি পৃথিবীর দিকে তীব্র গতিতে ছুটে আসবে। পৃথিবীর ইতিহাসে সমাপ্তি রেখা টেনে দেবার জন্য এমন একটি ঘটনা যথেষ্ট! সূর্য কিংবা চন্দ্রগ্রহণ মূলতঃ আগন্তুক জ্যোতিষ্ক কর্তৃক পৃথিবীকে আঘাত করার সম্ভাব্যতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়া। ফলে তিনটির মধ্যাকর্ষণ শক্তি একত্রিত হয়ে ত্রিশক্তিতে রুপান্ত্রিত হয়।এমনি মুহূর্তে যদি কোন পাথর বেল্ট থেকে নিক্ষিপ্ত হয় তখন এই ত্রিশক্তির আকর্ষণের ফলে সেই পাথর প্রচন্ড শক্তিতে, প্রবল বেগে পৃথিবীর দিকে আসবে, এ প্রচন্ড শক্তি নিয়ে আসা পাথরটিকে প্রতিহত করা তখন পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাড়াঁবে। ফলে পৃথিবীর একমাত্র পরিণতি হবে ধ্বংস। [www.somewhereinblog.net/blog/ogropothik/29499554]

একজন বিবেকবান মানুষ যদি মহাশূন্যের এ তত্ব জানে, সূর্যগ্রহণের সময় তার শঙ্কিত হবারই কথা । এই দৃষ্টিকোণ থেকে সূর্য কিংবা চন্দ্রগ্রহণের সময় মহানবি (সা.) -এর সেজদাবনত হওয়া এবং সৃষ্টিকূলের জন্য পানাহ চাওয়ার মধ্যে আমরা একটি নিখুঁত বাস্তবতার সম্পর্ক খুঁজে পাই । মহানবি (সা.) এর এ আমলটি ছিল যুক্তিসঙ্গত ও একান্ত বিজ্ঞানসম্মত।আসুন, অনাগত এরকম নাজুক মুহূর্তে আমরা আনন্দ উল্লাসে মত্ত না হয়ে, স্রষ্টার কাছে স্বীয় কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা চেষ্টা করি এবং তারই দরবারে সেজদাবনত হই। আল্লাহ্‌ আমাদের তাওফিক দান করুন।

সূর্যগ্রহণের নামাজ এবং করণীয়-বর্জনীয়

আরবিতে সূর্যগ্রহণকে ‘কুসূফ’ বলা হয়।আর সূর্যগ্রহণের নামাজকে ‘সালাতুল কুসূফ’ বলা হয়।দশম হিজরীতে যখন পবিত্র মদীনায় সূর্যগ্রহণ হয়, ঘোষণা দিয়ে লোকদেরকে নামাজের জন্য সমবেত করেছিলেন রাসুল [সা.] ।তারপর সম্ভবত তাঁর জীবনের সর্বাদিক দীর্ঘ নামাজের জামাতের ইমামতি করেছিলেনন।সেই নামাজের কিয়াম, রুকু, সিজদাহ মোটকথা, প্রত্যেকটি রুকন সাধারণ অভ্যাসের চেয়ে অনেক দীর্ঘ ছিল। সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণকালে মুমিনদের করণীয় হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে একত্র হয়ে সালাত আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে  দোয়া করতে থাকা। এ সালাত আদায় করা নফল এবং এতে আজান ও ইকামত দিতে হয় না। তবে লোকজন ডাকার জন্য ‘আস-সালাতু জামিয়া’ (সালাত সমাগত) বা এ জাতীয় বাক্য ব্যবহার করে ডাকার অবকাশ রয়েছে। সমাবেশস্থলে জুমার নামাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমাম উপস্থিত থাকলে তিনি সূর্যগ্রহণের সালাত জামাতে আদায় করাবেন। আর ইমাম বা তার প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলে একা একা সালাত করা যাবে। এ সালাত অন্যান্য সালাতের চেয়ে অধিক দীর্ঘ হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ সালাতের কেরাত, কেয়াম, রুকু, সেজদাসহ অন্যন্য আমলগুলোও অনেক দীর্ঘ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এ সালাতে কেয়াম, রুকু ও রুকু থেকে দাঁড়ানো অবস্থা অত্যধিক দীর্ঘায়িত করেছেন। এমনকি কেয়াম অবস্থায় প্রায় সূরা বাকারা তেলাওয়াত করার মতো সময় পরিমাণ অতিবাহিত করেছেন এবং রুকু থেকে দাঁড়িয়ে এর চেয়ে তুলনামূলক কম সময় অবস্থান করেছেন। আর দ্বিতীয় রাকাত প্রথম রাকাতের চেয়ে ছোট করেছেন। তিনি কেয়ামের মধ্যে কেরাত ছাড়াও তাসবিহ, তাহলিল, তকবির, তাহমিদ, দোয়া পড়েছেন বলে অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে। সালাত আদায় শেষ হলে সূর্য পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত দোয়া করতে হয়। হানাফি মাজহাবে অন্যান্য সালাতের মতো এ সালাতেও প্রতি রাকাতে একটি মাত্র রুকু আদায় করতে হয়। শাফিঈ মাজহাবে প্রতি রাকাতে দুটি রুকু করতে হয়। অবশ্য হাদিসের বর্ণনাগুলোতে এ সালাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) দুই বা ততোধিক রুকু করেছেন বলেই উল্লেখ রয়েছে। এ সালাতের রাকাত সংখ্যা দুই। তবে চার রাকাত বা তার বেশিও আদায় করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতি দুই বা চার রাকাতের পর সালাম ফিরাতে হবে। সালাতের শেষে কোনো খুতবা পড়তে হয় না। কোনো কোনো বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক খুতবা পাঠের কথা বর্ণিত থাকলেও তা সালাতের সংশ্লিষ্ট হিসেবে নয়; বরং তা ছিল ‘গ্রহণ’ সম্পর্কে জাহিলি যুগের ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের জন্য প্রদত্ত বিশেষ বিবৃতি। [আল-আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারি] ###

Related posts

Top