হাশরের ময়দানে মানুষের প্রতি প্রশ্ন ও আল্লাহর সাক্ষী প্রসঙ্গ

বিখ্যাত বুজুর্গ ফুজায়েল আয়াজ বলেছেন—  পৃথিবীতে থেকে কোনো মানুষের পক্ষে গাফেল থাকা সাজে না বরং মৃত্যুর স্মরণ থাকা আবশ্যক প্রতিটি মুহূর্তে। কেননা, যেই মুহূর্তে মানুষ পৃথিবীতে আসে, নিয়তি তাকে বলে আমিও তোমার পিছু আসছি, এটা মনে রেখো । [তাজকিরাতুল আউলিয়া, অনুবাদ গিরিশ চন্দ্রসেন]

হাশর কি? হাশর শব্দটি আরবি, যার অর্থ সমবেত হওয়া । দুনিয়া হলো কাজের জায়গা, আর কেয়ামতের দিন হলো এর প্রতিদানের জায়গা। তাই জাগতিক জীবন হলো একটি সীমিত সময়ের জীবন। মহাপ্রলয় বা কেয়ামতের পরে প্রত্যেক মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ভূমিতে সমবেত হতে হবে । এটাকেই বলা হয়, হাশর ।  হাশর হবে পরকালের  একটি মঞ্জিল । কেয়ামতের দিন সবাইকে উঠানোর পরে বিচার শেষে জান্নাত বা জাহান্নামে যাওয়ার জন্যে এই মঞ্জিলে সবাইকে অবশ্যই থামতে হবে । কোরআনে সূরা হাশর নামে ৫৯ নম্বরে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা রয়েছে । [লাইফ আফটার লাইফ, মুফতি তাকি উসমানি]

কিভাবে সমবেত হবে মানুষ : হাশরের ময়দান হলো মানুষের জন্যে সবচে’ কঠিন সময় । সে-সময় মানুষ উলঙ্গ ও খাৎনাবিহীন অবস্থায় সমবেত হবে ।

রাসূলু (সা.) বলেছেন—  কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে খালি পায়ে, উলঙ্গ ও খাৎনাবিহীন অবস্থায় সমবেত করা হবে। আর সর্বপ্রথম যাকে পোশাক পরান হবে, তিনি হচ্ছেন ইবরাহীম খলীল (আ.) । মহান আল্লাহ্‌ বলবেন—  আমার বন্ধু ইবরাহীমকে পোশাক পরাও, লোকজন যেনো তার মর্যাদা বুঝতে পারে। তারপর অপরাপর লোককে তাদের আমলের মান অনুযায়ী পোশাক পরান হবে। [বুখারি]

নবী (সা.) হজরত আয়েশা সিদ্দিকাকে (রা.) বলেছেন— যে লোকেরা যেভাবে তাদের দাফন করা হয়েছে তেমনি ভাবে উঠবে, আর পালাতে থাকবে। আয়েশা (রা.) হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন— হে আল্লাহ রাসুল তখন কি তাদের সতরও ঢাকা থঅকবে না? তখন নবী সা. বললেন— না। আবারও জিজ্ঞেস করলেন— তাহলে সেখানে নারী-পুরুষ কিভাবে একত্র হবে? নবীজি বললেন— সেদিন মানুষের অন্তর এতটাই অস্থির থাকবে যে, কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় থাকবে না। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। [মুসলিম]

এক রেওয়ায়েতে এসেছে— আফসসোসকারীদের মধ্যে কিছু লোক এমনও থাকবে, যে মালিক হয়েও নিজের অপরাধের কারণে জাহান্নামে যাবে, আর তার গোলাম তার চোখের সামনে দিয়ে নেক কাজের কারণে জান্নাতের দিকে যাবে। তখন মালিকের আফসোস হবে যে, সে দুনিয়াতে আমার গোলাম ছিলো, এখন দেখি সেই আমার চেয়ে সৌভাগ্যবান, আমি মনের চাহিদায় চলার কারণে জাহান্নামে যাচ্ছি, আর সে আনুগত্যের কারণে জান্নাত যাচ্ছে। [আবু দাউদ]

কী সেই প্রশ্নবালি : আল্লাহ তায়ালার সামনে দাঁড় করানো হবে, আর সেখানে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর সবাইকে দিতে হবে। হাদিসে এসেছে—  বনি আদম সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে সেখান থেকে সরতে পারবে না। সেই প্রশ্ন হবে মানুষের জীবনের পরীক্ষা । সেখানে সবগুলোও উত্তর দিতে হবে। আর সেই প্রশ্নও আল্লাহ তার নবীদের মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন । প্রশ্ন করা হবে—  ১. হে বান্দা, তুমি জীবন কীভাবে অতিবাহিত করেছো? ২. তুমি যৌবন কিভাবে কাটিয়েছো? ৩. সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছো, ৪. কোন কাজে ব্যয় করেছো? ৫. নিজের এলেম অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছো? [বুখারি]

তখন এই সব প্রশ্নের জবাব দেয়া অত্যন্ত কঠিন হবে, তবে যারা ভালো কাজ করে দুনিয়া থেকে যাবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের সাথে সদয় ব্যাবহার দেখাবেন।

আল্লাহর সাক্ষী : মানুষ পৃথিবীতে কী করেছে কী না করেছে, সবই আল্লাহ জানেন । কিন্তু একজন ন্যায়বিচারক হিসেবে তিনি হাশরের দিন যে আদলত প্রতিষ্ঠা করবেন, তাতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর উপস্থিতিও ঘটাবেন । এমন সাক্ষী যাকে এড়িয়ে মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব । আল্লাহ তায়ালা চারটি সাক্ষী পেশ করবেন—

এক. মানুষের আমল : মানুষের আমলনামা পেশ করা হবে। কোরআনে এসেছে—

وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا ۚ وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا

অর্থ : যখন আমলনামা পেশ করা হবে তখন গুনাহগার লোকেরা নিজেদের কার্যকলাপ দেখতে পাবে তখন ভয়ে কাঁপতে থাকবে, এবং বলতে থাকবে, কোন ছোট থেকে বড় আমলই বাদ যাবে না যা সেখানে লেখা হয় নি। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থি পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি জুলুম করবেন না। [সুরা কাহফ; আয়াত ৪৯]

দুই. ফেরেশতা : ফেরেশতাগণ সেদিন সাক্ষ্য দেবে, যারা প্রতিমুহূর্তে মানুষ কী করে না কর, তার খবর রাখতো । এবং তারা নির্মোহ সৃষ্টি হওয়ার কারণে মিথ্যার অবকাশ থাকবে না । এরশাদ হচ্ছে—

وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ﴿١٠﴾كِرَامًا كَاتِبِينَ﴿١١

অর্থ : অবশ্যই তোমাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। [সুরা ইনফিতার; আয়াত ১০-১১]

তিন. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ : শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ্য দেবে; যেগুলোর মাধ্যমে মানুষ গোনাহ করে থাকে। আল্লাহ বলেছেন—

يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

অর্থ : যেদিন প্রকাশ করে দেবে তাদের জিহবা, তাদের হাত ও তাদের পা, যা কিছু তারা করতো। [সুরা নুর; আয়াত ২৪]

চার. জমিন : অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্ট এই পৃথিবীর জমিন সাক্ষ্য দেবে । আল্লাহ বলেছেন—

يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا﴿٤﴾بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَىٰ لَهَا﴿٥﴾

অর্থ : সেদিন সে তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, কারণ, আপনার পালনকর্তা তাকে আদেশ করবেন। [সুরা যিলযাল; আয়াত ৪-৫]

আমল সঠিক করার বিকল্প নেই : সুতরাং যেমনিভা ফাইলপত্র মেইন্টেন করা হয়। বর্তমানে লোকেরা ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে কোনো দৃশ্যকে ধারণ করে নেয় প্রয়োজনে তুলে ধরার জন্য। তেমনি ভাবে এই জমিনের ভিডিও ক্যামেরাও সব কিছুর ছবি তুলে যাচ্ছে। তেমনি এই জমিন সবার ছবি নিয়ে রাখছো এবং কেয়ামতের দিন সে তার রিপোর্ট প্রকাশ করবে যে, এই ব্যক্তি আমার এই জায়গায় এই কাজ করেছে, সেই জায়গায় সেই কাজ করেছে। মানুষের অঙ্গগুলো হলো আল্লাহ তায়ালার গোয়েন্দা পুলিশ, এসব অঙ্গ দিয়ে মানুষ গুনাহ করে,আর এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই কেয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে পাপের সাক্ষ্য দেবে। তখন কী উপায় হবে? সেজন্য মুমিনের উচিত হলো সব সময় কেয়ামতের কথা মনে রাখা। আর এই কথা ভাবা যে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন আর আমি আল্লাহর দৃষ্টি থেকে লুকাতে পারবো না। এই কথা যখন মনে বসে যাবে তখন পাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকা অনেক সহজ হবে। এজন্য নবী কারিম (সা.) এই বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে নিয়েছিলেন, সাহাবায়ে কেরামের এমন বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিলো  যে, যে আমরা আল্লাহর আরশের সামনে, যেমন হাদিসে এসেছে নবী সা. যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন— হে হারেস, তুমি কী অবস্থায় সকাল অতিক্রম করেছো? তিনি উত্তর করলেন— হে আল্লাহর নবী আমি এমনভাবে সকাল করেছি যে, মনে হচ্ছিলো যেন আমি আল্লাহর আরশের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তাদের বিশ্বাস এমনই পরিপূর্ণ ছিলো। কেন না যখন বিশ্বাস এরকম হয়ে যায় তখন বান্দা তার ইচ্ছাকে সংবরণ করে।  [তিরিমিজি]

[সূত্র : গ্রন্থ- আমল সে জিন্দেগি বনতি হ্যায়। লেখক : জুলফিকার আহমদ নকশবন্দি। অনুবাদ : মনযূরুল হক ]###

Related posts

Top