স্মৃতির গ্রাম

একটি গ্রাম। নাম রূপপুর। আকারে খুব বেশি বড় নয়। তবে তার সৌন্দর্য অতুলনীয়। যেন নামের সাথে মিল রেখেই স্রষ্টা গড়েছেন তাকে। দিয়েছেন বাহারি রূপ। সবুজের এক অনন্য সমারোহ এই গ্রাম। গ্রামের বুকচিরে  মেঠোপথ। মেঠোপথের দু’ধারেই রয়েছে শস্যক্ষেত। বাড়ি-ঘরগুলো গ্রামের একটু ভেতর দিকে। গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মৃদু স্রোতিস্বীনি এক নদী। এ গ্রামেই আমার জন্ম । এর উদরেই জন্মেছি। জন্মের পর কোন দালান দেখিনি। দেখেছি ছোট ছোট ঘর। কিছু টিনের । কিছু ছন-খড়ের । সারি সারি সেই বাড়িগুলো ছিল শান্তির নীড়। আমাদের ঘর ছিল টিনের। বাড়ির সামনে একটি পুকুর। পুকুরের চারপাশে কলাগাছ ছিল। কলাগাছগুলো বাড়ির সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছিল শতগুণ। সেই সৌন্দর্যময় দৃশ্য অবলোকন করতাম খুব কাছ থেকে। গায়ে মেখে মেখে। যে দৃশ্য মন আনন্দে দোলতো। হিন্দল তুলতো।

পুকুরপাড়ে কাটানো সময় ও জম্পেশ আড্ডা ছিলো অবর্ণনীয় সুখের। শীতের দিনে পুকুর পাড় অদ্ভুত কুয়শাচ্ছন্ন হয়ে থাকতো। পুকুর পাড়ে চুপটি করে বসে থাকতো শিকারি পাখি মাছরাঙা। সুযোগ পেলেই মাছ নিয়ে আকাশপানে ছুটে যেতে। এত সুন্দর পাখি সচরাচর দেখাই যায় না। আম-কাঁঠালের অনেক বাগান ছিল আমাদের রূপপুরে। ছিল অনেক পঞ্চাশোর্ধ আমগাছ। যার উচ্চতা ছিলো আকাশ ছোঁয়া।

এসব গাছে ধরতো আম। পড়ত বৈশাখী ঝড়ে । আমি দস্যি বালক হয়ে কুড়াতাম বাগান বাগান ঘুরে। ঝড়ের সময় বাড়ির বাইরে থাকার অপরাধে মায়ের স্নেহমাখা বকুনি আব্বুর শাসনমিস্রিত পিটুনি কত খেয়েছি তার কোন হিসেব যে আজ নেই । এযে আজ শুধুই স্মৃতি।

ঝড়ে অনেক কঁচা আম পড়ত। আমরা কুড়াতাম । দুপুরের প্রখর রোদে কাঁচা আম কাসুন্দি দিয়ে কত মজা করেই না খেতাম । পাঁকা আমগুলো থাকতো রসে টইটুম্বুর । মুখে দিতেই হারিয়ে যেতাম ভালোলাগার অন্য এক রাজ্যে।

যেখানে আমি রাজা আমিই প্রজা। আজও গ্রামের সেই পাকা আমের কথা মনে হলে জিভে জল চলে আসে। গাছের কাঁঠাল যখন পাকতো, পুরো বাড়ি ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে যেত। কাঁঠাল আমার তেমন পছন্দের নয়। তবে বাড়ির কাঁঠাল ছিল অমৃতের মতো। বর্ষার পানির কথা মনে হলেই মনে পড়ে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অথৈ পানিতে গোসল করার কথা। কতইনা আনন্দের ছিলো সেই মধুমাখা সময়গুলো। কাদা মাখামাখিতে আমাদের মাঝে হৈহুল্লোড় পড়ে যেত। আষাঢ়র বৃষ্টিতে ভিজে যদিও অনেকবার অসুস্থ হয়ে পড়েছি। তবুও মনে সাধ জাগে আবার সেই বৃষ্টিতে ভেজার । কিন্তু এখন আর তা হয়ে উঠেনা। শরতে নদীর ধারে কাশফুল ফুটতো। আর আমরা দল বেঁধে যেতাম কাশফুল তুলতে। কত আনন্দ হতো ফুল তুলতে গিয়ে। তা কি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব?

নদীতে প্রচুর মাছ ছিলো। আমার ছিল মাছ ধরার নেশা । আমাদের মাছ ধরার সময়টা ছিল উপভোগ করার মতো। হেমন্তে আকাশে খণ্ড মেঘের ভেলা দেখতাম। প্রকৃতিতে লেগে থাকতো শীতের আমেজ। শিশির পড়তে শুরু করতো ঘাসে। সকালের রোদে শিশিরগুলো কেমন ঝিলিক দিত। কুয়াশা ভেজা ঘাসে রিক্ত পায়ে হেঁটেছি অনেক। শীতকালে কুয়াশায় আবৃত প্রভাত। দাদুর সাথে উঠোনে বসে রোদ পোহানোটা ছিলো দারুণ মজাদার। সাথে থাকতো গরম ভাপা পিঠা। শীতের অন্যান্য পিঠার সাধ যেন আজও লেগে আছেজিহ্বায়। কিন্তু এ সব-ই যে আজ শুধুই স্মৃতি।

বসন্তে রূপপুরের রূপটা একটু বেশীই পাল্টে যেত। গাছে গাছে নতুন পাতা আর ফুলে ভরে উঠতো গ্রাম। শিউলি, বকুল আর হাসনাহেনায় গাছগুলো যেন বধূসাজে সাজতো। ছোটসময়ে খেলাধুলা হতো বেশি। কতরকম খেলা ছিলো আমাদের। ক্রিকেট, ফুটবলের পাশাপাশি কানামাছি, বউচোর, ফুলটোকা আরো কত কি! বিকেলবেলার খেলারসাথীদের কথা আজও খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে স্মৃতিরগ্রাম রূপপুরকে। আবারো হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে অপরূপ সৃষ্টির সেই সৌন্দর্যে। রূপপুর যেন এখনো আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে। তবে পড়ালেখা আর বিভিন্ন ব্যস্ততায় যাওয়া হয় না সেখানে। শুধু হৃদয় কাবায় ছবি আঁকি প্রিয় রূপপুরের। সত্যি প্রিয় রূপপুরের রূপের বাহার দূর থেকে মিস করি খুব…!

Related posts

Top